লাল রঙের গাড়িটা দাঁড়িয়ে গাছের নীচে ঠিক রাস্তার ডান পাশে। গাড়ির বন্ধ দরজা আগলে পুলিশের উর্দি পরা দু’জন। তাদের সঙ্গে গল্পে মশগুল সাদা গেঞ্জি পরা সমবয়সী এক যুবক।
মিনিট তিনেকের অপেক্ষার পরে বহুতালির দিক থেকে এসে দাঁড়াল একটি বাইক। তাতে তিন যুবক। কথাবার্তা সেরে তারা চলে যেতেই আর একটি বাইক এসে দাঁড়াল।
গাড়ি আসছে। গাড়ি যাচ্ছে। পুলিশ দেখেই কমছে গাড়ির গতি। হাত বাড়াচ্ছেন পুলিশকর্মী। লরির ভিতর থেকেও বেরিয়ে আসছে হাত। এক চালক লরি থামাননি, মুঠো বেরিয়ে আসেনি। চিৎকার করে ছুটে লরির সামনে গিয়ে দাঁড়াল এক যুবক। চলল পুলিশের শাসানি।
এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, সুতির কানুপুর-বহুতালি সড়কের যান চালক ও গ্রামবাসীরা পুলিশের তোলাবাজিতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন। সুতির কাঁদোয়া পুলিশ ক্যাম্পের এক এএসআইয়ের নেতৃত্বে দিনে-দুপুরেই রাহাজানি চলছে। সুতির অজগরপাড়া থেকে বহুতালি পর্যন্ত রাজ্য সড়ক দিয়ে দৈনিক হাজারখানেক বালি, পাথর ও চোরাই কয়লা বোঝাই লরি ঝাড়খণ্ড ও সুতির মধ্যে যাতায়াত করে। সন্ধ্যের পর যায় পাচারের গরুর পাল। তাদের থেকেই কখনও তারা মোড়ে পেট্রোল পাম্পের কাছে, কখনও বা কিছুটা আগে-পিছে লাল বা সাদা রঙের পুলিশ লেখা গাড়ি রেখে তোলাবাজি চলছে। এলাকার ট্রাক্টর পিছু ১০০ টাকা, লরি পিছু ২০০ টাকা, বাইরের গাড়ি হলে দ্বিগুণ আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ।
পুলিশের অবর্তমানে তারা মোড়ে বাসস্ট্যান্ডের কাছে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় সিভিক ভলান্টিয়ারকে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত তিনি বসে থাকেন আর ট্রাক্টর চালকের হাতে ধরিয়ে দেন বাঘের ছবি দেওয়া একটি স্লিপ। ওই ‘বাঘ স্লিপ’ দেখালেই বাকি রাস্তা ছাড়। বিনিময়ে তিনি পান কমিশন।
শুধু রাস্তায় তোলাবাজি নয়। গোটা এলাকায় চোলাই মদের ঠেকের যেমন বাড়বাড়ন্ত হয়েছে, তাতেও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন এলাকার বাসিন্দাদের একটা বড় অংশ। তাঁদের অভিযোগ— কাঁদোয়া, বহুতালি, সিধোরী, গোপালনগর সর্বত্রই চোলাই ঠেক জাঁকিয়ে বসেছে। সঙ্গে বসছে জুয়ার আসর। বালি খাদানের মাঠে, বহুতালির মন্দিরের সামনে এক মহিলার তেলেভাজার দোকানে, সিধোরী গ্রামে এক প্রাক্তন পঞ্চায়েত সদস্যের বাড়ি-সহ অন্তত পাঁচটি বাড়িতে, বৈষ্ণবডাঙার ছ’টি ঘাঁটিতে ঢালাও বিক্রি হচ্ছে চোলাই।
এলাকার কয়েক জন সাইকেলে করে চোলাই নিয়ে আসছে ১৪ কিলোমিটার দূরে লাগোয়া ঝাড়খণ্ডের ধুরিয়া থেকে। এই সব ঠেকে আসা-যাওয়া লেগেই রয়েছে সমাজবিরোধীদের। তা ছাড়া, কাঁদোয়া মোড়ের কাছে এক জনকে কয়লার তোলা নেওয়ার ছাড়পত্রও দেওয়া হয়েছে। তার কাজ, সাইকেলে কয়লা পাচারকারীদের থেকে তোলা তুলে পুলিশ ক্যাম্পে পৌঁছে দেওয়া।
সুতি ১ পঞ্চায়েত সমিতির স্থানীয় সদস্য রুমি পাল বলেন, ‘‘তোলাবাজি আগেও ছিল, তবে এতটা বেপরোয়া নয়। রাস্তা দিয়ে যখনই আহিরণ পঞ্চায়েত সমিতি অফিসে যাই, ভাবি জনপ্রতিনিধি হিসেবে অন্তত আমায় দেখে একটু আবডালে যাবে পুলিশ। কিন্তু কোথায় কী? পারলে আমার কাছেই পয়সা আদায় করে ছাড়ে!’’
কে আর একা পুলিশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে যাবে। স্থানীয় এক ট্রাক্টর মালিক বলেন, “এক সময়ে পুলিশের তোলাবাজির বিরুদ্ধে রাস্তা অবরোধ পর্যন্ত হয়েছে এই সড়কে। তাতে দু’দিন তোলাবাজি বন্ধ হয়ে আবার যে কে সেই। তাই ভয়ে মেনে নিয়েছে সবাই। পয়সা না দিলে হয়রান করবে। ট্রাক্টরের বিরুদ্ধে কেস দেবে।” শতাধিক গ্রামবাসীর স্বাক্ষর করা অভিযোগপত্রও অন্তত তিন বার জেলার পুলিশ সুপারের কাছে পাঠানো হয়েছিল। রুমিদেবীর খেদ, ‘‘আমিও তাতে সিলমোহর মেরে সই করেছিলাম। কিন্তু কোনও উত্তর পাইনি, তোলাবাজিও বন্ধ হয় নি।”
এই সড়কেরই এক পাশে একটি গ্রামে বাড়ি প্রাক্তন বাম বিধায়ক জানে আলম মিঞার। তাঁর কটাক্ষ, “গোটা রাজ্যটাই তো তোলাবাজিতে ভরে গিয়েছে। সুতিতে প্রকাশ্য রাস্তায় পুলিশের তোলাবাজি দেখে নিজেই মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছি লজ্জায়।”
জেলার পুলিশ সুপার সি সুধাকর বিষয়টি তদন্ত করে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন। তাঁর কথায়, “অভিযোগ সত্যি হলে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”