Advertisement
E-Paper

এক ফোনেই জালে জোড়া খুনের দল

বাঁকুড়া শহরের প্রতাপবাগানে রায়চৌধুরী পরিবারের বাড়িতে ফোনটা এসেছিল শুক্রবার। ফোনে বলা হয়েছিল, বাড়ির ছেলে বিপুল রায়চৌধুরী তাদের কাছে আছেন। রথের দিন (শনিবার) ফিরবেন। বাড়ির লোক তখন ঘুণাক্ষরেও টের পাননি, ফোন আসার তিন দিন আগেই আসলে খুন হয়ে গিয়েছেন বিপুলবাবু!

রাজদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ২০ জুলাই ২০১৫ ০৩:২২
শোকার্ত স্ত্রী ও দুই সন্তান। বাঁকুড়ায় বিপুলবাবুর বাড়িতে। রবিবার অভিজিৎ সিংহের তোলা ছবি।

শোকার্ত স্ত্রী ও দুই সন্তান। বাঁকুড়ায় বিপুলবাবুর বাড়িতে। রবিবার অভিজিৎ সিংহের তোলা ছবি।

বাঁকুড়া শহরের প্রতাপবাগানে রায়চৌধুরী পরিবারের বাড়িতে ফোনটা এসেছিল শুক্রবার। ফোনে বলা হয়েছিল, বাড়ির ছেলে বিপুল রায়চৌধুরী তাদের কাছে আছেন। রথের দিন (শনিবার) ফিরবেন।

বাড়ির লোক তখন ঘুণাক্ষরেও টের পাননি, ফোন আসার তিন দিন আগেই আসলে খুন হয়ে গিয়েছেন বিপুলবাবু! তাঁর দেহ পড়ে আছে ধানবাদের রাজগঞ্জ থানা এলাকার মর্গে।

তেতাল্লিশ বছরের বিপুলবাবু পেশায় জনস্বাস্থ্য কারিগরি দফতরের ঠিকাদার। স্বচ্ছল পরিবার। বাড়িতে মা ছাড়া আছেন স্ত্রী ইলোরাদেবী, বছর আটেকের ছেলে ইমন আর আড়াই বছরের মেয়ে মিঠি। বিপুলবাবুর একটি লজও আছে প্রতাপবাগানে। পরিবার সূত্রের খবর, বিপুলবাবুর মামাবাড়ি কল্যাণীতে। সেখানে তিনি নতুন ফ্ল্যাট কিনেছেন। ফ্ল্যাটের কাজ দেখতে ১০ জুলাই নিজে গাড়ি চালিয়ে কল্যাণীতে গিয়েছিলেন বিপুল। চার দিন মামাতো বোন নন্দিতা সরকারের বাড়িতে থেকে গত মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) তিনি বাঁকুড়ার উদ্দেশে রওনা দেন। পথে একাধিকবার ফোনে নন্দিতাদেবীর সঙ্গে কথা হয় বিপুলবাবুর। ওই দিন দুপুর সাড়ে ১২টা নাগাদ শেষ বার দু’জনের কথা হয়। তখন দুর্গাপুরে আছেন বলে জানিয়েছিলেন বিপুলবাবু। তার পর থেকে আর যোগাযোগ করা যায়নি তাঁর সঙ্গে। যত বারই মোবাইলে ফোন করা হয়েছে, হয় ‘নট রিচেব্‌ল’ বা ‘স্যুইচড অফ’। মঙ্গলবার রাত অবধি বিপুল বাড়ি না ফেরায় তাঁর পরিবারের তরফে বাঁকুড়া সদর থানায় নিখোঁজ ডায়েরি করা হয়।


ঠিকাদার বিপুল রায়চৌধুরী

শুক্রবার পর্যন্ত বিপুলবাবুর কোনও খোঁজই পায়নি পুলিশ। কিন্তু ওই দিন বিপুলবাবুর বাড়িতে বিপুলবাবুর নম্বর থেকেই ফোন আসার পর থেকে ঘটনার পট দ্রুত বদলাতে থাকে। ফোনের সূত্র ধরে খোঁজ করতেই পুলিশ জানতে পারে, বিপুলবাবু মঙ্গলবারই খুন হয়ে গিয়েছেন এবং সেই খুনের কিনারা করতে গিয়ে বেরিয়ে পড়ে আরও একটি খুনের কথা। পুলিশ সূত্রের খবর, বিপুলবাবুর খুনের ব্যাপারে যারা অভিযুক্ত, তাদের মধ্যেও এক জন খুন হয়ে গিয়েছে। বখরা নিয়ে বচসাই তার কারণ বলে মনে করছে পুলিশ। জোড়া খুনের এই ঘটনায় শনিবার দুর্গাপুর থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে এক মহিলা-সহ পাঁচ জনকে। শনিবার দুপুরেই বাঁকুড়া পুলিশের একটি দল ধৃতদের নিয়ে ধানবাদে চলে যায়। সঙ্গে নিয়ে যাওয়া হয় বিপুলবাবুর এক আত্মীয়, দুই বন্ধু ও ম্যানেজারকে। সেখানে তাঁরা বিপুলবাবুর দেহ শনাক্ত করেন। নিহত দ্বিতীয় ব্যক্তি, শেখ উজ্জ্বলের দেহও শনাক্ত করা হয়। শনিবার গভীর রাতে বাঁকুড়ায় ফেরে বিপুলবাবু ও উজ্জ্বলের দেহ। রাতেই শেষকৃত্য সম্পন্ন হয় বিপুলবাবুর। রবিবার ধৃতদের বাঁকুড়া আদালতে পেশ করে ১৪ দিন হেফাজতে রাখার আবেদন জানায় পুলিশ। বিচারক আট দিনের হেফাজত মঞ্জুর করেছেন। বাঁকুড়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সবরি রাজকুমার কে এ দিন বলেন, ‘‘পাঁচ জনকে আমরা গ্রেফতার করেছি। জেরার মুখে জোড়া খুনের কথা কবুল করেছে তারা।’’


সবিস্তারে দেখতে ক্লিক করুন

কী ভাবে বিপুল-রহস্যের কিনারা হল? নিখোঁজ ডায়েরি হওয়ার পরে প্রথম দু’দিন কোনও অগ্রগতি হয়নি। কিন্তু শুক্রবার রাতে বিপুলবাবুর স্ত্রী থানায় গিয়ে ফোন আসার কথা জানান। তিনি পুলিশকে বলেন, কিছু ক্ষণ আগে বিপুলবাবুর নম্বর থেকে একটি পুরুষ কণ্ঠ ফোন করেছিল। বলেছিল, ‘আপনার স্বামী আমাদের কাছে আছেন। আরও কিছুদিন থাকবেন। রথের দিন বাড়ি ফিরে আসবেন। পুলিশে জানাবেন না, তা হলে ক্ষতি হবে।’ কিন্তু বিপুলকে অপহরণ করা হয়েছে, এমন কোনও ইঙ্গিত ওই ফোনে দেওয়া হয়নি। মুক্তিপণও দাবি করা হয়নি। এ কথা শোনার পরেই সক্রিয় হয়ে ওঠে পুলিশ। বিপুলের মোবাইলের কল ডিটেলস রেকর্ড খতিয়ে দেখতে শুরু করে তারা। দেখা যায়, ১৪ তারিখ কয়েকটি ফোন নম্বর থেকে বিপুলকে একাধিক বার ফোন করা হয়েছে। সেই নম্বরগুলির টাওয়ার লোকেশন ট্র্যাক করা শুরু হয়। সেই সঙ্গে বিপুলের পরিবার সূত্রে পুলিশ জানতে পারে, ১৪ থেকে ১৭ তারিখের মধ্যে বিপুলের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকে এটিএম কার্ডের মাধ্যমে তিন দফায় ৫০ হাজার টাকা করে মোট দেড় লক্ষ টাকা তুলে ফেলা হয়েছে।

জট খুলতে শুরু করে শনিবার সকালে। বিপুলের ফোনে যে নম্বরগুলি থেকে ফোন এসেছিল, তাদের টাওয়ারে লক্ষ রাখছিল পুলিশ। ভোরবেলা দেখা যায়, একটি মোবাইল নম্বর রয়েছে পানাগড়ের একটি এটিএমের কাছে। বাঁকুড়া থানার কাছ থেকে খবর পেয়ে পানাগড়ের পুলিশ ওই এটিএম থেকে এক সন্দেহভাজনকে আটক করে। তাকে জেরা করতেই বেরিয়ে পড়ে সব গল্প। জানা যায়, ওই যুবকের নাম বাপি শেখ। তার বাড়ি দুর্গাপুরের নব ওয়াড়িয়া এলাকায়। পুলিশের দাবি, জেরার মুখে বাপি জানায়, সে এবং তার সঙ্গীরা মিলে বিপুলবাবুকে ১৪ তারিখ রাতেই খুন করেছে! ধানবাদ শহর থেকে বেশ কিছুটা দূরে রাজগঞ্জ থানা এলাকায় তাঁর দেহ ফেলে দিয়েছে তারা। বাপি কবুল করে, তারা খুন করেছে তাদের এক সঙ্গী শেখ উজ্জ্বলকেও! সেই দেহটি তারা ফেলে দিয়েছে ধানবাদের গোবিন্দপুর এলাকায়। এর পর রাজগঞ্জ থানার সঙ্গে যোগাযোগ করে বাঁকুড়া থানা জানতে পারে, ১৫ তারিখ গাঁওরাতার ময়দান থেকে একটি আধপোড়া দেহ উদ্ধার হয়েছে। সেটি মর্গে আছে। আর একটি আধপোড়া দেহ ১৫ তারিখ উদ্ধার করেছে গোবিন্দপুর থানা।

ইতিমধ্যে বাপিকে জেরায় উঠে আসে শ্রাবণী মণ্ডল ওরফে ডলি মল্লিক নামে এক মহিলা-সহ মোট পাঁচটি নাম। সরাফত আলি (ওরফে সুদর্শন প্রসাদ), কাদের শেখ, গুলাই শেখ, উজ্জ্বল শেখ। সরাফত, কাদেরদের আসল বাড়ি মুর্শিদাবাদে বলে পুলিশ জেনেছে। আপাতত বাপি, সরাফত, উজ্জ্বল, কাদের ও গুলাই— একই সঙ্গে নব ওয়াড়িয়ায় ভাড়াবাড়িতে থাকছিল। বছরখানেক আগে জাতীয় সড়কের ধারে স্বামী-স্ত্রী পরিচয় দিয়ে বাড়ি ভাড়া নেয় শ্রাবণী ওরফে ডলি এবং দীপ মল্লিক। এদের মধ্যে কেউই নাম ভাঁড়িয়ে দীপ সেজে ছিল কিনা, তা এখনও পরিষ্কার নয়। বাপির সঙ্গে কথা বলার পরে বাঁকুড়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের নেতৃত্বে শনিবার সকালেই বাকিদের গ্রেফতার হয়ে যায়।

কিন্তু বাপি এবং তার দলবল কেন খুন করল বিপুলবাবুকে? ধৃতদের জেরা করে সামনে এসেছে বড় চক্রান্তের জাল, যা দেখেশুনে তাজ্জব বাঁকুড়া সদর থানার তদন্তকারীরা।

পুলিশ জেনেছে, দুর্গাপুর শহরের সিটি সেন্টার সংলগ্ন এলাকায় ধৃত শ্রাবণীর একটি স্পা রয়েছে। সেখানে দেহ ব্যবসাও চলত বলে পুলিশের দাবি। শনিবার শ্রাবণীর স্পা-এর কাছাকাছি উদ্ধার হয় বিপুলের গাড়িটি। সেটির নম্বর প্লেট বদলে দিয়েছিল দুষ্কৃতীরা। গাড়ির ভিতর থেকে মেলে আসল নম্বর প্লেট, বিপুলের ড্রাইভিং লাইসেন্স। ধৃতদের হেফাজত থেকে বিপুলের অ্যাকাউন্ট থেকে তোলা টাকার এটিএমের রসিদও উদ্ধার হয়। পুলিশের দাবি, জেরার মুখে ধৃতেরা জানিয়েছে, দুর্গাপুরের স্পা-এ যাতায়াত ছিল বিপুলের। সরাফতের সঙ্গে তাঁর আগে থেকেই পরিচয় ছিল। ১৪ তারিখ সরাফতই বিপুলকে ফোন করে ওই স্পা-এ আসতে বলে। বিপুল সেখানে গেলে সবাই মিলে মদ্যপান করে। বিপুল বেহুঁশ হয়ে পড়ার পরে তাঁর এটিএম কার্ড ছিনিয়ে নিয়ে তাঁকে মারধর করে এটিএমের পিন নম্বর জেনে নেয় সরাফতরা। তার পরে বিপুলের গাড়িতেই তাঁকে তুলে ধানবাদ নিয়ে যাওয়া হয়। পুলিশের দাবি, রাজগঞ্জে গিয়ে গামছার ফাঁস দিয়ে বিপুলকে খুন করা হয়। পরে প্রমাণ লোপাট করতে তাঁর গায়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয় আততায়ীরা।

উজ্জ্বল শেখ কেন খুন হল?

পুলিশের দাবি, জেরায় সরাফতেরা জানায়, উজ্জ্বলকেও ঠান্ডা মাথায় পরিকল্পনা করেই সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। সরাফতদের ছক ছিল, উজ্জ্বলই বিপুলবাবুকে অপরহরণ করে পালিয়ে গিয়েছে এটা দেখানো হবে। এক তদন্তকারী অফিসার বলেন, ‘‘বিপুলের মতো একই কায়দায় গোবিন্দপুর এলাকায় খুন করা হয় উজ্জ্বলকে। তারও দেহ জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। এর পরে উজ্জ্বলের মোবাইল থেকে সরাফত নিজের মোবাইলে একটি এসএমএস পাঠায়। তাতে লেখা ছিল, উজ্জ্বলই বিপুলবাবুকে নিয়ে টাকাপয়সা তুলে ভিন রাজ্যে চলে যাচ্ছে।’’ তা হলে শুক্রবার বিপুলবাবুর ফোন থেকে তাঁর স্ত্রীকে ফোন করার মতো ‘কাঁচা কাজ’ কেন করল আততায়ীরা? তদন্তকারীদের অনুমান, ধৃতদের ধারণা ছিল— বিপুলবাবু বেঁচে আছেন, এই আশায় থাকবে পরিবার। ও দিকে ধানবাদে বেওয়ারিশ লাশ হিসাবে তাঁর দেহ সৎকার করে দেবে পুলিশ। আর সরাফতের কাছে পুলিশ এলে সে উজ্জ্বলের মোবাইল থেকে আসা এসএমএস দেখিয়ে দেবে। এ দিন আদালতে শ্রাবণীর গোপন জবানবন্দি নেওয়া হয়। পুলিশ আদালতকে জানিয়েছে, শ্রাবণীর স্পা-এর আড়ালে চলছিল দেহব্যবসা। সরাফত, উজ্জ্বল, বাপিরা এই কারবারের সঙ্গে অনেক দিন ধরেই যুক্ত। সরাফতই সম্ভবত ওই স্পা-এর মালিক বলে পুলিশ জেনেছে। ওই এলাকাতে সরাফতের একটি আসবাবপত্র ও বৈদ্যুতিন জিনিসপত্রের দোকান রয়েছে।

এক তদন্তকারীর কথায়, ‘‘শ্রাবণী যে ঘরভাড়া নিয়ে স্পা চালাতেন, সেই ভাড়া বেশ ক’মাস বাকি ছিল। ফলে, টাকার খুব প্রয়োজন পড়েছিল তাদের। আর বিপুলবাবুর যে টাকার অভাব নেই, তা তারা ভালই জানত।’’ পুলিশের দাবি, বিপুলের অ্যাকাউন্ট থেকে তোলা টাকা ঘরভাড়া মেটানোর কাজে লাগানো হয়েছে। খেপে খেপে আরও টাকা তোলার পরিকল্পনা তাদের ছিল বলেই মনে করছে পুলিশ।

রবিবার প্রতাপবাগানে গিয়ে দেখা গেল, ছেলেমেয়েকে নিয়ে ভেঙে পড়েছেন বিপুলবাবুর স্ত্রী ইলোরাদেবী। কথা বলার মতো অবস্থায় নেই। শিশুদের কী বলা হবে, বুঝে উঠতে পারছেন না আত্মীয়েরা। কল্যাণী থেকে নন্দিতাদেবীরা চলে এসেছেন। নন্দিতাদেবী জানান, সরাফত নামে এক জন তাঁর দাদাকে ফোন করত বলে তিনি শুনেছেন। তাঁর কথায়, ‘‘১৪ তারিখ বেরোনোর আগে দাদা বলেছিল, যেন ১০ মিনিট অন্তর অন্তর ফোন করি। দুপুর প্রায় সাড়ে বারোটা নাগাদ বলল, দুর্গাপুর পেরোচ্ছে। কিছু ক্ষণের মধ্যেই বাড়ি ঢুকে যাবে। সেটাই যে শেষ কথা হবে, ভাবিনি।’’

(সহ-প্রতিবেদন: সুব্রত সীট ও বিতান ভট্টাচার্য। অঙ্কন: নির্মল মল্লিক)

mobile tower location rajdeep bandyopadhyay bipul roychoudhuri double murder contractor murcer bankura contractor murder murder criminals double murder case abpnewsletters ladies spa shrabani mondal spa
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy