একদিকে যখন চড়চড় করে উঠছে ভোটের উত্তাপ আর ঠিক তার উল্টো দিকে অগোচরে ক্রমশ নিম্নগামী হচ্ছে পেঁয়াজের দাম। সেই সঙ্গে অস্বাভাবিক ভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে পেঁয়াজ রাখার নাইলনের বস্তা। সব মিলিয়ে চাষের খরচ তোলা তো দূরের কথা হাজার হাজার টাকা ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ছেন জেলার কৃষক। গভীর সঙ্কটের মধ্যে একটু একটু করে তলিয়ে যাচ্ছেন তাঁরা। অথচ এই ভোটের বাজারে তাঁদের কথা বলছে না কেউই। কোনও রাজনৈতিক দলই তাঁদের এই সঙ্কটের কথা তুলে ধরছেন না। আর সে কথা তুলে ‘অভিমানী’ পেঁয়াজ চাষিরা বলছেন, ‘ধর্ম নিয়ে কী করব? আমরা পেঁয়াজের দাম চাই।’
নদিয়া জেলায় বিভিন্ন ধরনের আনাজের চাষ হয়। ধান ও পাটে চাষের পাশাপাশি বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে পেঁয়াজের চাষ হয়। এই জেলার কৃষকরা মূলত ‘শুকসাগর’ পেঁয়াজের চাষ হয়ে থাকে। তার মধ্যে কেউ ‘লালপাতি’ আবার কেউ ‘পিলাপাতি’ শুকসাগর পেঁয়াজের চাষ করে থাকেন। গত বছর চাষিরা প্রায় ১১ থেকে ১৩ টাকা কেজি দরে পেঁয়াজ বিক্রি করেছিলেন। কিন্তু চলতি বছরে অবস্থা খুবই কঠিন। কারণ, এ বছর প্রথম থেকেই তেমন দাম পাচ্ছেন না তাঁরা। প্রথম দিকে কিছুটা দাম পাওয়া গেলেও বর্তমানে দামপ্রায় তলানিতে।
চাষিদের দাবি, সারের দাম বাড়ার পাশাপাশি অন্য খরচও লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। বাড়ছে মজুরি। আর তার উপর গোদের উপর বিষ ফোঁড়ার মত পেঁয়াজ রাখার নাইলনের বস্তার দাম। গত বছরও যে বস্তা ১০ থেকে ১৫ টাকা দরে কিনেছেন এ বছর সেই বস্তার দাম এক লাফে বেড়ে হয়েছে ৩৫ থেকে ৪০ টাকা। তাতে কৃষকের ক্ষতি আরও বেড়ে গিয়েছে। তেহট্ট ২ ব্লকের সাহেবনগর গ্রামের বাসিন্দা অর্পণ বিশ্বাস বলেন, “আমি এ বারে চার বিঘা জমিতে পেঁয়াজ চাষ করেছিলাম। কিন্তু ৬ টাকার বেশি দাম পেলাম না। প্রতি কুইন্টালে প্রায় চারশো টাকা করে লোকশান হয়েছে। প্রতি বিঘাতে ৩৫ কুইন্টাল করে পেঁয়াজ হয়েছে। তাহলে লোকশানের অঙ্কটা একবার হিসাব করে দেখুন।”
একই কথা বলছেন জয়দেব, সুবোধ মণ্ডলরাও। তাঁদের অবস্থা তো আরও করুণ। তাঁরা বিঘা প্রতি ৫ থেকে ৬ হাজার টাকার চুক্তিতে ভাগ চাষ করেছেন। সেই টাকাটাও দিতে হয়েছে। জয়দেব বলেন, “বছরে প্রায় ২৫ শতাংশ সুদে টাকা নিয়ে চাষ করেছিলাম। সেই টাকা শোধ করতে না পারলে তো সুদে ডুবে যাব।” সুবোধ বলেন, “আমরা স্ত্রী-সন্তানের গয়না ধারে রেখে টাকা জোগাড় করি। ফসল বিক্রি করে ছাড়িয়ে নেই। স্ত্রী-সন্তানদের গয়না আর তাঁদের গায়ে থাকে না, থাকে গয়নার দোকানে, বন্ধকের কারবারিদের কাছে।”
ফলে এক দিকে যেমন লোকশানের ধাক্কা অন্য দিকে আছে ক্রমবর্ধমান ঋণের বোঝা। এই দুইয়ের মাঝে ক্রমশ তলিয়ে যাচ্ছেন কৃষকরা। জয়দেব, অর্পণদের গলা দিয়ে যেন অভিমান ঝড়ে পড়ে। বলেন, “সবাই ধর্ম ধর্ম করছে। কিন্তু কই আমাদের কথা তো কেউ বলছে না।” বলেন, “ভোট আসে ভোট যায়, কিন্তু আমাদের অবস্থার পরিবর্তন হয় না।”
এ দিন এ প্রসঙ্গে গৌড়নগরের বাসিন্দা পেঁয়াজ চাষি নারায়ণ বিশ্বাস বলন, “বস্তার দামটাও যদি এত বেশি না হত তাহলেও কিছুটা ক্ষতি কম হত। সে দিকে কোনও দল বাপ্রশাসনের নজর নেই।” (চলবে)
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)