শুক্রবার সকালে পাগলাচণ্ডী মন্দিরে পুজো দিয়ে কৃষ্ণনগর কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী সত্যব্রত মুখোপাধ্যায় তথা জলুবাবু সোজা চলে গিয়েছিলেন কৃষ্ণনগর বিপ্রদাস পালচৌধুরী পলিটেকনিক কলেজে। ঘড়ির কাঁটায় তখন সকাল সাতটা পঞ্চাশ। তখনও ভোট গণনার কাজ পুরোদমে শুরু হয়নি। পরনে হালকা গোলাপি রঙের লম্বা স্ট্রাইপের হাই কলারের পাঞ্জাবী আর সাদা পাজামা। বেশ ফুরফুরে মেজাজেই গণনাকেন্দ্র ঘুরে দেখছিলেন জলুবাবু। হঠাৎ একতলার বারান্দায় দেখা সিপিএম প্রার্থী শান্তনু ঝা-র সঙ্গে। হাসি মুখে সৌজন্য বিনিময় করলেন দু’জনেই।
দিনের শুরুটা অন্যরকম হলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে অস্বস্তি। এ ঘর থেকে ও ঘর, এক টেবিল থেকে আর এক টেবিলে উদ্বিগ্ন ভাবে যাতায়াতের মধ্যেই জলুবাবুর সে উদ্বেগ প্রকাশ পেয়েছে। গণনাকেন্দ্রে ঘণ্টা দেড়েক থাকার পর গম্ভীর মুখে বেরিয়ে যাওয়ার সময় জলুবাবু বলে যান, “একটু পরে আবার আসছি।” না, এরপরে তিনি আর ফিরে আসেননি। দুঁদে ব্যারিস্টার সত্যব্রতবাবু হয়তো তখনই বুঝতে পেরেছিলেন কী ঘটতে চলেছে।
এ দিন গণনার প্রথম থেকেই জলুবাবু ছিলেন তিন নম্বর স্থানে। প্রতি রাউন্ডের গণনার ফলাফলে লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে কেবল ব্যবধান। বেলা যত গড়িয়েছে ততই পিছিয়ে পড়েছেন তিনি। বেলা সাড়ে এগারোটায় একাদশ রাউন্ডের ফল ভেসে উঠল গণনাকেন্দ্রের জায়ান্ট স্ক্রিনে---তাপস পাল ২৫৮৭৩০, শান্তনু ঝা ২১৬২৪৩, সত্যব্রত মুখোপাধ্যায় ১৯০১০০। এরপর আর দেরি করেন বিজেপির কর্মী-সমর্থকেরা। একে একে গণনাকেন্দ্র ছাড়তে শুরু করেন তাঁরা।
কিন্তু এমনটা কেন হল? স্বয়ং নরেন্দ্র মোদী ছুটে এসেছিলেন কৃষ্ণনগরে। এ রাজ্যে বিজেপির ‘অন্যতম সম্ভাবনাময়’ আসন কৃষ্ণনগরে জলুবাবুর সমর্থনে মোদীর সেই সভায় উপচে পড়েছিল ভিড়। তারপরেও এমন ফল কেন? উত্তরে দলের তরফে দায়ী করা হয়েছে জেলায় বিজেপির সাংগঠনিক শক্তির অভাবকেই। জেলা নেতৃত্ব সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, মোদী-হাওয়াকে কাজে লাগিয়ে ভোট টানতে গেলে যে সংগঠন দরকার ছিল, তা বিজেপি-র নেই। তাই এমন ফল। দলের সংগঠন যে কার্যত কিছুই নেই, তার যথেষ্ট প্রমাণও এদিন মিলেছে। বেলা বারোটার সময় কৃষ্ণনগরের চ্যালেঞ্জ মোড়ে বিজেপি-র দলীয় অফিসে গিয়ে দেখা গিয়েছে সেখানে তালা ঝুলছে। এলাকার মানুষ জানিয়েছেন, গত দু’দিন ধরে এভাবেই তালা বন্ধ হয়ে পড়ে রয়েছে বিজেপি-র জেলা দফতর। পাশাপাশি সিদ্ধেশ্বরী কালীবাড়ির পাশে জলুবাবুর নিজস্ব কার্যালয়ে এদিন দেখা মেলেনি ছোট, বড় কোনও নেতার। শুক্রবার পর্যন্ত লোকের ভিড়ে গমগম করা চার কামরার সেই অফিসেও এদিন তালা ঝুলতে দেখা গিয়েছে। কেয়ারটেকার বলেন, “আজ আর কেউ আসেননি। কে কোথায় আছেন, তা বলতে পারব না।”
বিজেপি-র জেলা সহ-সভাপতি জীবন সেন বলেন, “জলুবাবুর এমন ফল আমরা আশা করিনি। আমরা নিশ্চিত ছিলাম উনি জিতবেন।” তা হলে হারলেন কেন? জীবনবাবুও সেই দূর্বল সংগঠনকেই দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, “এসবের পাশাপাশি কৃষ্ণনগরে এসে মোদী অনুপ্রবেশকারীদের বিষয়ে যে মন্তব্য করেছিলেন, তার ভুল ব্যাখ্যাও করা হয়েছে। এটাও একটা কারণ বলে মনে হচ্ছে।” যদিও এদিন বিপর্যয়ের কারণ নিয়ে সংবাদমাধ্যমের সামনে মুখ খুলতে চাননি বিজেপি-র জেলা সভাপতি কল্যাণ নন্দী। বিজেপি-র প্রাক্তন জেলা সভাপতি তথা জলুবাবুর নির্বাচনী এজেন্ট দিলীপ চট্টোপাধ্যায় বলেন, “সাতটি বিধানসভার মধ্যে জলুবাবু একমাত্র কৃষ্ণনগর উত্তর থেকে আট হাজার ভোটে লিড পেয়েছেন। বাকি কোনও বিধানসভা থেকে লিড পাননি। সংখ্যালঘু ভোটের প্রায় কিছুই বিজেপির ঝুলিতে ঢোকেনি। চাপড়ায় তৃণমূল যেখানে ৬৪০১৬ ভোট পেয়েছে, সেখানে বিজেপি পেয়েছে মাত্র ৩৩২০৬ ভোট। আর তার ফল যা হওয়ার তাই হয়েছে।”
গণনাকেন্দ্র থেকে বেরিয়ে জলুবাবু ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়কের পাশে একটি হোটেলে গিয়ে ওঠেন। হোটেলের ২১০ নম্বর ঘরে বেশিরভাগ সময় তাঁর নজর ছিল টিভিতে। সঙ্গে ছিলেন ছোট বোন, বউমা ও পরিজনেরা। দুপুর বারোটা নাগাদ কলকাতা যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন জলুবাবু। ততক্ষণে ফলাফলের ছবিটা পরিষ্কার হয়ে গেলেও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হয়নি। তবে তিনি আর অপেক্ষা করতে চাননি। বারোটা বাজার মিনিট কয়েক আগে গাড়ির সব কাচ তুলে তাঁর গাড়ি যখন কলকাতার উদ্দেশে রওনা দিয়েছে ততক্ষণে তপ্ত জাতীয় সড়কের কালো পিচের উপর পুরু হয়ে জমতে শুরু করছে সবুজ আবির।