আটপৌরে অতিথি নিবাসটাকে টুনি আলোয় চেনাই যাচ্ছে না। ধুলো ঢাকা জাতীয় সড়কের পাশে হোটেলটায় সারা বছর মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ আর ছোট ব্যবসায়ীদের নিয়েই সন্তুষ্ট থাকে, আলোর মালায় চেনা যাচ্ছে না তাকেও। পুরনো শহরটার আনাচ কানাচে রেস্তোরাঁর রান্নাঘরে কোথাও টার্কি কোথাও বা ল্যম্ব রোস্টের ঝকমারি বিজ্ঞাপন— প্রলম্বিত রাত, ছোট্ট দিন, তার মাঝেই বড়দিন নিয়ে সেজেগুজে বসে রয়েছে বহরমপুর, লালগোলা, এমনকী ফরাক্কার হরিণ-বাগান লাগোয়া গেস্ট হাউসও।
একেবারে হাউসফুল অবস্থায় হাঁসফাঁস করছে গোটা নবাবি জেলা।
ফোনে ঘর চাইলে যতটা সম্ভব মিহি গলায় ও প্রান্ত থেকে পাল্টা উপরোধ আসছে— এ ক’দিন প্লিজ অনুরোধ করবেন না স্যার, ঘর সব বুকড্। মুর্শিদাবাদকে এ ভাবে শীতের ছুটিতে সেজে উঠতে বিশেষ দেখা যায়নি, কবুল করছেন হোটেল মালিকেরাই।
বহরমপুরের একটি পরিচিত হোটেলের কর্ণধার সুপর্ণা সাহা বলছেন, ‘‘শীতে পর্যটকদের চাপ থাকে। তবে, এমনটা দেখিনি।’’ ওই হোটেলে ৮০টি ঘর, আগাম বুকিং হয়ে গিয়েছে সব ক’টিই। হোটেলের খবর, গত নভেম্বর মাসেই বুকিং সেরে রেখেছেন পর্যটকেরা। ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়ক লাগোয়া বহরমপুরের অন্য একটি বড় হোটেলেরও ৬৩টি ঘরের একটিও ফাঁকা নেই। বহরমপুর স্টেশন লাগোয়া বিলাসবহুল হোটেলের ন্যূনতম সাড়ে ৫ হাজার টাকার ঘরও বড়দিনে খালি নেই বলেই জানা গিয়েছে। সেখানে হিসেব বলছে, ৬০টি ঘরের মধ্যে কয়েকটা মাত্র খালি পড়ে রয়েছে।
হোটেল মালিকেরা মনে করছেন, ২৫-২৭ ডিসেম্বর দিনগুলি শুক্র থেকে রবি। অধিকাংশ স্কুল-কলেজে শীতের ছুটি। সপ্তাহান্ত বলে সেই তালিকায় ঢুকে গিয়েছে অফিস-বাবুদের ছুটিও। ফলে ‘চলো যাই’য়ের চাপে বহরমপুর, লালগোলা, জিয়াগঞ্জ একেবারে প্যাকেজ ট্যুরে ঠাঁই নেই অবস্থা হয়ে রয়েছে হোটেল-লজ-অতিথি নিবাসে।
হাজারদুয়ারি থেকে কাটরা মসজিদ কিংবা খোশবাগ থেকে মুক্ত জেল পর্যটকদের ভিড়ের অপেক্ষায়। যা নিয়ে কিঞ্চিৎ ভ্রূ কুঁচকে রয়েছে পুলিশেরও। জেলার এক পুলিশ কর্তা বলছেন, ‘‘এই সময়ে পর্যটকদের একাংশ বড্ড বেলেল্লাপনা করেন। সমস্যা তাঁদের নিয়েই। সব ক’টি থানাকেই তাই সতর্ক করা হয়েছে।’’
তবে দর্শকদের মন মাতাতে ইতিমধ্যেই প্রস্তুতি সেরে রেখেছেন হোটেল কর্তৃপক্ষ। কোথাও হোটেলের আবাসিকদের জন্য ইতিমধ্যেই নাচা-গানার ব্যবস্থায় ব্যাঙ্কোয়েট হল রঙিন করে তোলা হয়েছে। কোথাও বা বড়দিনের কেক এবং খানা-পিনারও জবরদস্ত ব্যবস্থা থাকছে।
তৈরি রেস্তোরাঁগুলিও। বহরমপুর মোহন মোড়ে এক রেস্তোরাঁর কর্ণধার সৌমেন সরকার বলেন, ‘‘তন্দুরের টার্কি রান্না শুরু হল বলে!’’ ক্রিসমাস ট্রি দিয়ে সাজানো হচ্ছে অন্য রেঁস্তোরাও। তাঁদেরই এক জনের কথায়, ‘‘বড়দিন উপলক্ষে আমাদের ফিউশন ফুডে থাকছে ইন্দো-চাইনিজ সুইট তন্দুর, ইংলিশ-পাক ফিউশনে ল্যাম্ব কাবাব ইন ব্রাউন শস, ইন্দো কন্টিনেন্টাল ফিউশনে সুইট রোল, ইন্দো-আফগান ফিউশন মাটন কিমা কাবাব।’’ বহরমপুরের আম জনতার অনেকেই যে সব পদের নামের সঙ্গেও তেমন সড়গড় নন!
তাঁদেরই এক জনের কথায়, ‘‘নবাবের শহরে বাঙালিরাও এখন সাহেব। দেখি সেই স্রোতে আমরাও গা ভাসিয়ে দিতে পারি কিনা!’’