Advertisement
E-Paper

দেবী সাকুল্য সাড়ে তিন সেমি

দুর্গাপুজো তো বটেই। কিন্তু অন্যদের থেকে স্বতন্ত্র। কোথাও পুজোর মেয়াদ ন’দিন। কোথাও পুজোর দিনগুলো জুড়ে সংকীর্তন। কোথাও আবার, সন্ধিপুজোই নেই। নবদ্বীপের এমনই কয়েকটি পুজোর খোঁজ দিচ্ছেন দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়। গঙ্গার কোল ঘেঁষে বিরাট যজ্ঞবেদী। লাল টকটকে মেঝেতে পদ্মাসনে বসে ২২ জন ব্রাহ্মণ আবৃত্তি করছেন বৈদিক মন্ত্র। সামনে ষোড়শ স্তম্ভযুক্ত যজ্ঞস্থলী। ওই বাইশ ব্রাহ্মণকে বৃত্তাকারে ঘিরে বসেছেন আরও পঞ্চাশ জন। পরনে পট্টবস্ত্র, ঊর্ধ্বাঙ্গে উত্তরীয়। তাঁরা সমবেত কন্ঠে উচ্চারণ করছেন সামবেদের মন্ত্র।

শেষ আপডেট: ০৭ অক্টোবর ২০১৬ ০২:১২
নবদ্বীপের হরিসভা বাড়ির হরগৌরী। —নিজস্ব চিত্র

নবদ্বীপের হরিসভা বাড়ির হরগৌরী। —নিজস্ব চিত্র

বিশ্বকল্যাণের নবদুর্গা

গঙ্গার কোল ঘেঁষে বিরাট যজ্ঞবেদী। লাল টকটকে মেঝেতে পদ্মাসনে বসে ২২ জন ব্রাহ্মণ আবৃত্তি করছেন বৈদিক মন্ত্র। সামনে ষোড়শ স্তম্ভযুক্ত যজ্ঞস্থলী। ওই বাইশ ব্রাহ্মণকে বৃত্তাকারে ঘিরে বসেছেন আরও পঞ্চাশ জন। পরনে পট্টবস্ত্র, ঊর্ধ্বাঙ্গে উত্তরীয়। তাঁরা সমবেত কন্ঠে উচ্চারণ করছেন সামবেদের মন্ত্র।

নদীর তীর বরাবর ছড়িয়ে পড়া সামগানের একটানা সুর। চলছে ‘অরণী মন্থন’ অর্থাৎ বৈদিক মন্ত্র এবং সামগানের মধ্য দিয়ে কাষ্ঠ যজ্ঞের প্রাচীন প্রক্রিয়া।

প্রতিপদ তিথিতে ওই আগুন জ্বলে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই নবদ্বীপের বিশ্ব কল্যাণ ফাউন্ডেশনের নবদুর্গার পুজো শুরু হয়। আগুন জ্বলে টানা ন’দিন, সঙ্গে বিরামহীন চণ্ডীপাঠ। উদ্দেশ্য থেকে উপস্থাপনা সবেতেই ব্যতিক্রমী এই নবদুর্গা। সংস্থার প্রধান পণ্ডিত বেনু মুখোপাধ্যায়ের মতে, একে আর পাঁচটা দুর্গাপুজোর সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে গেলে কিছুই বোঝা যাবে না। এখানে দুর্গা নয়, পুজো হয় চতুর্ভুজা দেবী চণ্ডীর। প্রতিপদ থেকে নবমী পর্যন্ত নবদুর্গার নয়টি পৃথক রূপের (শৈলপুত্রী, ব্রহ্মচারিণী, চণ্ডঘণ্টা, কুষ্মান্ডা, স্কন্দমাতা, কাত্যায়নী, কালরাত্রি, মহাগৌরী ও সিদ্ধিদাত্রী) পুজো হয়। সেই সঙ্গে সপ্তশতী (সাতশো) মহাযজ্ঞ। বেনুবাবুর দাবি, “যত দূর জানি গোটা ভারতে এই যজ্ঞ খুব অল্প জায়গাতেই হয়। এই যজ্ঞকে অশ্বমেধ যজ্ঞের সমতুল্য ধরা হয়।” বেনারস এবং উত্তর ভারতের বিভিন্ন জায়গা থেকে বৈদিক যজ্ঞে দক্ষ পুরোহিতেরা আসেন। তাঁদের দক্ষিণা দিতে হয় লক্ষাধিক টাকা। নানা রঙের তণ্ডুল দিয়ে যজ্ঞবেদীর বৈদিক অলঙ্করণ পুজোর অন্যতম আকর্ষণ।

হরগৌরী

মণিপুর রাজা ভাগ্যচন্দ্রের পরে নবদ্বীপে প্রকাশ্যে মহাপ্রভুর বিগ্রহ গড়ে সেবাপুজোর ব্যবস্থা করেছিলেন প্রখ্যাত নৈয়ায়িক ব্রজনাথ বিদ্যারত্ন মশাই। তাঁর হরিসভা মন্দিরে প্রায় দেড়শো বছর ধরে দুর্গা পুজোর অষ্টমীর দিনে ব্যতিক্রমী এই পুজো হয়ে আসছে। ঘরোয়া ভঙ্গিতে বসে থাকা শিব-পার্বতীর বিরাট পাথরের মূর্তি ষোড়শপচারে পুজো হয় বছরে দু’টি দিন। শিব চতুর্দশী বা শিবরাত্রি এবং মহাষ্টমীতে। চণ্ডীর ধ্যানেই পুজো হয় হরগৌরী মূর্তির। অন্ন ভোগ, যজ্ঞ বা সন্ধি পুজো নেই। হরিসভা মন্দিরের প্রধান বিবেকবন্ধু ব্রহ্মচারী বলছেন, ‘‘আমাদের অনুমান হরগৌরীর পুজো করে ব্রজনাথ বিদ্যারত্ন মশাই তৎকালীন সময়ে বৈষ্ণবদের সঙ্গে শাক্ত এবং শৈবদের সমন্বয় সাধনের কাজটি করতে চেয়ে ছিলেন। কেননা চৈতন্যদেবের মূর্তি গড়িয়ে পুজোর প্রচলন করার জন্য তিনি রাজরোষে পড়েছিলেন। সেই কারণে তিনি বিভিন্ন মতের মানুষকে তাঁর পাশে চেয়েছিলেন।’’

সমাজবাড়ি

বৈষ্ণবতীর্থ নবদ্বীপ দর্শনে আসা ভক্তদের কাছে অবশ্য দ্রষ্টব্য সমাজবাড়ি। সেই বিশিষ্ট বৈষ্ণব মন্দিরে প্রায় সোয়াশো বছর ধরে মহাসমারোহে দুর্গা পুজো হয়ে আসছে। তবে নানা দিক থেকে দুর্গা পুজোর চেনা ধরনের সঙ্গে সমাজবাড়ির পুজোর অনেক ফারাক। দশপ্রহরণধারিণী মহিষাসুরমর্দিনীর মৃন্ময়ী মূর্তির পুজো এখানে হয় না। বদলে বহু প্রাচীন এক পটচিত্রে আঁকা দেবী কাত্যায়নীর পুজো করা হয় এখানে। অনেকেই দাবি করেন, বৃন্দাবনে গোপিনীরা কৃষ্ণকে পাওয়ার জন্য শক্তি স্বরূপিনী দেবী কাত্যায়নীর পুজো করেছিলেন। মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা চরণদাস দেব সেই রীতি অনুসরণ করে পুজোর প্রচলন করেন।

ব্যতিক্রমী এই পুজোর বোধন ষষ্ঠীতে হয় না। পুজো শুরু সপ্তমীতে। নেই অষ্টমীর সন্ধিপুজোও। স্বতন্ত্র ধ্যানমন্ত্রে দেবীর পুজো হয়। একই সঙ্গে চলে চণ্ডী এবং গীতাপাঠ। গোটা পুজো জুড়ে চলে বিশেষ নাম সংকীর্তন। তবে সবচেয়ে আশ্চর্য ভোগের বিষয়টি। দেবীকে এখানে প্রতি দিন নিবেদন করা হয় পুরীর জগন্নাথদেবের মহাপ্রসাদ। দুপুরের অন্ন ভোগের সময় দেওয়া হয় নারায়ণকে উৎসর্গ করা প্রসাদ। আবার দশমীর দিন ওই চিত্রপট গঙ্গার ঘাট থেকে শোভাযাত্রা সহকারে ঘুরিয়ে আনা হয়।

অভয় মা

সাত সেন্টিমিটার লম্বা আর ৩.৫ সেমি প্রস্থের একটি দুষ্প্রাপ্য ধাতব মূর্তি। সিংহাসনে উপবিষ্টা দেবী। ডান পায়ের উপর বাঁ পা রাখা। এক হাতে বরাভয় মুদ্রা। অন্য হাতে কিছু একটা ধরা আছে। কিন্তু সেটা ঠিক কী তা স্পষ্ট নয়। পুরাত্ত্বাত্তিকদের মতে, ওই মূর্তি চণ্ডীমঙ্গলে বর্ণিত কালকেতুর ঘরে পুজিত মঙ্গলচণ্ডী মূর্তির প্রায় অনুরূপ। সেই মূর্তির মৃন্ময়ী রূপ গড়ে নবদ্বীপে অভয় মায়ের পুজো শহরের অন্যতম প্রাচীন এবং জনপ্রিয় পুজো। সারা বছর দেবীর পুজো বংশানুক্রমিক সেবাইতদের ঘরে হলেও দুর্গা পুজোর চার দিন নবদ্বীপ অভয় মা তলার মূল মন্দিরে হয়। প্রধানত অষ্টমীর সকালে অভয় মায়ের পুজো দিতে হাজার হাজার মানুষের দীর্ঘ লাইন পড়ে।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy