অ্যাডমিট কার্ড তোলার শেষ দিন ছিল চলতি বছরের ৩১ মার্চ। অথচ পরীক্ষা হয়ে গিয়েছে তারও দু’মাস আগে, ৪ জানুয়ারি!
নদিয়া জেলা পরিষদের ওয়েবসাইটের সৌজন্যে মিলছে এমনই তথ্য। জেলা পরিষদের সাফাই, এটা প্রযুক্তিগত বিভ্রান্তি। খুব দ্রুত এটা সংশোধন করা হবে। কিন্তু তৃণমূল পরিচালিত ওই জেলা পরিষদের এমন ‘ভ্রান্তি’-র পিছনে অন্য অভিসন্ধি খুঁজে পাচ্ছেন বিরোধীরা। তাঁদের অভিযোগ, পরিকল্পনা করেই এমন বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। যাতে এ ভাবে শাসক দল তাদের নিজেদের পছন্দের কোনও প্রার্থীকে বেছে নিতে পারে। কর্মপ্রার্থীরা অবশ্য অতশত বুঝতে রাজি নন। এমন বিভ্রান্তিকর তথ্যে তাঁরা রীতিমতো ক্ষুব্ধ ও দিশেহারা।
২০১৪ সালের প্রথম দিকে নদিয়া জেলা পরিষদ লোয়ার ডিভিসন অ্যাসিস্টান্ট, অতিরিক্ত হিসেবরক্ষক ও ইংরেজি টাইপিস্ট পদে কিছু কর্মী নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়। সেই মতো ২০১৪ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি জেলা পরিষদের নিজস্ব ওয়েবসাইটে বিজ্ঞপ্তি জারি করে ওই তিনটি বিভাগে চাকরি প্রার্থীদের কাছ থেকে আবেদনপত্র চাওয়া হয়।
অনলাইনে ফর্ম পূরণের সময়সীমা ছিল ওই বছরের ২৮ মার্চ বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত। তবে সেখানে অ্যাডমিট কার্ড সংগ্রহ ও পরীক্ষার সময়সূচি নির্দিষ্ট করে বলা ছিল না। উল্লেখ ছিল: ‘‘পরীক্ষার দিন সম্পর্কে জানতে ওয়েবসাইটের (www.nadiazillaparishad.gov.in) পরবর্তী ‘আপডেট’-এর দিকে খেয়াল রাখতে হবে।’’ কিন্তু জেলা পরিষদের ওই ওয়েবসাইটে আজ পর্যন্ত কোনও ‘আপডেট’ দেওয়া হয়নি।
কিন্তু নদিয়া জেলার নিজস্ব ওয়েবসাইটেও (www.nadia.gov.in) নদিয়া জেলা পরিষদের ‘অনলাইন’ অবেদনপত্র সম্পর্কে জানার জন্য একটি বিভাগ রয়েছে। সেখানে আবেদনপত্রের নম্বর দিলেই অ্যাডমিট কার্ড ও পরীক্ষার দিনক্ষণ সম্পর্কে নিয়মিত ‘আপডেট’ পাওয়া যাচ্ছে। সেখান থেকে কর্মপ্রার্থীরা নিজেদের অ্যাডমিট কার্ডও ‘ডাউনলোড’ করেছেন। কিন্তু অ্যাডমিট হাতে পেয়েই তাঁদের চক্ষু চড়কগাছ! কারণ, সেখানে বলা হয়েছে, চলতি বছরের ৩১ মার্চ অ্যাডমিট কার্ড তোলার শেষ দিন। আবার সেই অ্যাডমিট কার্ডেই পরীক্ষার দিন লেখা রয়েছে এ বছরের ৪ জানুয়ারি। সময় সকাল সাড়ে এগারোটা।
নাকাশিপাড়া এলাকার এক কর্মপ্রার্থী বলেন, ‘‘লোয়ার ডিভিসন অ্যাসিস্টান্ট পদে চাকরির জন্য আবেদনপত্র পূরণ করি। ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ২৯ মার্চ অ্যাডমিট কার্ড সংগ্রহ করি। তারপরই অবাক হয়ে যাই। কারণ, সেখানে পরীক্ষার দিন উল্লেখ ছিল ৪ জানুয়ারি। পরীক্ষাকেন্দ্র, চাকদহ কলেজ। অ্যাডমিট কার্ড পাওয়ার আগেই কী করে পরীক্ষা হয়ে গেল?’’
ওই যুবকের অভিযোগ, এরপর পরীক্ষার ফর্ম পূরণ সংক্রান্ত জেলা পরিষদের নিজস্ব ‘হেল্প লাইন’-এ তিনি ফোন করেন। কিন্তু সেখান থেকে কোনও সদুত্তর পাননি। এমন অভিজ্ঞতা হয়েছে আরও বেশ কয়েকজনের। তাঁদের একজনের কথায়, ‘‘আমাদের মতো বেকার ছেলেদের নিয়ে এ ভাবে ছিনিমিনি খেলাটা ঠিক নয়।’’
তবে জেলা পরিষদ সূত্রের খবর, ওই তিনটি পদের জন্য এখনও পরীক্ষা নেওয়া হয়নি। জেলা পরিষদের নিয়োগ সংক্রান্ত বিভাগে কর্মরত এক আধিকারিক বলেন, ‘‘ওই তিনটি পদে পরীক্ষার জন্য দু’বার আলোচনা হয়েছে। একবার পরীক্ষার দিনও স্থির হয়েছিল। কিন্তু শেষমেশ তা প্রকাশ্যে ঘোষণা
করা হয়নি।’’
তা হলে এমন বিভ্রান্তির কারণ কী?
সে বিষয়ে অবশ্য জেলা প্রশাসনের তরফে কোনও স্পষ্ট উত্তর মেলেনি। নদিয়ার অতিরিক্ত জেলাশাসক (জেলা পরিষদ) দীপাঞ্জন ভট্টাচার্য বলেন, ‘‘এটুকু বলতে পারি, এখনও পর্যন্ত ওই তিনটি পদে নিয়োগের জন্য কোনও পরীক্ষা নেওয়া হয়নি। তবে নদিয়া জেলার ওয়েবসাইট (www.nadia.gov.in) থেকে কী ভাবে এ সব হল তা খোঁজ নিয়ে দেখব।’’
তবে এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসতেই শুরু হয়েছে রাজনৈতিক চাপানউতোর। জেলা পরিষদের অভ্যন্তরে বিরোধীরা তো বটেই, শাসক দলের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত বেশ কয়েকজন পদাধিকারীও বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।
জেলা পরিষদের এক আধিকারিক বলেন, ‘‘আসলে পরীক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত করে নাম কে ওয়াস্তে কোনও পরীক্ষা নিয়ে শাসক দল নিজেদের অনুগত কর্মপ্রার্থীদের কাজের সুযোগ করে দিতে চাইছে।’’ জেলা পরিষদের এক সিপিএম সদস্য বলছেন, ‘‘জেলা পরিষদে অনেক তুঘলকি ব্যাপার-স্যাপার চলছে। এটা তারই অঙ্গ। পরিকল্পনা করে কর্মপ্রার্থীদের বিভ্রান্ত করার জন্য এটা করা হয়েছে।’’
তবে এ সব অভিযোগ অস্বীকার করে নদিয়া জেলা পরিষদের সভাধিপতি বাণীকুমার রায়ের সাফাই, ‘‘আমি নিয়োগ সংক্রান্ত কমিটিতে নেই। তাই এটা নিয়ে কিছু বলতে পারব না।’’
কিন্তু এত সব বিভ্রান্তি যেটাকে কেন্দ্র করে সেই চাকরির পরীক্ষা কবে হবে? সে প্রশ্নেরও উত্তর মেলেনি জেলা প্রশাসনের কোনও কর্তার কাছে। ওয়েবসাইটে খোঁজ নেওয়ার কথাও আর বলছেন না জেলা পরিষদের কোনও কর্তা!