ঘটনা-১: দিন কয়েক আগে পাশের বাড়ির মুমূর্ষু এক রোগীকে করিমপুর গ্রামীণ হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছিলেন মুরুটিয়ার কৌশিক সরকার। রাতদুপুরে বাড়ি থেকে তা়ড়াতাড়ি বেরনোর সময় টাকা নিতে খেয়াল ছিল না। পরে পকেটে এটিএম কার্ডটি দেখে তিনি আশ্বস্ত হন। চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন নিয়ে ওষুধ কেনার আগে তিনি নিশ্চিন্তে ঢুকেছিলেন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের একটি এটিএম কাউন্টারে। কিন্তু সেটি বিকল থাকায় পাশের আর একটি কাউন্টারে ঢুকেছিলেন। সেখান থেকেও ব্যর্থ হয়ে ফিরতে হয় তাঁকে। শেষতক পরিচিত একজনকে ফোন করে তাঁর কাছ থেকে টাকা ধার করে ওষুধ কেনেন তিনি।
ঘটনা -২: কাছারিপাড়ার এক বিএসএফ জওয়ান আর পাঁচ জন সহকর্মীর এটিএম কার্ড নিয়ে টাকা তুলতে এসেছিলেন করিমপুরে। লম্বা লাইনে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পরে তাঁকে শুনতে হয়, ‘‘টাকা শেষ। কখন টাকা আসবে কেউ জানে না।’’ টাকা না পেয়ে অগত্যা তাকে খালি হাতেই ফিরতে হয় প্রায় বিশ কিমি দূরে নিজের কর্মস্থলে।
ঘটনা-৩: কলকাতা থেকে সপরিবার এক মহিলা তেহট্টে বাবার বাড়িতে এসেছিলেন। এত দূরের রাস্তায় সঙ্গে নগদ বেশি টাকা তাঁরা আনেননি। পুজোতে আসতে পারবেন না। তাই এই সময়েই বাবা-মায়ের জন্য কেনাকাটা করার পরিকল্পনা ছিল তাঁদের। কিন্তু তাঁদের সেই ইচ্ছে আর পূরণ হয়নি। সৌজন্যে তেহট্টের বেহাল এটিএম পরিষেবা।
গোটা মহকুমা জুড়ে এই বেহাল এটিএম পরিষেবায় জেরবার লোকজন। অভিযোগ, দিনের পর দিন সংশ্লিষ্ট ব্যাঙ্কগুলোতে বিষয়টি জানিয়েও কোনও সুরাহা হয় না। বছর দশেক আগেও এটিএমের সুবিধার কথা ভাবেনি সীমান্ত ঘেঁষা এই জনপদ। তখন ব্যাঙ্কের লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ অপেক্ষার পরে টাকা তোলায় ছিল দস্তুর। তারপর করিমপুরের দু’টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক এটিএম পরিষেবা চালু করে। তখন স্থানীয় বাসিন্দারা ভেবেছিলেন, এ বার বুঝি সুদিন এল। প্রযুক্তির কল্যাণে যখন খুশি টাকা তোলা যাবে। ব্যাঙ্কে আর লাইন দিয়ে দাঁড়াতে হবে না। অথচ বাস্তবে দেখা গেল, এটিএমের উপরে ভরসা করে ভোগান্তি বেড়েছে বই কমেনি।
এলাকায় এটিএম কাউন্টারের সংখ্যা বাড়লেও প্রযোজনীয় পরিষেবা মিলছে না। মুরুটিয়ার কৌশিকবাবুর অভিযোগ, “সে দিন রাতে এটিএম খারাপ থাকার কারণে যে কী বিপদে পড়েছিলাম বলে বঝাতে পারব না। পরিচিত একজনের কাছে টাকাটা পেয়েছিলাম তাই রক্ষে।’’ আর ক্যাম্পে ফিরে যাওয়ার আগে বিরক্তির সঙ্গে ওই বিএসএফ জওয়ান বলছিলেন, ‘‘ওই দূর থেকে এস এ ভাবে হয়রান হয়ে ফিরে যাওয়ার কোনও মানে হয়, বলুন?’’ আর কলকাতার বাসিন্দা সুস্মিতা বিশ্বাস বলছেন, ‘‘পুজোর সময়ে ফি বছর বাবার বাড়িতে আসি। এ বার আসা হবে না বলে আগেই চলে এসেছিলাম। ইচ্ছে ছিল বাবা-মায়ের জন্য পুজোর কেনাকাটা এখান থেকেই করে নেব। কিন্তু সে আর হল কই! ভাবতে আশ্চর্য লাগে, তেহট্ট মহকুমা সদর। অথচ এটিএমগুলোর এমন হাল কেন?’’
করিমপুর বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সম্পাদক সুবোধ রায় বলছেন, ‘‘আশেপাশের বহু লোকজন করিমপুরে বাজার করতে আসেন। এখানে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাঙ্কের বেশ কয়েকটি এটিএম কাউন্টার রয়েছে। তবে সেগুলি বেশিরভাগ সময় হয় খারাপ নাকে, নাহলে টাকা থাকে না। ফলে ব্যবসা মার খাওয়ার পাশাপাশি বিরক্ত হন সাধারণ মানুষ। এই সমস্যার কথা আমরা ব্যাঙ্কগুলোকে জানিয়েছি। কিন্তু কই, সমসযার তো কোনও সুরাহা হচ্ছে না।’’
করিমপুরের শিবপ্রসাদ দত্ত, ধোড়াদহের দীপঙ্কর সাহার অভিযোগ, করিমপুরের জামতলা মোড় থেকে থানা মোড় পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যাঙ্কের প্রায় ন’টি এটিএম কাউন্টার রয়েছে। অথচ দুই একটি ছাড়া সবগুলিই নিয়মিত অকেজো হয়ে পড়ে থাকে। বেশিরভাগ এটিএম কাউন্টারে কোনও রক্ষী থাকেনা। রাতবিরেতে নিরাপত্তার অভাব বোধ করেন অনেকেই।”
একই সমস্যা মহিষবাথান ও তেহট্টের এটিএমেও। তেহট্টের ভবেন হালদার বলছেন, ‘‘এলাকায় সব মিলিয়ে প্রায় দশটি এটিএম থাকলেও মাঝেমধ্যেই সেখানে টাকা থাকে না। কোন একটি এটিএমে টাকা থাকলেও লম্বা লাইন রাস্তায় উঠে আসে।”
স্থানীয় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের এক আধিকারিক বলছেন, ‘‘এখন গ্রাহক সংখ্যা বেড়েই চলেছে। প্রতিদিন এটিএমে টাকা রাখলেও মুহূর্তেই তা শেষ হয়ে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে লিঙ্কের সমস্যাও হচ্ছে। আমরা চেষ্টা করছি সমস্যা সমাধানের।’’ তেহট্টের মহকুমাশাসক অর্ণব চট্টোপাধ্যায় বলছেন, ‘‘সমস্যার কথা শুনেছি। ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষকেও দ্রুত এই সমস্যা মেটানোর কথা বলেছি।’’