আকাশে পাক খাচ্ছিল অনেক ক্ষণ ধরে। প্রথমে মনে করেছিলেন চিল। কিন্তু বায়নোকুলার তাক করতে অন্য রকম মনে হয়েছিল সুমন প্রতিহারের। আগ্রহ বাড়ায় ছবি তোলা, যাচাই এবং বিশ্লেষণ। আর তাতেই খোঁজ মিলল মন্টেগু হেরিয়ারের। এক ধরনের শিকারি পাখি। পশ্চিমবঙ্গে এর আগে মন্টেগু হেরিয়ারের ছবি তোলার কোনও প্রমাণ নেই। তবে এ রাজ্যে পাখিটির আনাগোনার নথি অবশ্য রয়েছে। কিন্তু ১৮০ বছর আগের।
কেশপুর মহাবিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক সুমন প্রতিহার পাখি নিয়ে চর্চা করেন। সোমবার তিনি এবং তাঁর দুই ছাত্র নিলয় মণ্ডল, রাকেশ ঘোষকে নিয়ে পাখির খোঁজে গিয়েছিলেন পশ্চিম মেদিনীপুরের কেশিয়াড়িতে। বনপাটনা এলাকায় খোঁজ মেলে মন্টেগু হেরিয়ারের।
পৃথিবীতে ষোলো রকমের হেরিয়ার রয়েছে। এগুলো শিকারি পাখি, ‘বার্ডস অব প্রে’। এদের মধ্যে মন্টেগু হেরিয়ার, প্যালিড হেরিয়ার, হেন হেরিয়ার, ইউরেশিয়ান মার্স হেরিয়ার সারা ভারত জুড়ে শীতকালে অতিথি হয়। পশ্চিমবঙ্গে মার্স হেরিয়ার, পায়েড হেরিয়ার, হেন হেরিয়ার আসার নথি রয়েছে। তবে এই প্রথম মন্টেগু হেরিয়ারের ছবি তোলা সম্ভব হল। পাখিটি রাজ্যের শীতকালীন অতিথি তালিকার নতুন সংযুক্তিও। বিজ্ঞানসম্মত নাম ‘সার্কাস পায়গারগাস’। সুমন জানালেন, কেশিয়াড়ির মন্টেগু হেরিয়ারটি অপরিণত স্ত্রী পাখি। ইউরোপ, হিমালয়ের উত্তর পাদদেশ-সহ, উত্তর আমেরিকায় প্রজনন করার পরে প্রবল শীত থেকে রক্ষা পেতে আফ্রিকা এবং ভারতে আসে। এরা লম্বা লম্বা ঘাস আছে এমন প্রান্তর পছন্দ করে। বড়সড় পোকা, সরীসৃপ, পাখির ডিম ও ছোট চেহারার পাখি, ইঁদুর এদের খাদ্য। পাখিগুলো কম উচ্চতায় গোলাকার ভাবে ঘুরতে থাকে শিকারের খোঁজে। গোল ভাবে ঘোরে বলেই এর নামের সঙ্গে সার্কাস শব্দটি যুক্ত হয়েছে।
আরও পড়ুন: ফের বাঘ বেরলো বনে
সুমনের মতে, কেশিয়াড়ির এই অঞ্চলটিতে লম্বা লম্বা ঘাস যুক্ত বিশাল মাঠ রয়েছে। রয়েছে কিছু জলাভূমি। শীতকালীন বিশ্রামের জন্য (রুস্টিং) এই রকম জায়গা এদের পছন্দ। বনপাটনার ওই ঘাসজমিতে সুমন সদ্যমৃত কিছু সাপ দেখেছেন। তিনি বলেন, ‘‘এই মৃত সাপগুলো খাওয়ার জন্যই হেরিয়ার পাখিগুলো ওই অঞ্চলে ভিড় জমিয়েছে।’’ সুমনের মতে, ‘‘এই মন্টেগু হেরিয়ার প্যাসেজ মাইগ্রান্ট (যাত্রাপথে পড়া কোনও এলাকায় বিশ্রাম নেয়) নাকি আকস্মিক ভাবে এসে পড়েছে, খুব স্পষ্ট ভাবে বলা যাবে না। আগেও এই অঞ্চলে এসেছে কিন্তু আমাদের অগোচরেই রয়ে গিয়েছে কিনা সেটাও নিশ্চিত করে বলা যাবে না।’’
প্রকৃতি সংসদের সভাপতি কুশল মুখোপাধ্যায় বললেন, ‘‘এশিয়াটিক সোসাইটিতে মন্টেগু হেরিয়ারের নমুনা আছে। ১৮৪০ সালে কলকাতার আশপাশেই মিলেছিল। তার পরে কিছু পাখি মেলার খবর পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু সেগুলো নির্ভরযোগ্য নয়। সেই সব দাবির স্বপক্ষে কোনও ছবিও নেই। এই প্রথম ছবি মিলল।’’ পশ্চিমবঙ্গ জীববৈচিত্র পর্ষদের চেয়ারম্যান অশোক স্যান্যাল জানিয়েছেন, মন্টেগু হেরিয়ার বাজপাখি গোত্রের পাখি। স্ত্রী পাখিগুলোর ওজন বেশি (৩৫০ গ্রাম)। পুরুষগুলো ছোট হয় (২৭০)। ব্রিটিশ প্রকৃতিবিদ জর্জ মন্টেগু নামে এদের নামকরণ। এরা পশ্চিমবঙ্গে খাবারের জন্য আসে। সুমন প্রতিহারের খোঁজ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘‘পশ্চিমবঙ্গে মন্টেগু হেরিয়ার পাওয়া যেত না। এটা পশ্চিমবঙ্গের জীববৈচিত্রের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য খোঁজ।’’