রাজ্যের জনসংখ্যার অনুপাতে চিকিৎসকের সংখ্যা আনুমানিক দেড় হাজারে এক জন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ১:১০০০ অনুপাতের থেকেও কিছু কম। কিন্তু উত্তরবঙ্গের ক্ষেত্রে এই অনুপাত পাঁচ হাজারে এক জন। এক কথায়, এই পরিসংখ্যান বলে, উত্তরের স্বাস্থ্য পরিষেবার হাল দেশের স্বাস্থ্য মানচিত্রে তলানির দিকে। তার উপরে, জনঘনত্ব কম, বিস্তীর্ণ চা বাগান (যেখানে শিক্ষিত চিকিৎসক প্রায় অনুপস্থিত), দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল ইত্যাদি নানাবিধ সামাজিক-ভৌগলিক কারণ উত্তরবঙ্গের চিকিৎসা তথা স্বাস্থ্য পরিষেবাকে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে অন্তরায়।
এই আঙ্গিকে দেখলে বোঝা যাবে, রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিষেবার উন্নতি মাথায় থাকলে, উত্তরবঙ্গ বিশেষ পরিচর্যার দাবি রাখে। দুর্ভাগ্যের বিষয়, পরিকল্পনাকারীদের মধ্যে এই ভাবনার বড়ই অভাব। অপুষ্টিজনিত নানা রোগের প্রাদুর্ভাব, উত্তরের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীগুলোয় এখনও প্রবল। বিশেষত চা শ্রমিকদের মধ্যে। স্বাস্থ্য-অসচেতনতা, নানাবিধ কুসংস্কার, জীবনশৈলীর নানা অবৈজ্ঞানিক দিকের মতো বিষয় স্বাস্থ্যের উপরে নানা কুপ্রভাব ফেলে।
দুর্ভাগ্যের বিষয়, চা শ্রমিক আন্দোলন যতটা রুটি-রুজি-বাসস্থানকে অগ্রাধিকার দেয়, স্বাস্থ্যের দাবিকে ততটা দেয় না। অধিকাংশ চা বাগানেই বর্তমানে ডিগ্রিধারী চিকিৎসক নেই। শ্রমজীবী আন্দোলনে যাঁরা নেতৃত্ব দেন, তাঁরা মালিকপক্ষের সঙ্গে আর্থিক দাবির লড়াইয়ে যত সাবলীল, স্বাস্থ্যের দাবি রক্ষার মৌলিক বিষয়ে তত মনোযোগী নন।
চিকিৎসার সুযোগ সরকারি হাসপাতালগুলিতে এখনও অপ্রতুল। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, শিলিগুড়ির ডজনখানেক বেসরকারি হাসপাতালে ‘ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজি’র সুযোগ থাকলেও, উত্তরের প্রাচীনতম উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজে আজও কোনও ক্যাথল্যাব নেই। সুপার স্পেশ্যালিটির প্রায় কোনও ক্ষেত্রেই উত্তরে পর্যাপ্ত পরিকাঠামো নেই। তাই অর্থবানদের ভরসা বেসরকারি হাসপাতাল। অনেক সময় ঘটি-বাটি বিক্রি করে নিম্নবিত্ত মানুষকে সেই পরিষেবা ক্রয় করতে হয়। যাঁদের সেই সামর্থ্য নেই, তাঁদের কপাল চাপড়াতে হয়।
কাজেই পরিস্থিতি যদি পাল্টাতে হয়, তা হলে প্রাথমিক ও প্রতিষেধক স্বাস্থ্য পরিষেবার পরিকাঠামো উন্নয়ন, উপযুক্ত সংখ্যক চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ জরুরি। চিকিৎসার ক্ষেত্রেও একই কথা। হৃদরোগ, ক্যানসার প্রভৃতি সুপার স্পেশ্যালিটি বিষয়ের আধুনিক চিকিৎসার পরিসর যদি বাড়ানো না যায়, জনস্বাস্থ্যের মান উন্নয়ন অসম্ভব। চিকিৎসা পরিষেবার উন্নতিতে প্রাথমিক প্রয়োজন গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলির পরিকাঠামো উন্নয়ন। শক্তিশালী প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র, অপ্রয়োজনীয় রোগী রেফার কমাতে পারে। কিন্তু মুশকিল হল, দুর্বল পরিকাঠামো, চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মী অপ্রতুলতা অনেক ক্ষেত্রেই উপরের হাসপাতাল-মেডিক্যাল কলেজগুলিতে অকারণ ভিড় বাড়ায়। স্বাস্থ্যসাথী, আয়ুষ্মান ভারত-এর মতো স্বাস্থ্য প্রকল্পের মাধ্যমে আপাত দৃষ্টিতে মনে হতে পারে চিকিৎসার সুফল সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে থাকছে।
বাস্তব চিত্র এত আশাব্যঞ্জক নয়।
সরকারি হাসপতালের পরিবর্তে মানুষ পরিষেবা নিতে যাচ্ছেন বেসরকারি হাসপাতালে। যেগুলি পরিচালিত হয় বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গিতে। চিকিৎসার প্রকৃত খরচের কয়েকগুণ বেশি অর্থ দিয়ে সেই পরিষেবা ক্রয় করতে হয়। স্বাস্থ্য প্রকল্পের সীমাবদ্ধ অর্থে প্রায়ই সব পরিষেবা পাওয়া যায় না। সরকারি কোষাগার থেকেও বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হচ্ছে। এই অর্থের অন্তত কিছুটা যদি সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র, হাসপাতালগুলিতে ব্যয় করা হত, তা হলে সাধারণ মানুষ বিনা বা স্বল্প খরচে উন্নত পরিষেবা পেতে পারতেন।
দুর্ভাগ্যবশত, প্রয়োজন আর প্রাপ্তির ব্যবধান থেকে যাচ্ছে। মানুষ বিশ্বাস হারাচ্ছেন সরকারের পরিষেবার উপর। আবার বেসরকারি পরিষেবাও আয়ত্বের বাইরে থেকে যাচ্ছে। এই সমস্যা আরও প্রকট হচ্ছে উত্তরের জেলাগুলিতে।
সিনিয়র চিকিৎসক, জলপাইগুড়ি
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)