Advertisement
E-Paper

বাজি কারখানায় আর নয়, পণ চাঁদরার

পশ্চিম মেদিনীপুরের পিংলায় বাজি কারখানায় কাজ করতে গিয়ে বিস্ফোরণে মৃত্যু হয়েছে গ্রামের দশ জনের। তাদের মধ্যে সাত জনই ছিল শিশু শ্রমিক! বুধবার রাতের ওই ঘটনার পরে শোকস্তব্ধ সুতির নতুন চাঁদরা। শুক্রবার দিনভর গ্রামের বেশিরভাগ বাসিন্দা পথ চেয়ে ছিলেন মৃতদেহের অপেক্ষায়। কিন্তু এ দিন রাত পর্যন্ত ওই দশ জনের কারও মৃতদেহ গ্রামে এসে পৌঁছয়নি। গ্রামের আজাহার শেখ বলছেন, ‘‘কবর খুঁড়ে বসে রয়েছি লাশের অপেক্ষায়!

বিমান হাজরা

শেষ আপডেট: ০৯ মে ২০১৫ ০২:০৩
চলে গিয়েছে তাজা প্রাণ। এখন অপেক্ষা দেহের। ছবি: অর্কপ্রভ চট্টোপাধ্যায়।

চলে গিয়েছে তাজা প্রাণ। এখন অপেক্ষা দেহের। ছবি: অর্কপ্রভ চট্টোপাধ্যায়।

পশ্চিম মেদিনীপুরের পিংলায় বাজি কারখানায় কাজ করতে গিয়ে বিস্ফোরণে মৃত্যু হয়েছে গ্রামের দশ জনের। তাদের মধ্যে সাত জনই ছিল শিশু শ্রমিক! বুধবার রাতের ওই ঘটনার পরে শোকস্তব্ধ সুতির নতুন চাঁদরা। শুক্রবার দিনভর গ্রামের বেশিরভাগ বাসিন্দা পথ চেয়ে ছিলেন মৃতদেহের অপেক্ষায়। কিন্তু এ দিন রাত পর্যন্ত ওই দশ জনের কারও মৃতদেহ গ্রামে এসে পৌঁছয়নি। গ্রামের আজাহার শেখ বলছেন, ‘‘কবর খুঁড়ে বসে রয়েছি লাশের অপেক্ষায়! এমন দিনও যে দেখতে হবে স্বপ্নেও ভাবিনি।’’

আর কোনওদিন যাতে এমন দিন আর না আসে তার জন্যও পণ করছে নতুন চাঁদরা। গ্রামবাসীদের একাংশ সাফ জানাচ্ছেন, যতই অভাব আসুক। বাজি কারখানায় আর নয়। বাজির সঙ্গে এই গ্রামের সম্পর্ক বহু পুরনো। কিন্তু সেই বাজির জন্যই যে এ ভাবে দশটা তাজা প্রাণ চলে যাবে তা অবশ্য ভাবতে পারেননি কেউই। মৃতদের পরিবারের সদস্যরা জানান, মেদিনীপুরের লোকজন যখন এই গ্রামে কাজের জন্য লোক নিতে আসত তখন সব জেনেও তাঁরা বাধা দিতেন না। কারণ, ওরা যে টাকা মজুরি দিত তা ওই গ্রামে কোনও কাজ করেই মিলত না। এক মাস কাজ করতে পারলেই হাতে আসত নগদ পনেরো হাজার টাকা। সেই টাকাতে মায়ের চিকিৎসা হত। আবার বর্ষার আগে ঘরের চাল মেরামত করতেও ভরসা ছিল সেই টাকাই।

গ্রামের জিন্নাতুন বিবির দুই ভাইপোই মারা গিয়েছে পিংলার ওই বিস্ফোরণে। জিন্নাতুন বলছেন, ‘‘সংসারের বড় ভরসা তো ওরাই ছিল। এমন কত জনই তো বাইরে কাজ করতে যায়। কিন্তু এমন তো কখনও হয় না। অভাবের কাছে হার মেনেই ওদের বাইরে কাজ করতে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছিলাম। এখন বুঝতে পারছি, সেটাই সব থেকে বড় ভুল হয়েছিল।’’ এমন শোকের আবহেও চাপা পড়ছে গ্রামবাসীর ক্ষোভ। কেন?

ওই গ্রামের বাসিন্দারা সমস্বরে জানাচ্ছেন, বুধবার রাতের পরে সারা দেশ ঘটনার কথা জানতে পারল। অথচ শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত ওই গ্রামে পা পড়েনি রাজনৈতিক কিংবা প্রশাসনের কোনও কর্তার। পশ্চিম মেদিনীপুরের পিংলার বিস্ফোরণে সাবির শেখ হারিয়েছেন তাঁর দুই ভাই, আমির শেখ ও সামিম শেখকে। সাবির বলেন, ‘‘গোটা গ্রাম ওই ঘটনার পর ভেঙে পড়েছে। এতগুলো মৃতদেহ কী ভাবে আসবে, কখন আসবে তা আমরা কিছুই জানি না। এমন একটা অবস্থায় সাহায্য করা তো দূরের কথা, একটি বারের জন্য সান্ত্বনা দিতেও কেউ এলেন না। এটা দুর্ভাগ্যের!’’ শেষ বিকেলে অবশ্য কংগ্রেস ও তৃণমূলের নেতারা গিয়ে খোঁজ-খবর েনন। গিয়েছিলেন বিডিও-র প্রতিনিধিরাও। ওইটুকুই!

গ্রামের সাদিকুল খান বলেন, ‘‘বিষমদ খেয়ে মৃত্যুর জন্য সরকার ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করেছিল। ঘটনার পরে একাধিক সরকারী কর্তা, মন্ত্রী সেখানে ছুটে গিয়েছিলেন। তাহলে নতুন চাঁদরা কী দোষ করল?’’ তিনি জানান, প্রশাসনের তো উচিত ছিল ঘটনার খবর পেয়েই গ্রামে আসা। কেন এবং কোন পরিস্থিতিতে এই গ্রাম থেকে এত শিশু শ্রমিক বাইরে কাজে যেতে বাধ্য হয় এবং এই প্রবণতা কী ভাবে বন্ধ করা যায় সেটা প্রশাসন না দেখলে কে দেখবে?

ভুল ও বাস্তব দুটোই বুঝতে পারছে নতুন চাঁদরা। কিন্তু শ্রম দফতর কিংবা শিশু কল্যাণ দফতরের এখনও ঘুম ভাঙেনি। ওই দুই দফতরের কোনও কর্তারই এ দিনও পা পড়েনি ওই গ্রামে।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy