বাংলাদেশ সীমান্ত লাগোয়া এক-একটা চর— যেন এক-একটা বিচ্ছিন্ন ভুবন। নির্মল চর, চর নাড়ুখাকি, চর পিরোজপুর, চর বাজিতপুর— পদ্মার দু’টি শাখার ফাঁক জুড়ে ছড়ানো খান আটেক ভূখণ্ড।
ওই সব চরে সভ্যতার চিহ্ন বলতে সৌরবিদ্যুৎ-চালিত হাতে গোনা কয়েকটি টিমটিমে বাতি, অনিয়মিত ভাবে চলা কয়েকটি প্রাথমিক স্কুল, কয়েকটি মোটরবাইক, ব্যাটারি চালিত কয়েকটি টিভি এবং রেডিও।
আর রয়েছে কয়েকটি মোবাইল ফোন। টাওয়ারের অভাবে কোনও কোম্পানির ফোন ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সাকুল্যে পাঁচ-ছ’ঘণ্টা সচল, কোনও কোম্পানির ফোন তারও কম। ফোনে চার্জ দিতে যেতে হয় মূল ভূখণ্ডে। গ্রীষ্মে আদিগন্ত বিস্তৃত ধূ-ধূ বালির চর পার হয়ে, ভরা বর্ষায় ঘণ্টা দুয়েক ধরে উত্তাল পদ্মার জল ঠেলে। পাঁচ-দশ টাকা ভাড়া দিয়ে ফোন চার্জ করানোর পর ফেরার ঝক্কিও সেই একই রকম।
প্রধানমন্ত্রীর ‘মোবাইল ব্যাঙ্ক’ চালুর কথা শুনে সেই চরবাসীদের এখন মাথায় হাত।
আখরিগঞ্জের পদ্মাপাড়ে এক সময়ে বাড়ি ছিল ফরওয়ার্ড ব্লকের জেলা কমিটির সদস্য অনন্ত মণ্ডলের। সর্বগ্রাসী পদ্মা তাঁর ভিটে খেয়েছে ছ’বার। সত্তরোর্ধ্ব অনন্ত বলেন, ‘‘পদ্মার দু’টি শাখার মধ্যে জব্দ হয়ে পড়ে থাকা নির্মল চরে তো মোবাইল ফোনের টাওয়ারই মেলে না। তা ছাড়া মোবাইলের ব্যাটারি চার্জ দিতে দুই-আড়াই ঘণ্টার পথ উজিয়ে আসতে হয় খড়িবোনায়। সেখানে ঘণ্টাখানেক ধরে চার্জ দেওয়ার পর ফের দুই-আড়াই ঘণ্টার পথ ভেঙে চরে ফেরা। এমন ভৌগলিক অবস্থানের মানুষদের জন্য ‘মোবাইল ব্যাঙ্ক’ চালু হলে দুর্গতির কোনও শেষ থাকবে না।’’
রানিতলা এলাকার নির্মল চরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে আলেকপাড়া, শয়তানপাড়া, পাতিবোনা, মহিষমারি, চরশ্রীকৃষ্ণ, মাঝচরের মতো ১২টি গ্রাম। কোনও গ্রামে ৫০-৬০ ঘরের বাস, কোনও চরে শতাধিক পরিবার। বাংলাদেশের কাছাকাছি এলাকার বসতি থেকে মূল ভূখণ্ড খড়িবোনায় পৌঁছতে আরও বেশি সময় লাগে। মানে আরও বেশি ভোগান্তি। সেই ভোগান্তি সইতে হয় সাত-আটটি চরের হাজার পঁচিশেক মানুষকে।
নির্মল চরের মতোই দুরবস্থা রঘুনাথগঞ্জ থানার চর বাজিতপুরের। ওই এলাকার গ্রাম পঞ্চায়েত সদস্য, কংগ্রেসের আব্দুল সাত্তার বলেন, ‘‘চরে মোবাইল ব্যবহার করা বেশ ঝক্কির ব্যাপার। হামেশাই টাওয়ার থাকে না। চরে বিদ্যুৎ না থাকায় মোবাইলের ব্যাটারিতে চার্জ দিতে যেতে হয় পদ্মা পেরিয়ে মূল ভূখণ্ডে বড় শিমুল এলাকায়। মাথাপিছু নৌকা ভাড়া দিয়ে আসা-যাওয়া মিলে ২০ টাকা। সঙ্গে মোটরবাইক থাকলে মোট ৪০ টাকা। যাওয়া-আসা ও ব্যাটারি চার্জ দিতে লেগে যায় পাঁচ ঘণ্টা। তাই রোজ চার্জ দেওয়া সম্ভব হয় না। এই অবস্থায় ‘মোবাইল ব্যাঙ্ক’ চালু হলে আমরা ভাতে মারা যাব।’’
পদ্মার চরে আজও অধিকাংশ পণ্য কেনাবেচা হয় টাকার বদলে বিনিময় প্রথায়। রঘুনাথগঞ্জের চর পিরোজপুর প্রাথমিক স্কুলের পার্শ্বশিক্ষক বীরেন মণ্ডলের মতে, ‘‘দু’টি কোম্পানি বাদে অন্য সব কোম্পানির মোবাইলের টাওয়ার ওই চরে মেলে না। ওই দু’টি কোম্পানির টাওয়ারও সব সময় থাকে না। মোবাইল ব্যাঙ্কিং চালু হলে চরের মানুষের বাঁচার অধিকারটাই কেড়ে নেওয়া হবে আসলে।’’