গাঁয়ে গাঁয়ে বার্তাটা রটে গিয়েছিল আগেই।
ডোমকলের অলিগলিতেও চোঙ ফুঁকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল—‘আনন্দ সংবাদ, আনন্দ সংবাদ, আনন্দ সংবাদ। জিতপুর মাঠে বিরাট ফুটবল উৎসব। খেলবে নাইজেরিয়ার খেলোয়াড়। খেলা উপলক্ষে মাঠে মেলাও বসবে।’
ব্যস! তামাম তল্লাট কাঁপতে শুরু করল ফুটবল জ্বরে।
‘নাইজেরিয়া? তারা তো সব দানোর মতো দেখতে গো!’ আওয়াজ উঠল রাস্তার মোড়ে।
‘রাখো তো বাপু তোমার নাইজেরিয়া! খেলা না জানলে শুধু শরীর দিয়ে কী হবে?’ চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিল পাড়ার ক্লাব।
‘মেলা ও খেলা তো একই সঙ্গে। কত লোকের সঙ্গে দেখা হবে!’ উচ্ছ্বসিত তেমাথার মাচা।
‘ইদ উপলক্ষে এই খেলার আয়োজনটা বেড়ে হয়েছে কিন্তু।’ সোজাসাপ্টা মন্তব্য চায়ের দোকানে।
পাল্লা দিয়ে প্রচার চলেছে মুরুটিয়ার দিঘলকান্দিতেও।
গ্রামের রাস্তায় ধুলো উড়িয়ে দিনরাত এক করে ছুটে বেড়িয়েছে টোটো—‘সারা রাত ধরে ফুটবল। থাকবে বিদেশি খেলোয়াড়। মেলায় দোকান দিতে আগে থেকে যোগাযোগ করুন।’
সাড়াও মিলেছে সঙ্গে সঙ্গে।
ভিন গাঁ থেকে ব্যবসায়ীর ফোন, ‘আমি কিন্তু গত বারের থেকে একটু বেশি জায়গা নেব দাদা। এ বারে জিলিপি-পাঁপড় দু’টোই।’
নবদ্বীপের ক্লাব কর্তা জানতে চেয়েছেন, ‘গ্রাম পর্যন্ত গাড়ি ঢুকবে তো ভাই?’
গ্রামের কচিকাঁচারা পাড়া মাত করে রেখেছে, ‘ফুটবল হলেই পুজো শুরু।’
পড়শি জেলার সীমান্ত ঘেঁষা দু’টি গ্রাম, ডোমকল ও দিঘলকান্তিতে উৎসবের সুরটাই যেন বেঁধে দেয় ফুটবল। ডোমকল এ বার চার বছরে পা দিল। দিঘলকান্দির ১০ বছর।
কাজের খোঁজে ওই দুই গ্রামের বহু ছেলে থাকেন দুবাই, কাতার, সৌদি আরবে। কেউ আবার মুম্বই, সুরাত, ইনদওরে বছরভর মাথার ঘাম পায়ে ফেলেন।
নয়ানজুলির পাড়ে সাদা কাশ মাথা তুলতেই মুচকি হাসে দিঘলকান্দি, ‘‘ওরে, খেলার সময় তো এগিয়ে এল।’’
‘ফুটবল মাঠে কালো মাথার ভিড়। বল নিয়ে ছুটছে পাশের পাড়ার ইসরাইল। ওই ভিড়ে ওটা কার মুখ? আক্রম চাচা না? একগাল হেসে এ দিকেই তো আসছে। উফ্, কতদিন পরে দেখা।’— কাতারের একচিলতে ঘরে ভোরের স্বপ্নে ঘুম ভেঙে যায় ডোমকলের ওয়াসিম রেজার।
ওয়াসিমের স্বপ্ন সত্যি হয় ইদের পরেই। বিশ্বকর্মা পুজোর আগে ফুটবল ছুটিয়ে দুর্গোৎসবের সূচনা করে দেয় দিঘলকান্দিও।
আজ থেকে দশ বছর আগে দিঘলকান্দি কিশোর সঙ্ঘ প্রথম গ্রামে নৈশ ফুটবলের আয়োজন করে। কিন্তু খেলা শুরুর আগেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান ক্লাবের সদস্য সমীর মণ্ডল। তারপর থেকে সমীরবাবুর স্মৃতিতে ‘সমীর স্মৃতি কাপ’ ফুটবল প্রতিযোগিতা।
সারা রাত ধরে ফুটবল। মেলা। এন্তার লোক। দেদার মজা। এই সময় ভিন্ দেশে কাজে যাওয়া ছেলেরা বাড়ি ফেরে। শ্বশুরবাড়ি থেকে সটান বাবার বাড়ি চলে আসেন গাঁয়ের মেয়েরা। আত্মীয়দের ভিড়ে গমগম করে গোটা গ্রাম। এ বারেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
প্রতি বছরের মতো ২ সেপ্টেম্বরের নৈশ ফুটবল প্রতিযোগিতায় যোগ দিয়েছিল রাজ্যের ১৬টি ক্লাব। চ্যাম্পিয়ন হয়েছে দিঘলকান্দি কিশোর সঙ্ঘ। রানার্স হয়েছে বেতাই প্রভাত সঙ্ঘ। কিশোর সঙ্ঘের সম্পাদক রতন বালা জানাচ্ছেন, দিঘলকান্দি তো বটেই, ঝেঁটিয়ে লোক এসেছিল আশপাশের গ্রাম থেকেও। এ বারের বাজেট ছিল ১ লক্ষ ১০ হাজার টাকা। গ্রামের লোকজনের সাহায্য ও ভিন দেশে কাজ করা যুবকেরাই সেই অর্থ জুগিয়েছেন।
কাতার, সৌদি আরব, দুবাইয়ে কাজ করা অমিত বিশ্বাস, গণেশ টিকাদার, হরকুমার বালারা সমস্বরে বলছেন, ‘‘পরিবার, পরিজন ছেড়ে বিদেশ-বিভুঁইয়ে দিনরাত হাড়াভাঙা পরিশ্রম করি তো এই প্রাপ্তিটুকুর জন্যই।’’
একই সুর মুম্বই, সুরাত, ইনদওর থেকে ঘরে ফেরা ডোমকলের মনসুর মণ্ডল, আবেদ সর্দার, আসগর সেখ, ইন্তাজুল মণ্ডল, ওয়াসিম রেজাদের গলাতেও। তাঁরা কেউ ঠিকাদার, কেউ শ্রমিক। বছর চারেক আগে তাঁরা ইদের ছুটিতে বাড়ি এসেছিলেন। তখনই মাথায় চাপে ফুটবল ভূত। আর সত্যিই তো, এতদিন পরে ইদের ছুটিতে বাড়িতে এসে একদিনেই যদি সব ফুরিয়ে যায়, তাহলে কার ভাল লাগে?
অতএব, প্রলম্বিত আনন্দ, ইদ শেষ হয়েও শেষ হবে না, সকলে মিলে হইহই, পুরনো বন্ধুবান্ধব-স্বজনদের সঙ্গে দেখা করার উপায় কী?
উত্তর এসেছিল একটাই—ফুটবল। একের মধ্যে সব— গো...ও...ও...ল!
সেই শুরু। রবিবার দিনভর জিতপুর মেতে রইল ফুটবলে। তিনটে জেলা থেকে মোট আটটি দল যোগ দিয়েছিল প্রতিযোগিতায়।
ফাইনালে টাইব্রেকারে পণ্ডিতপুর সব্জি ব্যবসায়ী একাদশকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বারবাকপুর কলা ব্যবসায়ী সমিতি।
ওই একদিনের খেলায় মোট খরচ হয়েছে প্রায় দেড় লক্ষ টাকা। সেই টাকা খরচ করেছেন মনসুর মণ্ডল, আবেদ সর্দারদের মতো ঠিকাদারেরা। তাঁদের কথায়, ‘‘বছরের এই একটা সময়ে খরচ খরব না তো কখন করব? এত লোকজন, মেলা, আনন্দ— এ সবের জন্য আবেগটাই বড় কথা, টাকা নয়।’’
আর সেই আবেগে পিছিয়ে নেই স্থানীয় দলগুলোও। ইদের ফুটবলে চমক দিতে তারাও কলকাতা থেকে নিয়ে এসেছিল নাইজেরিয়ান ফুটবলারদের। সে খরচও কম নয়। প্রায় লক্ষাধিক টাকা খরচ করেছে এক একটি দল। সেই টাকাও জুগিয়েছেন এলাকার ব্যবসায়ীরা।
বারবাকপুর দলের কর্তা হাফিজুল সর্দারের কথায়, ‘‘টাকাও যেমন খরচ হয়েছে, তেমনি ট্রফিও ঘরে নিয়ে এসেছি কর্তা। এটা কি কম কথা!’’
কথা রেখেছেন খেপ খেলতে আসা নামিবিয়ার জ্যাকশন কিংবা উগান্ডার সেবাস্টিয়ান। তাঁরা বলছেন, ‘‘মাঠে ঘাস থাকায় একটু অসুবিধা হয়েছে। কিন্তু এখানকার মানুষের ফুটবল নিয়ে আবেগ আমাদের মুগ্ধ করেছে।’’ মুগ্ধ হয়েছে ডোমকলও। মাঠে পিলপিল করে লোক ঢুকতে শুরু হয়েছিল সকাল থেকেই। খেলা শুরু হয়নি। কিন্তু মেলা তো আছে। সেই মেলাতেই দেখা হয়ে গেল পুরনো বন্ধুর সঙ্গে। খেলার মাঠে কেউ খুঁজে পেলেন হারানো সম্পর্ক।
—‘কী রে, এখনও তো একই রকম আছিস!’
—‘তুই কিন্তু অনেক বদলে গিয়েছিস।’
জিলিপি খেতে খেতে টুকরো টুকরো কত কথা, গল্প। হাসতে হাসতে কেঁদে ফেলা।
শেষ বিকেলে বল জড়িয়ে যায় জালে। ঘুরতে ঘুরতে থেমে যায় নাগরদোলাও।
জয়ী দল ঘরে ফেরে— হিপ হিপ হুর্রে।
মনসুর মিঞার কানে যায়—আসছে বছর আবার হবে।