Advertisement
E-Paper

মোবাইলের ডাকে সাড়া দিয়ে ফাঁদে পা দিচ্ছে ডাহুকের দল

রোদ পোড়া কালো পিচ রাস্তার ঘেঁষে ধুধু সবুজ ধানি জমি। আশপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসতহীন মাঠ আর জলা। তারই মাঝে ঝোপের আড়ালে লাল রঙের প্লাস্টিকের একটা চাকতি পরম যত্নে সবুজ চাদরে জড়ানো। একটা সরু লিকলিকে তার ঝোপ ঝাড় ছুঁয়ে হারিয়ে গিয়েছে। আর সেই লাল মোবাইল অনর্গল ডেকে উঠছে তার স্বজাতির সুর— উপ উপ তিররর। ডাকটা যেন রোদ-জলআর জলা জমির শূন্যতা ছুঁয়ে হারিয়ে যাচ্ছে দূরে কোথাও।

সেবাব্রত মুখোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ১৮ মে ২০১৬ ০১:৩৪
বেলডাঙার মাঠে উদ্ধার হওয়া দু’টি ডাহুক। (ইনসেটে) সেই মোবাইল ও লাউড স্পিকার। — নিজস্ব চিত্র

বেলডাঙার মাঠে উদ্ধার হওয়া দু’টি ডাহুক। (ইনসেটে) সেই মোবাইল ও লাউড স্পিকার। — নিজস্ব চিত্র

রোদ পোড়া কালো পিচ রাস্তার ঘেঁষে ধুধু সবুজ ধানি জমি। আশপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসতহীন মাঠ আর জলা। তারই মাঝে ঝোপের আড়ালে লাল রঙের প্লাস্টিকের একটা চাকতি পরম যত্নে সবুজ চাদরে জড়ানো।

একটা সরু লিকলিকে তার ঝোপ ঝাড় ছুঁয়ে হারিয়ে গিয়েছে। আর সেই লাল মোবাইল অনর্গল ডেকে উঠছে তার স্বজাতির সুর— উপ উপ তিররর। ডাকটা যেন রোদ-জলআর জলা জমির শূন্যতা ছুঁয়ে হারিয়ে যাচ্ছে দূরে কোথাও। ডাহুক ডাকছে।

চাদরের নিচে লুকোনো মোবাইল সেটের পাশেই সযত্নে রাখা সুতোর ফাঁস। কে ডাকে রে? খোঁজ নিতে এসেই ওরা পাঁদে দিচ্ছে একে একে।

বেলডাঙার হরেকনগর স্কুল মাঠেরলাগোয়া জলা জমির ধারে এমনই ফাঁসে আটকে যাচ্ছে সাদা বুক, লম্বা ঠ্যাং ধূসর ডানার অজস্র ডাহুক।

জালে ফেঁসে ঝটপট করার ফাঁকে ঝোপ থেকে বেরিয়ে এসে দু’টো পোক্ত হাত তাকে ধরে নিয়ে বস্তায় সেঁদিয়ে দিয়ে পের চালু করে দিচ্ছে মোবাইল। সঙ্গিনীর ডাকে সাড়া দিয়ে এক ‘অভাগা’ ডাহুকের অপেক্ষায় ফের চুপ করে য়াচ্ছে চরাচকর।

খর জৈষ্ঠ্য। পুকুর হারিয়ে গিয়েছে। যে কচুরিপানা কিংবা জলজ আগাছায় আড়ালে তারা দিবারাত্র কাবার খুঁটে কায় সে সবও শুষে নিয়েছে ৬বধির রোদ্দুর। মাঠ-ঘাটের আড়ালে সেচ নালা গুলোও ফাটা চামড়ার মতো পড়ে রয়েছে। সেখানেই এই ছোট জলা জমি আর ধান খেতের আড়ালে শীর্ণ জলধারাগুলোই এখন ডাহুক, জলমুরগি (ওয়াটার হেন), মুরহেন কিংবা জ্যাকনা’র এক জলজ পাখিগুলির একমাত্র ভরসা। ছোট পোকা, তেচোখা মাছ, আর ব্যাঙাচির খোঁজে এ কানেই ভিড় করে তারা।

বেলডাঙার ওই জলাজমির পাশে তাই এখন ডাহুকের ভরা সংসার। আর সেখানেই পাঁদ পেতেছে ‘শিকারিরা’।

বিশিষ্ট পক্ষী বিশারদ বিশ্বজিৎ রায়চৌধুরী বলছেন, ‘‘এদের শিকারি বলতেও ঘেন্না হয়! এরা এক ধরনের চোরাকারবারি। খেটে না খেয়ে সহজে পাখি ধরে মোটা টাকা কামাচ্ছে।’’

বস্তুত মুর্শিদাবাদ, নদিয়া, হুগলি কিংবা উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিভিন্ন জলা জমির ধারে এ ভাবেই ফাঁদ পেতে ডাহুক শিকার এই গ্রীষ্মেন রোজগারের সহজ উপায়। কোথাও দেড়সো কোথাও বা দু’শো টাকায় সেই ডাহুক বিক্রি করে রাতারাতি তাদের অনেকেই মোটা টাকা কামাচ্ছে।

মঙ্গলবার, বেলডাঙার একটি পশুপ্রেমী সংস্থার উদ্যোগে ওই মাঠে হানা দিয়ে উদ্ধার করা হয়েছে মোবাইল, স্পিকার, সরু সুতোর জাল। উদ্ধার করা হয়েছে দু’টি ডাহুকও। বিকেলে কোলা মাঠেই সেই ডাহুক দু’টিকে উড়িয়েও দেওয়া হয়েছে।

পুলিশ জানিয়েছে ওই মোবাইলের সূত্র ধরে খোঁজ করা হচ্ছে চোরা কারবারিদের।

পাখি শিকারের বিভিন্ন মার-প্যাঁচে বেলডাঙার নাম রয়েছে। বছর কয়েক আগে, বেলডাঙার কাজিসাহা, কাপাসডাঙা, মির্জাপুর গ্রামে অবাধে চলত ভরুই পাখি শিকার। কিন্তু পুলিশ ও স্থানীয় পরিবেশপ্রেমী সংস্থাগুলি নড়ে চড় বসায় গত বছর থেকে সে শিকার পর্বে কিঞ্চিৎ ভাঁটা পড়েছে। গত পাঁচ মাসে পুলিশ প্রায় সাড়ে তিন হাজার ভরুই পাখি উদ্ধার করেছে। গ্রেফতারও করা হয়েছে দুই গ্রামবাসীকে।

স্থানীয় গ্রামবাসীরা জানাচ্ছেন, ভরুইয়ের কদর বাড়ে মূলত শীতে। সে সময়ে ডজন দরে বিক্রি করা হয় ভরুই। গত জানুয়ারিতে বেলডাঙার কাজিসাহা এলাকার পাতবিল এলাকায় তল্লাশি চালিয়ে পুলিশ ওই ভরুই উদ্ধার করেছিল।

জেলা পুলিশের এক কর্তা বলছেন ‘‘সেখানে দু’বার অভিযান চালিয়েই মিলেছিল প্রায় শ’খানেক ভরুই।’’ স্থানীয় পরিবেশ প্রেমী সংস্থার এক কর্তা জানান, ‘‘পুলিশ তল্লাশি চালাতে গিয়ে দেখে, মাছরাঙা, গাঙশালিখ, গাইবগলা, বালিহাস, হাটিটি, কাদাখোঁচা এমনকী বাঁশপাতি পাখিও বিলের ধারে ফাঁস দিয়ে ধরা হয়।’’ কখনও তারা পড়ে পড়ে মরেছে। কখনও বা সহৃদয় লোক তাদের পাঁসটুকু ছাড়িয়ে দিয়ে মুক্তি দিয়েছে।

‘বেলডাঙা বন্যপ্রাণ’ সংস্থার সম্পাদক ফারুক হোসেন বলেন, ‘‘আমদের এক সদস্যের কাছে জানতে পারি হরেকনগর মাঠে একটি সুন্দর দেখতে লাল স্পিকারকে ঝোপের মধ্যে রেখে তার সঙ্গে একটি মোবাইলের চিপ লাগিয়ে দেওয়া আছে। সেই চিপে ডাহুকের ডাক বাজছে অনর্গল।ডাক শুনে ঝোপ থেকে ডাহুক পাখি এসে চোরা শিকারিদের পাতা ফাঁদে পরছে।আজ আমরা দুটি ডাহুক পাখি ফাঁস থেকে উদ্ধার করে জল ও খাবার খাইয়ে উড়িয়ে দিয়েছি।’’

বেলডাঙা থানার ওসি মৃণাল সিংহ স্বীকার করছেন, ‘‘মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে ওই সংগঠনের ছেলেরা খুবই সক্রিয়। আমরা তাদের সব ব্যাপারে বন দফতরের সঙ্গে যোগাযোগ করে সহযোগিতা করছি।’’

mobile phone Gallinule
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy