প্রথমে শাসক দলের ওজনদার নেতার মৌখিক আশ্বাস। তার পরে পুলিশ। এবং সব শেষে সশস্ত্র দুষ্কৃতীদের দাপাদাপি! বিধানসভা ভোটের আগে মাদ্রাসা শিক্ষকদের অনশন মঞ্চে চূড়ান্ত নাটক হল সোমবার। প্রায় অভূতপূর্ব ঘটনার সাক্ষী থাকল মধ্য কলকাতার হাজি মহম্মদ মহসিন স্কোয়ার। সন্ধ্যায় কার্যত প্রাণভয়ে পালিয়ে গেলেন অনশনকারীরা!
রাজ্যের মাদ্রাসা শিক্ষা পর্ষদের অধীন ২৩৪টি মাদ্রাসার শিক্ষক সরকারি অনুদানের দাবিতে অনশন করছিলেন তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে। অনশনের ৯৬তম দিনে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতিনিধি হয়ে সর্বভারতীয় সহ-সভাপতি মুকুল রায় আন্দোলন-মঞ্চে গিয়ে প্রথমে আশ্বাস দেন, বিধানসভা ভোটের পরে ওই শিক্ষকদের সমস্যা নিয়ে সরকার আলোচনা করবে। কিন্তু এর পরেও ঢের নাটক বাকি ছিল!
সংখ্যালঘুদের উন্নয়নে মমতার কাজের ফিরিস্তি দিয়ে মুকুল দাবি করেন, ‘‘বিশ্বাস তো আপনাদের কারও না কারও উপরে রাখতেই হবে। আর ৫ দিন বাদ থেকেই মহারণ। ভোট প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যাবে। আমি দলের তরফে কথা দিচ্ছি, ভোট শেষ হলে সরকার আপনাদের বিষয়টা আন্তরিকতার সঙ্গে দেখবে। আপনারা এখন আন্দোলন তুলে নিন।’’ তৃণমূলকে ফের ক্ষমতায় আনলে সেই সরকার জুনের মধ্যে এই সমস্যার সমাধান করবে বলেও প্রতিশ্রুতি দেন রাজ্যসভার সাংসদ। আন্দোলনকারী ‘আনএডেড মাদ্রাসা বাঁচাও কমিটি’র দুই নেতা আব্দুল ওয়াহাব মোল্লা, মীরাজুল ইসলামকে ফলের রস খাইয়ে অনশন ভাঙিয়েও দেন মুকুল!
মঞ্চে যখন মুকুল আশ্বাস দিচ্ছেন, অনশনকারীদের একাংশের ডাকে মঞ্চের পিছনে তখন চুপিসাড়ে হাজির প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীর চৌধুরী! মওকা পেয়েই বলেন, ‘‘ভোট আসতেই তৃণমূলের প্রতিনিধি এখানে এসেছেন। সংখ্যালঘুদের এ ভাবে ভোটের চশমা দিয়ে দেখা ঠিক নয়।’’ অধীরের আরও প্রশ্ন, ‘‘মুকুল রায় মুখ্যমন্ত্রীর তরফে সংখ্যালঘুদের বাগে আনার দায়িত্বপ্রাপ্ত। উনি এখানে ডিল করতে এসেছেন! সংখ্যালঘুদের এ ভাবে পণ্য হিসাবে দেখা হচ্ছে কেন?’’ প্রদেশ সভাপতির এই কথাতেই আন্দোলনকারীদের সম্বিৎ ফেরে।
মুকুল চলে যেতেই ক্ষোভে ফেটে পড়ে অনশনকারীরা মঞ্চের ত্রিপল-বাঁশ খুলতে বাধা দেন। তাঁরা চিৎকার করে বলতে থাকেন, মুকুল সরকারের প্রতিনিধি নন। তা ছাড়া, দাবিও কিছুই মেটেনি। আরও অভিযোগ শোনা যায়, কমিটির একাংশ তৃণমূলের কাছে বিক্রি হয়ে গিয়েছেন। মমতা এবং মুকুলের বিরুদ্ধে স্লোগান দেন আন্দোলনকারীরা। তাঁদের অনশন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে সমর্থন দেন কংগ্রেসের সংখ্যালঘু সেলের নেতারা।
প্রায় একই সময়ে ওই মঞ্চের পিছনে দাঁড়িয়ে শিক্ষকদের অনশন না তোলার আর্জি জানাচ্ছেন অধীর চৌধুরী।
হঠাৎই ছোরা হাতে সেখানে উদয় হয় কিছু দুষ্কৃতী! মঞ্চের চাঁদোয়ার ত্রিপল কাটতে থাকে তারা। কয়েক জনকে চাকু হাতে ঘুরে বেড়াতেও দেখা যায়। পুলিশ তখন নীরব দর্শক! কিছু লোককে হাঁক পাড়তে শোনা যায়, ‘ক্রিমিনাল ডাক’! এমতাবস্থায় অনশনকারীদের সিংহভাগই ঘটনাস্থল ছাড়েন। আবার খবর পেয়ে এসে পড়েন সিপিএমের স্থানীয় নেতা-কর্মীরা। কিছু ক্ষণ পরে বাকি শিক্ষকেরা জানিয়ে দেন, পুলিশ ও দুষ্কৃতীদের হুমকির মুখে তাঁরা অনশন তুলতে বাধ্য হচ্ছেন!
এমন ঘটনায় সিপিএমের পলিটব্যুরো সদস্য মহম্মদ সেলিমের অভিযোগ, ‘‘দিল্লির যন্তর-মন্তরে অবসরপ্রাপ্ত সেনাকর্মীদের ‘এক পদ, এক পেনশন’-এর দাবিতে অনশন সামনে স্বাধীনতা দিবসের যুক্তি দেখিয়ে মোদী সরকার সেনাবাহিনী দিয়ে তুলে দিয়েছিল। দেখা গেল, এক রাতে সামান্য সময়ের দর্শনেই দিদিভাই মোদীভাইয়ের বইয়ের পাতা পড়ে নিয়েছেন! প্রথমে মিথ্যা আশ্বাস। তার পরে পুলিশ এবং মস্তান দিয়ে অনশন তুলে দেওয়া হয়েছে।’’ সেলিমের দাবি, ‘‘এর জবাব তৃণমূল ভোটে পাবে। কাজের বেলায় কাজী, কাজ ফুরোলেই পাজি— তৃণমূলের এই নীতি সকলেই ধরে ফেলেছে।’’ বিজেপি বিধায়ক শমীক ভট্টাচার্যের কথায়, ‘‘আন্দোলনরত কিছু শিক্ষকের সঙ্গে যারা এই ধরনের আচরণ করে, তাদের হাতে ভবিষ্যৎ নিরাপদ কি না, সেটা সংখ্যালঘুদেরই এখন ভেবে দেখতে হবে।’’
— নিজস্ব চিত্র