রাজনৈতিক সঙ্কটের মধ্যেই সই-সঙ্কটে তৃণমূল। সঙ্কট বিধানসভার পরিষদীয় দলে। কয়েক জন বিধায়কের স্বাক্ষর নিয়ে ‘অসঙ্গতি’র অভিযোগ পেয়ে তদন্ত শুরু করেছে সিআইডি। বৃহস্পতিবার সিআইডি সেই কাজ শুরু করার পর থেকেই উদ্বেগের চোরাস্রোত বইতে শুরু করেছে তৃণমূলের অন্দরে।
সইয়ের অসঙ্গতি নিয়ে হেয়ার স্ট্রিট থানায় অভিযোগ দায়ের হয়ছে বিধানসভার তরফে। তার ভিত্তিতেই কলকাতা পুলিশকে তদন্তে সাহায্য করছে সিআইডি। কেন সঙ্কট? বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা, উপদলনেতা এবং মুখ্যসচেতক কে হবেন, এ নিয়ে পরিষদীয় নিয়মের জটিলতায় পড়তে হয়েছে প্রাক্তন শাসকদলকে। ৪ মে ভোটের ফলঘোষণার পরে ৬ মে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কালীঘাটের বাড়িতে জয়ী বিধায়কদের বৈঠকে ডেকেছিলেন। সে দিনই দলের প্রস্তাবে বিধায়কেরা হাত তুলে সায় দিয়ে জানান, পরিষদীয় দলের নেতা, উপনেতা এবং মুখ্যসচেতক কে হবেন তা ঠিক করুন দলনেত্রী মমতা।
তার পর শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা, নয়না বন্দ্যোপাধ্যায় ও অসীমা পাত্রকে উপদলনেতা এবং ফিরহাদ হাকিমকে মুখ্যসচেতক করার কথা জানানো হয় তৃণমূলের তরফে। সেই মর্মে দলের তরফে সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্বাক্ষরিত একটি চিঠি পাঠানো হয় বিধানসভায়। কিন্তু তা গৃহীত হয়নি।
আরও পড়ুন:
তার কারণ, পরিষদীয়দলের নেতা বা অন্যান্য পদাধিকারীর নির্বাচন পরিষদীয়দলের বৈঠকেই করতে হয়। তৃণমূলের ক্ষেত্রে তা হয়নি। ৬ মে বৈঠক থেকে বেরিয়ে একাধিক বিধায়ক সংবাদমাধ্যমে বলেছিলেন, পরিষদীয়দলের নেতা বা অন্যান্য পদাধিকারী কে হবেন, তা ঠিক করার ভার দেওয়া হয়েছে মমতাকে। বিধানসভা অভিষেকের চিঠি প্রত্যাখ্যান করলে ১৯ মে কালীঘাটে ফের যে বৈঠক হয়, সেখানে পরিষদীয় দলের সিদ্ধান্তে স্বাক্ষর করানো হয় বিধায়কদের। একাধিক বিধায়ক জানিয়েছিলেন, সেই সই তাঁদের করানো হয়েছিল ৬ মে তারিখের কার্যবিবরণীতে। এখানেই মূল জটিলতা তৈরি হয়েছে বলে খবর।
সই-কাণ্ড নিয়ে তদন্তে নেমে সিআইডি চার জনের বাড়িতে গিয়েছিল। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন চৌরঙ্গীর নয়না বন্দ্যোপাধ্যায়, বেলেঘাটার কুণাল ঘোষ, ডোমজুড়ের তাপস মাইতি এবং ক্যানিং পূর্বের বাহারুল ইসলাম। এঁদের মধ্যে কুণালের সঙ্গে শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত সিআইডি আধিকারিকদের মুখোমুখি সাক্ষাৎ হয়নি। তিনি বলেন, ‘‘ওঁরা আসবেন বলেছিলেন। বাড়িতে অপেক্ষা করে দুপুরের পর বেরিয়েছি। এর পরে যে কোনও ধরনের তদন্তে আমি সাহায্য করব।’’
কিন্তু বাহারুলের সই নিয়ে ‘বিতর্ক’ তৈরি হয়েছে। ১৯ তারিখের বৈঠকে সই করানো হলেও বিধানসভায় জমা পড়া চিঠিটিতে তারিখ রয়েছে ৬ মে। ওই দিন মমতার বাড়ির বৈঠকে বাহারুল হাজির ছিলেন না। বাহারুল বলেছেন, ‘‘তদন্ত যখন চলছে, তখন এ নিয়ে সংবাদমাধ্যমে বেশি কিছু বলব না। শুধু এটুকু বলি, তদন্তকারীরা আমার কাছে জানতে চান ৬ মে আমি কোথায় ছিলাম। আমি তাঁদের জানাই, ওই দিন আমি বাড়িতেই (ভাঙড়ে) ছিলাম। ওই দিনের একটি মিটিংয়ের সই আমায় দেখানো হয়। আমি তাঁদের বলি, ওই দিন আমি কোনও মিটিংয়ে যোগ দিইনি। ভোট-পরবর্তী হিংসার কারণে বাড়িতেই ছিলাম।’’
বিষয়টি দলের গোচরেও এনেছেন বলে দাবি করেছেন বাহারুল। অন্য দিকে, গোটা পরিস্থিতি নিয়ে প্রবীণ নেতা তথা বালিগঞ্জের বিধায়ক শোভনদেব বলেন, ‘‘আমি ব্যাপারটা বুঝতে পারছি না এই কারণে, আমরা কাউকে দিয়ে জোর করে সই করাইনি। কে লিখেছে জানি না। তবে বাহারুল ওই সইটি দেখে বলেছেন ওটা ওঁর সই নয়।’’
ফলে শোভনদেবের কথাতেও স্পষ্ট, ‘ত্রুটি’ একটা রয়েছে। সেই ত্রুটি শুধু বাহারুলের ক্ষেত্রেই, না কি আরও কয়েক জনের ক্ষেত্রেও একই বিষয় রয়েছে, তা নিয়েও কৌতূহল তৈরি হয়েছে। উদ্বেগ তৈরি হয়েছে পরিষদীয় দলের ভবিষ্যৎ নিয়েও। তৃণমূলের এক বিধায়কের বক্তব্য, ‘‘পুরোটাই হয়েছে নেতৃত্বের গাফিলতি এবং অজ্ঞতার জন্য।’’