জিটিএ-তে শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতির মামলায় তদন্ত করবে সিবিআই-ই। এ বিষয়ে কলকাতা হাই কোর্টের নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে পশ্চিমবঙ্গ সরকার যে মামলা করেছিল, তা থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সরকার। সুপ্রিম কোর্টের মামলাটি থেকে রাজ্য সরে এলে হাই কোর্টের নির্দেশই বহাল থাকবে। সেই নির্দেশ মেনে শুরু হবে সিবিআই তদন্ত। শুক্রবার পাহাড়ের উন্নয়নের লক্ষ্যে নবান্নে প্রশাসনের আধিকারিকদের নিয়ে বিশেষ বৈঠক করেন শুভেন্দু। সেখানেই এই সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করেছেন তিনি। এনডিএ জোটের শরিক হিসাবে বিমল গুরুং এবং রোশন গিরিকেও এই বৈঠকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন শুভেন্দু।
জিটিএ শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতি নিয়ে এর আগে বিস্তর জলঘোলা হয়েছে। প্রায় ৪০০ জন শিক্ষককে বেআইনি ভাবে নিয়োগ করা হয়েছিল বলে অভিযোগ। কলকাতা হাই কোর্ট এই মামলায় সিবিআই তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিল। কিন্তু রাজ্য সেই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে যায়। সেখানে সিবিআই তদন্তে স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়। শুভেন্দু বলেছেন, ‘‘এই মামলা থেকে আমরা বেরিয়ে যাব। তা হলে হাই কোর্টের সিবিআই তদন্তের নির্দেশ কার্যকর হবে।’’
আরও পড়ুন:
নবান্নের বৈঠকে শুভেন্দুর সঙ্গে ছিলেন মুখ্যসচিব মনোজ অগ্রবাল এবং পাহাড়ের স্থানীয় প্রশাসনের আধিকারিকেরা। অনেকেই ভার্চুয়াল মাধ্যমে যোগ দিয়েছিলেন। জনগণের প্রতিনিধি হিসাবে দার্জিলিঙের সাংসদ রাজু বিস্তাও বৈঠকে যোগ দেন। ছিলেন পাহাড়ের নবনির্বাচিত তিন বিধায়ক। উত্তরবঙ্গ, পাহাড় এবং চা বাগানকে ঘিরে কেন্দ্রীয় সরকারের উন্নয়নমূলক প্রকল্পগুলি চালু করার বিষয়ে শুক্রবারের বৈঠক থেকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
পাহাড় নিয়ে একগুচ্ছ পরিকল্পনা রয়েছে শুভেন্দুদের। চার পুরসভায় আপাতত ন্যূনতম পরিষেবা নিশ্চিত করার নির্দেশ সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানিয়েছেন, আপাতত স্বল্পমেয়াদি কিছু লক্ষ্য স্থির করা হয়েছে। পাহাড়ে দার্জিলিং বাদে বাকি তিন পুরসভায় নির্বাচিত প্রতিনিধি না-থাকায় মহকুমাশাসকদের প্রশাসক হিসাবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, পানীয় জল, রাস্তা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পর্যটনের মতো ন্যূনতম পরিষেবা নিশ্চিত করতে হবে সর্বত্র। আগের সরকারের বিরুদ্ধে তোপ দেগে শুভেন্দু বলেন, ‘‘আমরা চাই পাহাড়ের মানুষ নাগরিক পরিষেবা পান। গত অর্থবর্ষে (২০২৫-২৬) পাহাড়ের জন্য ১৮০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল। কিন্তু কাজ হয়নি। ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষেও ১৭০ কোটি টাকা পাহাড়ের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সেই টাকা ব্যবহার করা যায়নি। আমরা জিটিএ-র প্রধান সচিব শামা পারভিনকে বলেছি, দ্রুততার সঙ্গে স্থানীয় সাংসদ ও বিধায়কদের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজন অনুযায়ী কাজ করতে।’’
পাহাড়ের বর্ষার মরসুমের কথা মাথায় রেখে এখন থেকেই প্রশাসনকে তৈরি হতে বলেছেন শুভেন্দু। তৈরি রাখা হচ্ছে পর্যাপ্ত কুইক রেসপন্স টিম। দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতিতে যাতে কোনও খামতি না থাকে, তা প্রশাসনকে নিশ্চিত করতে বলেছেন মুখ্যমন্ত্রী। ১০ দিনের মধ্যে পাহাড়ে পৌঁছে যাবেন বিপর্যয় মোকাবিলা দফতরের সচিব। তিনি নবান্নে রিপোর্ট পাঠাবেন। গত বছর পুজোর সময় প্রবল দুর্যোগের কবলে পড়েছিল পাহাড়। সেই সময় প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রেড রোডের কার্নিভালে উপস্থিতি এবং উদাযাপন নিয়ে বিতর্ক হয়েছিল। শুভেন্দু জানিয়েছেন, সেই পরিস্থিতি এ বার যাতে তৈরি না-হয়, আগে থেকেই তার জন্য সরকার তৈরি থাকছে।
শুভেন্দু জানিয়েছেন, পাহাড়ে চা শ্রমিকদের জন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ২০২১ সালে যে এক হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ ঘোষণা করেছিলেন, তা এ বার কার্যকর করা হবে। চলতি অর্থবছরের জন্য কেন্দ্র ৩০০ কোটি টাকা দিতে পারবে বলে জানিয়েছে। চা শ্রমিকদের কল্যাণে সেই অর্থ কাজে লাগানো হবে। তাঁর কথায়, ‘‘পাহাড়ে ২৫টা বড় চা বাগান দীর্ঘ দিন বন্ধ। কয়েক হাজার চা শ্রমিক বেকার। চা শ্রমিকেরা আগের সরকারকে ভোট দিতেন না বলে সরকারও তাঁদের জন্য কিছু করেনি। উদাসীন ছিল।’’ টি বোর্ডের ডেপুটি চেয়ারম্যান আইএএস মুরুগান এই বৈঠকে ছিলেন। তাঁকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া, গত বারের বিপর্যয়ে ১০০টি বাড়ি ভেসে গিয়েছিল বলে শুভেন্দু জানিয়েছেন। এখনও সেই বাড়ির বাসিন্দারা আশ্রয়হীন। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, ‘‘সাংসদ রাজু বিস্তা ১০টি বাড়ি ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে দিয়েছেন। বাকি ৯০টি বাড়ির জন্য আমরা তিন লক্ষ টাকা করে বরাদ্দ করলাম। জেলাশাসক দ্রুত এই বাড়ি নির্মাণ করবেন।’’ অম্রুত প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ নিয়েও সরব শুভেন্দু। জানিয়েছেন, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত ওই প্রকল্পে যে সংস্থা কাজ করেছে, সেটি ‘ব্ল্যাকলিস্টেড’ থাকবে।