চার-ছ কাটা জমিতে পায়রার খোপের মতো অগুন্তি ফ্ল্যাট-বাড়ির ভিড়— কলকাতা ও শহরতলির চেনা এই ছবিটা এখন ফ্রেম-বন্দি হয়ে উঠে এসেছে ঘোর মফস্সলেও।
গত কয়েক বছরে রাজ্যের ‘টায়ার-২’ শহরগুলিতে কলকাতার ফ্ল্যাট-সংস্কৃতির ছায়ায় ঢাকা পড়েছে। সেই তালিকায় বহরমপুরের মতো আড়ে বহরে বেড়ে ওঠা জনবসতও।সেখানে গত কয়েক বছরে ব্যক্তিগত উদ্যোগে বাড়ি তৈরির তুলনায় প্রমোটারের তৎপরতায় ফ্ল্যাট বাড়ি গড়ার প্রবণতা বেড়েছে বলে জানাচ্ছে নগরোন্নয়ন দফতরের একটি রিপোর্ট। আর, তার হাত ধরে বদলে গিয়েছে নবাবি শহরের সংস্কৃতিটাও।
নিতান্তই হাল আমলে ‘শহুরে’ হয়ে ওঠা এই সব জেলা শহরে ফ্ল্যাটের যে যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে, আবাসন নির্মাণের অন্তত বছর খানেক আগেই তার অধিকাংশ বিক্রি হয়ে যাওয়া সে প্রমাণই দিচ্ছে। তবে, সেই ফ্ল্যাট-সংস্কৃতির গেরোয় পড়ে কোথাও থমকে গিয়েছে নিকাশি ব্যবস্থা কোথাও বা নিয়ম না মানায় ফ্ল্যাট বাড়ির প্রবেশ পথের শীর্ণতা লজ্জা দিচ্ছে খোদ বাসিন্দাদের। গোরাবাজার এলাকার একটি ফ্ল্যাটের বাসিন্দা বলছেন, ‘‘ফ্ল্যাট করব বলে খুব মাতলাম ঠিকই, তবে এখন দেখছি, আগুন লাগলে এখানে দমকল ঢোকার রাস্তাই নেই।’’
কার্যত পরিকল্পনাহীন এই আবাসনের অধিকাংশেই বসেছে গভীর নলকূপ। পুরসভার এক কর্তা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, ‘‘অনুমতির তোয়াক্কা নেই, একের পর এক গভীর নলকূপ বসছে। আর এর ফলে বহরমপুরের ভূগর্ভস্থ জলের স্তরও নেমে যাচ্ছে হুহু করে।’’
বদলে যাচ্ছে পড়শি-সংস্কৃতিও। ‘স্বপ্নের’ ফ্যাটে উঠে এসে অনেকেই দেখছেন, পড়শির সঙ্গে তেমন আলাপই জমছে না। স্বর্ণময়ী এলাকার একটি ফ্ল্যাটের বাসিন্দা, জাহানারা বিবি বলছেন, ‘‘মন খারাপ লাগে। সেই স্বজন হয়ে ওঠা পড়শিদেরই খুঁজে পাই না ফ্ল্যাটে এসে!’’
ববহরমপুরের বিমল কালচারাল হল ও লাগোয়া বাগান মিলে প্রায় ৮০ কাঠা জায়গায় একটি আবাসনে প্রায় দেড়শো বাসিন্দার বসত। চক্ষু বিশেষজ্ঞ উৎপল সিংহচৌধুরী তাঁর পৈতৃক ওই সম্পত্তি প্রোমোটারের হাতে তুলে দিয়েছিলাম। এখন সেখানেই আবাসন। একই ভাবে আইনজীবী বৈকুণ্ঠ সেনেরে সৈয়দাবাদের বাড়ি ভেঙে গড়ে উঠেছে আবাসন। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে—শহর জুড়ে যে এত বহুতল আবাসন ও শপিং মল গড়ে উঠছে। তার কী সরকারি নিয়ম মেনে? বহরমপুর নাগরিক সমিতির পক্ষে বিষাণ গুপ্ত বলেন, ‘‘নিয়ম মেনে বহুতল আবাসনের নকশা অনুমোদন দেওয়া হয় বলে মনে হয় না। তার বড় প্রমাণ বহরমপুর পুরসভার বিরুদ্ধে কলকাতা হাইকোর্টে মামলা ।’’
বহরমপুরের পুরপ্রধান নীলরতন আঢ্য অবশ্য নিয়ম মেনে নকশা অনুমোদনের দাবি করেছেন।
আর সংস্কৃতি?
তাঁর তিন পুরুষের ভিটে ছেড়ে ফ্যাটে উঠে আসা এক দম্পতি বলছেন, ‘‘অনেক স্বপ্ন নিয়ে এসেছিলাম জানেন। এখন হাত কামড়াচ্ছি।’’ কিন্তু ফেরার পথ যে বন্ধ।