Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

১৭ জানুয়ারি ২০২২ ই-পেপার

শৌচালয় থাকলে মরতে হত না বৌমাকে, আক্ষেপ শ্বশুরের

বিমান হাজরা
অরঙ্গাবাদ ০৬ মে ২০১৫ ০০:৩৭

বাড়িতে শৌচালয় না থাকাই কাল হল। সোমবার সন্ধ্যায় গঙ্গার চরে শৌচকর্ম করতে গিয়েই গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যু হল বছর পঁচিশের আসিয়া বিবির। পরিবারের আক্ষেপ, গড়িমসি না করে বাড়িতে এত দিনে শৌচালয় তৈরি করে ফেলতে পারলে এ ভাবে প্রাণ যেত ঘরের বউয়ের!

সম্প্রতি বহরমপুরের ব্যারাক স্ক্যোয়ার মাঠে ‘নির্মল বাংলা দিবস’-এর অনুষ্ঠানে ঘরে ঘরে শৌচালয় তৈরির শপথ নিয়েছিলেন জেলার প্রশাসনিক কর্তারা। তার সপ্তাহ ঘুরতে না ঘুরতেই আসিয়া বিবির পরিণতি মুর্শিদাবাদের ‘নির্মল জেলার’ চিত্রটা বেআব্রু করে দিয়েছে। সম্প্রতি গুজরাটে ন’বছরের একটি মেয়ে শৌচকর্ম করতে রাতের বেলায় বাইরে বেরিয়েছিল। সেক্ষেত্রে অবশ্য গুলি নয়, আট-দশটি কুকুর কামড়ে মারে তাকে।

সুতি থানার ইমামবাজারের গঙ্গার চরে প্রাণঘাতী ওই গুলি কে চালিয়েছিল সীমান্তে পাহারারত বিএসএফ, নাকি পাচারকারীরা—তা নিয়ে মঙ্গলবার পর্যন্ত ধন্দ কাটেনি। এ দিন জঙ্গিপুর পুলিশ মর্গে আসিয়া বিবির ময়নাতদন্ত হয়। সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক পুলিশকে জানিয়েছেন, ওই মহিলার পিঠ দিয়ে গুলি ঢুকে নাভির পাশ দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছে। একাধিক অরগান ফুটো হয়ে গভীর ক্ষত থেকে দীর্ঘক্ষণ রক্তক্ষরণ হয়েছে। তাতেই মৃত্যু হয় আসিয়ার। জেলার পুলিশ সুপার সি সুধাকর বলেন, ‘‘গুলিবিদ্ধ হয়েই তাঁর মৃত্যু হয়েছে। তবে গুলি কারা, কেন ছুঁড়ল পরিষ্কার নয়। মৃতের পরিবারের পক্ষ থেকে কোনও অভিযোগ সুতি থানায় জমা পড়েনি। পুলিশ নিজেই তদন্ত শুরু করেছে।’’

Advertisement

কী ঘটেছিল সোমবার সন্ধ্যায়?

আসিয়ার সঙ্গীদের একজন রোজিনা বিবি বলেন, ‘‘আঁধার নামতে আমরা জনা পাঁচেক প্রতিবেশি মহিলা শৌচকর্ম সারতে নদীর চরে যাই। কিছু বুঝে ওঠার আগেই আসিয়ার পিঠে গুলি লাগে। বাবারে বলে ও কঁকিয়ে উঠে সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। আমাদের চিৎকারে গ্রামের লোকজন ছুটে আসে।’’ আসিয়ার স্বামী নাসিরুদ্দিন মহালদার, তাঁর ভাই ও বাবা সকলেই ভ্যান-রিকশা চালান। অবসরে কুলির কাজ করেন। ঘটনার সময়ে বাড়িতে ছিলেন না তাঁদের কেউই। বৌমা গুলিবিদ্ধ হয়েছে, এই খবর পেয়ে বাড়ি ফিরে শ্বশুর সনু মহালদার দেখেন, যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন আসিয়া। শতাধিক লোক তা দাঁড়িয়ে দেখছেন! সনু বলেন, ‘‘ওরা কেউই বৌমাকে হাসপাতালে নিয়ে যাননি। আমি সুতি থানায় নিয়ে যাই। সেখান থেকে পুলিশের গাড়িতে জঙ্গিপুর হাসপাতাল। ভর্তির ঘণ্টা দেড়েকের মধ্যেই মারা যায় ও!’’

সারারাত হাসপাতালে দেহ আগলে বসেছিলেন বৃদ্ধ শ্বশুর। থেকে থেকে বিলাপ করেছেন, কেন যে শৌচালয়টা তৈরি করলাম না! বাড়িতে শৌচালয় থাকলে বৌমাকে শৌচ করতে নদীর চরে যেতে হত না, গুলি খেয়ে এ ভাবে বেঘোরে প্রাণটাও খোয়াতে হত না! দেওর নাজিমুদ্দিন বলছেন, ‘‘অভাবের সংসার। তবু গড়িমসি করেই শৌচালয়টা বানানো হয়নি। কিন্তু, সে জন্যে যে বৌদির প্রাণ যেতে পারে তা কল্পনাও করিনি।’’ আসিয়ার দিদিমা তরিফুন বেওয়া নাতনির দেহের সামনে আছড়ে পড়েছেন বার বার। তিনি বেলন, ‘‘সাত চড়েও যার মুখে ‘রা’ নেই, সে শেষ পর্যন্ত গুলিতে মরল!’’

সোমবারের ঘটনার পরেই গ্রামবাসীর কেউ কেউ অভিযোগের আঙুল তুলেছিলেন বিএসএফের দিকে। এ দিন আসিয়ার মামা সাহাবুল শেখ বলেন, ‘‘সন্ধ্যের সময়ে ওই এলাকায় গরু পাচারকারীরা জড়ো হয়েছিল। তারাই গুলি চালিয়েছে।’’ তবে স্থানীয়দের অনেকে বলছেন, পাচারের নির্ঘণ্ট গ্রামের লোকেরা জানে। তা সত্বেও মেয়েরা ওখানে গেল কী করে? অনেকের পাল্টা মত, নির্ঘণ্ট জানলেও প্রকৃতির ডাক তো আর ঘড়ি মেনে আসে না!

বিএসএফের ২০ নম্বর ব্যাটেলিয়নের কমান্ডিং অফিসার রাজকুমার বাসাট্টা দুর্ঘটনার খবর পেয়ে নিজেই সুতির সীমান্তে এসেছিলেন। তিনি বিএসএফএর গুলি চালানোর অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন।

সুতির তৃণমূল বিধায়ক ইমানি বিশ্বাস শৌচকর্মে গিয়ে নিরীহ মহিলার মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘‘এটা দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা। অভিযুক্তদের খুঁজে বের করে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করুক পুলিশ।’’ তাঁর মত, ‘‘নিজেদের অপকর্ম ঢাকতে কিছু মানুষ গ্রামবাসীকে বিএসএফের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তোলার চেষ্টায় আছে। পাচারের স্বার্থে তাতে মদত দিচ্ছে দুষ্কৃতীরা।’’ তিনি এটাও মানছেন, ঘরে ঘরে শৌচালয় তৈরিতে অনেকটাই পিছিয়ে এই সব সীমান্তবর্তী এলাকা।

আসিয়ার এই গ্রামটি অরঙ্গাবাদ ১ গ্রাম পঞ্চায়েতের অধীনে। প্রধান কংগ্রেসের কৃষ্ণ দাসের প্রতিশ্রুতি, ‘‘কথা দিচ্ছি এক বছরের মধ্যে আসিয়াদের মতো কোনও পরিবারকে শৌচালয়হীন রাখব না।’’ তাতে আস্থা রাখছেন সকলেই।

আরও পড়ুন

Advertisement