Advertisement
E-Paper

পাচারকারীদের সঙ্কেতের গেরোয় নাজেহাল পুলিশ

কোড দিয়ে যায় চেনা! আর সেই কোড ভাঙতে গিয়ে রীতিমতো কালঘাম ছুটে যাচ্ছে দুঁদে পুলিশ অফিসার কিংবা পোড় খাওয়া বিএসএফের। সম্প্রতি যে সব কোড বা সঙ্কেত পাচারকারীরা ব্যবহার করছে তা উদ্ধার করতে স্বয়ং ০০৭ কেও বোধহয় বেশ বেগ পেতে হত। ‘খবর পাক্কা’ থাকা সত্ত্বেও মাস কয়েক আগে যে তালিকা পুলিশের হাতে এসেছিল প্রথমে তা দেখে তিনি হাঁসবেন না কাঁদবেন ভেবে উঠতে পারছিলেন না মুর্শিদাবাদের এক পুলিশ অফিসার। ‘ছোলার ডাল- দশ কেজি, মুসুর ডাল- দশ কেজি, মশলা- পাঁচ কেজি, বাঁচার লাঠি- বারোটি।’ তালিকাটা দেখে যে কেউই বলবেন, “এ তো বাজার করার লিস্ট।”

সুজাউদ্দিন

শেষ আপডেট: ২০ জুন ২০১৪ ০০:০৫
সাঙ্কেতিক তালিকা। ছবি: বিশ্বজিৎ রাউত।

সাঙ্কেতিক তালিকা। ছবি: বিশ্বজিৎ রাউত।

কোড দিয়ে যায় চেনা!

আর সেই কোড ভাঙতে গিয়ে রীতিমতো কালঘাম ছুটে যাচ্ছে দুঁদে পুলিশ অফিসার কিংবা পোড় খাওয়া বিএসএফের। সম্প্রতি যে সব কোড বা সঙ্কেত পাচারকারীরা ব্যবহার করছে তা উদ্ধার করতে স্বয়ং ০০৭ কেও বোধহয় বেশ বেগ পেতে হত। ‘খবর পাক্কা’ থাকা সত্ত্বেও মাস কয়েক আগে যে তালিকা পুলিশের হাতে এসেছিল প্রথমে তা দেখে তিনি হাঁসবেন না কাঁদবেন ভেবে উঠতে পারছিলেন না মুর্শিদাবাদের এক পুলিশ অফিসার। ‘ছোলার ডাল- দশ কেজি, মুসুর ডাল- দশ কেজি, মশলা- পাঁচ কেজি, বাঁচার লাঠি- বারোটি।’ তালিকাটা দেখে যে কেউই বলবেন, “এ তো বাজার করার লিস্ট।” কিন্তু তালিকাটা বারকয়েক পড়ার পর ওই পুলিশ অফিসার হোঁচট খান ‘বাঁচার লাঠিতে’। মুদির দোকানে ডাল-মশলা না হয় পাওয়া গেল। কিন্তু বাঁচার লাঠি বস্তুটি কী? খুঁজতে খুঁজতে রানিনগর সীমান্তের নবিপুর এলাকার এক মুদির দোকানের মালিককে পাকড়াও করে কিঞ্চিৎ কড়কে দিতেই খুলে যায় কোডের জট। আমতা আমতা করে সেই প্রৌঢ় বলতে থাকেন, “ইয়ে মানে স্যার, ডাল মানে হল গিয়ে ওই ফেনসিডিল। ছোলা মানে বড় শিশি। আর মুসুর মানে ছোটটা।” তালিকার বাকি মানেগুলোও উদ্ধার করে দেন ওই প্রৌঢ়, “বাঁচার লাঠি মানে ওয়ান শটার, ছোট টর্চ মানে পিস্তল, বড় টর্চ মানে পাইপগান, মশলা মানে বোমার মশলা।” আর ব্যটারি? টেবিলের উল্টোদিক থেকে চট জলদি জবাব, “আজ্ঞে গুলি স্যার। ওতেই তো টর্চ জ্বলে।”

পুলিশ ও বিএসএফ সূত্রে জানা গিয়েছে, সীমান্তে পাচারের ক্ষেত্রে নানা রকম পদ্ধতি অবলম্বন করে পাচারকারীরা। কখনও কখনও থাকে সঙ্কেতও। আবার ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় পাচারের কৌশলও। যেমন রাতের অন্ধকারে আকাশে টর্চের জোরাল আলো যদি বৃত্তাকারে ঘুরতে থাকে তাহলে বুঝতে হবে সেটা সবুজ সঙ্কেত। অর্থাৎ পাচারের জন্য নিরাপদ সময়। আবার বোমার আওয়াজও সবসময় বিপজ্জনক নয়। বিএসএফের নজরদারি চৌকি থেকে নির্দিষ্ট দূরত্বে পর পর যদি বেশ কয়েকটি বোমা ফাটে তাহলে বুঝতে হবে তার উল্টো দিকের রাস্তা দিয়ে পাচার চলছে। কারণ, যেখানে বোমা ফেটেছে সেখানেই কর্তব্যরত বিএসএফ জওয়ানরা ছুটেছেন। কালবৈশাখির ঝড়ের সময় যেমন বাড়তি সতর্কতা নিতে হয় জওয়ানদের। কারণ ধুলো-ঝড়ের সঙ্গে সঙ্গেই গরু নিয়ে ছুটবে পাচারকারীরা। সবথেকে বিপদের সময় শীতকাল। কুয়াশার আড়ালে পাচার করা যে সব থেকে সহজ, সে কথা পাচারকারীদের থেকে ভাল আর কেউ জানে না। কারণ কুয়াশাকে মোকাবিলা করার কোনও যন্ত্র এখনও পর্যন্ত বিএসএফের হাতে নেই।

তবে এ সব কৌশলের পাশাপাশি শুরু হয়েছে নতুন নতুন সব কোডের দৌরাত্ম্য। জেলা পুলিশের এক আধিকারিক বলছেন, “পাচারের কৌশল তো আছেই। সেই সঙ্গে পাচার করতে গিয়ে ধরা পড়ে গেলেও যাতে রহস্য ফাঁস না হয়ে যায় সেই জন্যই এমন কোডের আমদানি করছে পাচারকারীরা।” আর সেই সব কোড খালি চোখে খুবই সাধারণ। কিন্তু তার মানে উদ্ধার করার পর চোখ কপালে উঠে যাচ্ছে পুলিশ ও বিএসএফ কর্তাদের। মুর্শিদাবাদের ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে একটা সময় রমরমিয়ে চলত পাচার। এখন সেই রমরমা না থাকলেও পাচার যে একেবারেই বন্ধ হয়নি সে কথা বিলক্ষণ জানে প্রশাসন। তবে গত কয়েক মাসে সীমান্তের বেশ কিছু এলাকায় হানা দিয়ে এরকম কিছু কোড-কারবারীদের হদিশ পেয়েছে ডোমকলের পুলিশ। কিন্তু এই কোড লেখা কাগজগুলো দিয়ে কীভাবে চলছে চোরাপাচার?

মহকুমার পুলিশ আধিকারিক অরিজিৎ সিংহ বলেন, “সীমান্ত এলাকায় এরকম কিছু দোকান রয়েছে যেগুলোকে বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে অত্যন্ত আটপৌরে গ্রামীণ দোকান। কিন্তু সেখানেই মজুত থাকছে বেআইনি আগ্নেয়াস্ত্র কিংবা ফেনসিডিলের মতো কাশির ওষুধ। গোটা ব্যাপারটাই নিয়ন্ত্রিত হয় ফোন এবং নির্দিষ্ট কিছু লোকের মাধ্যমে।” ওই আধিকারিকের কথায়, “সাধারণ কাগজে লেখা ওই তালিকা নানা হাত ঘুরে বাংলাদেশ থেকে এ দেশে আসে। এরপর ওই তালিকা নির্দিষ্ট দোকানে পৌঁছে দিতে পারলেই মিলবে চাহিদামতো জিনিসপত্র। এর জন্য কোনও নগদ টাকা দিতে হবে না সেই তালিকা-বাহককে। টাকা-পয়সার কারবার করে অন্য চক্র। ওই দোকান মালিক সেই চক্রের কাছে ওই তালিকা দিয়ে দিলেই হাতে পেয়ে যাবে নগদ টাকা।”

তবে ধৃত বেশ কয়েকজন পাচারকারীর স্মৃতিশক্তিও যে তারিফ করার মতো সে কথাও কবুল করছেন জেলা পুলিশের একাংশ। এক আধিকারিকের কথায়, “ধৃত ওই পাচারকারীর কাছ থেকে বেশ কিছু মোবাইল বাজেয়াপ্ত করে আমরা ভেবেছিলাম যে মোবাইল ঘেঁটে পাচারচক্রের বেশ কিছু পাণ্ডাদের অন্তত নাম জানতে পারব। কিন্তু মোবাইল ঘাঁটতে গিয়ে আমরাই ঘেঁটে ঘ হয়ে গিয়েছিলাম। মোবাইলে অন্তত কয়েকশো নম্বর সেভ করা রয়েছে। কিন্তু কারও নাম লেখা নেই। জিজ্ঞাসাবাদে ধৃতেরা জানিয়েছে যে, ওই নম্বরগুলো দেখেই তাঁরা বুঝতে পারত সেটা কার ফোন নম্বর।” মুর্শিদাবাদের পুলিশ সুপার হুমায়ুন কবীর বলেন, “ডোমকল সীমান্তের গ্রামগুলোতে হানা দিয়ে এরকম বেশ কিছু পাচারকারীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে এরকম বেশ কিছু কোড দেওয়া তালিকা ও হিসেবের খাতাপত্র। সীমান্তবর্তী থানাগুলোকে আরও সতর্ক করা হয়েছে। সবসময় যোগাযোগ রাখা হচ্ছে বিএসএফের সঙ্গেও। ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করে বেশ কিছু তথ্যও আমরা পেয়েছি। পাচারচক্রের পান্ডাদের খোঁজেও তল্লাশি চলছে।”

human trafficking cue police sujauddin domkal
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy