E-Paper

‘ভয়ের’ সূত্রে কষা ভোটের অঙ্ক

জেলা তৃণমূলের পরিচিত নেতা-নেত্রীদের অধিকাংশেরই আশঙ্কা, কৃষ্ণ জেতার পরে অথবা তাঁর লক্ষ্য পূরণ হলে তাঁদের কী হবে!

অনির্বাণ রায়

শেষ আপডেট: ০৯ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:০৯
জলপাইগুড়ি শহরের এক বাড়ির দেওয়ালে রাজনৈতিক দলগুলির প্রচার।

জলপাইগুড়ি শহরের এক বাড়ির দেওয়ালে রাজনৈতিক দলগুলির প্রচার। ছবি: সন্দীপ পাল।

রামচরিত মানসে ‘লঙ্কাকাণ্ডে’ রামচন্দ্রের তির নিক্ষেপ করতে উদ্যত হয়ে সমুদ্রকে ভয় দেখানোর কাহিনি বর্ণনায় তুলসীদাসের দোহায় উল্লেখ রয়েছে, ‘ভয় বিনু হোই ন প্রীতি’। অর্থাৎ, কখনও কখনও ভয় থেকেই ভালবাসার উৎপত্তি। ভোটের জলপাইগুড়িতে জয়-পরাজয়ের অঙ্কও যেন ‘ভয়ের’ সূত্রেই প্রাথমিক ভাবে ছকা হচ্ছে। তার পরে প্রীতি আসুক বা না আসুক।

গত বিধানসভা ভোটে জলপাইগুড়ির সাতটি আসনের মধ্যে চারটি পেয়েছিল বিজেপি। তৃণমূল তিনটি। পরে, উপনির্বাচনে আরও একটি বিধানসভায় জেতে তৃণমূল। গত লোকসভা নির্বাচনেও জলপাইগুড়িতে হেরেছে তৃণমূল। শাসকদলের অন্দরের ব্যাখ্যা, দুই ভোটেই খারাপ ফলের পিছনে কাজ করেছে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, যা নির্মূল হয়নি। সেই দ্বন্দ্বের ভয় থেকেই নাকি শাসকদলের নেতৃত্ব আসরে নামিয়েছেন এসসি-ওবিসি সেলের জেলা সভাপতি কৃষ্ণ দাসকে।

লোকে বলে, এক সময়ে ‘কামতাপুর লিবারেশন অর্গানাইজ়েশন’ (‌কেএলও)-এর সশস্ত্র আন্দোলনের নেতা, পরে, সিপিএমের হয়ে নিজের গ্রাম বিরোধী-শূন্য করা কৃষ্ণ দাসের দাপট তৃণমূলে যোগ দিয়ে আরও বেড়েছে। গত পঞ্চায়েত ভোটেও বিরোধী-শূন্য হয়েছে কৃষ্ণের ‘খাস তালুকের’ গ্রামগুলি। এ বারে জলপাইগুড়ি আসনে কৃষ্ণকে প্রার্থী করেছে তৃণমূল। রাজগঞ্জেও কৃষ্ণের ‘আবদার’ মেনে টানা চার বারের বিধায়ক খগেশ্বর রায়কে সরিয়ে প্রার্থী করা হয়েছে এশিয়াডে সোনাজয়ী ক্রীড়াবিদ স্বপ্না বর্মণকে। ডাবগ্রাম-ফুলবাড়ি, ময়নাগুড়ি, নাগরাকাটাতেও প্রচারের দায়িত্ব কার্যত ছেড়ে দেওয়া হয়েছে কৃষ্ণের উপরে। জেলা জুড়ে কর্মিসভা করেছেন তিনি। তৃণমূলের একটি অংশের দাবি, কৃষ্ণের ভয়ে অনেক নেতা-কর্মীই ‘বিপথে’ পা ফেলবেন না। প্রতিটি কর্মিসভায় কৃষ্ণ বলছেন, “কাজ করতে না পারলে অন্য কথা। কিন্তু কাজ করব বলে করলেন না, এমন হলে কিন্তু আমি দেখে নেব।” জেলা তৃণমূলের অন্দরে গুঞ্জন, শুধু কৃষ্ণ দাসই কি দলের একমাত্র পদাধিকারী? বাকি সব নেতা-নেত্রী কোথায় গেলেন?

জেলা তৃণমূলের পরিচিত নেতা-নেত্রীদের অধিকাংশেরই আশঙ্কা, কৃষ্ণ জেতার পরে অথবা তাঁর লক্ষ্য পূরণ হলে তাঁদের কী হবে! খবর রয়েছে কৃষ্ণের কানেও। তাই মাঝেমধ্যেই দলের নেতাদের নিয়ে বৈঠকে বলে উঠছেন, “সব নজর রাখছি। যাঁরা দলকে পিছন থেকে ছুরি মারবেন, ভোটের পরে তাঁদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অন্ধকার। যাঁরা কাজ করবেন, সকলে মিলেমিশে ভবিষ্যতে দল করব।”

জলপাইগুড়ির সাতটি বিধানসভা কেন্দ্রের মধ্যে চারটি তফসিলি জাতি এবং দু’টি বিধানসভা কেন্দ্র জনজাতিদের জন্য সংরক্ষিত। চা বাগানে পাট্টা বিলি হয়েছে, নতুন হাসপাতাল, ‘ক্রেশ’ হয়েছে। চা শ্রমিকদের একাধিক সংগঠনের বিবাদ মিটিয়ে একটিই সংগঠন হয়েছে। স্বপ্না বর্মণকে প্রার্থী করে তৃণমূলের তরফে রাজবংশী সমাজকে ‘বার্তা’ দেওয়া হয়েছে। শাসক শিবিরের একটি সূত্রের অবশ্য দাবি, তাতেও অঙ্ক পুরোপুরি মিলছে না। কারণ, গত লোকসভা ভোটে যে সব সংখ্যালঘু-অধ্যুষিত বুথে তৃণমূল প্রচুর ব্যবধানে এগিয়ে ছিল, সেই বুথগুলিতে প্রচুর নাম বাদ পড়েছে। আদিবাসী-প্রধান মালবাজার অথবা রাজবংশী-প্রধান রাজগঞ্জে গত লোকসভা ভোটে যে ব্যবধানে তৃণমূল এগিয়ে ছিল, বাদ যাওয়া নামের সংখ্যা তার থেকেও বেশি।

বিজেপি এ বার রাজগঞ্জ আসনে রাজবংশীর পরিবর্তে নমঃশুদ্র সম্প্রদায় থেকে প্রার্থী করেছে। দলীয় সূত্রের দাবি, এই ‘রীতি’ ভঙ্গের পিছনে রয়েছে এসআইআরের প্রতিক্রিয়ায় মতুয়া ভোট হারানোর ‘ভয়’। পুরো পরিকল্পনাই রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ তথা আরএসএসের। সঙ্ঘের লোকজনের দেখা বেশি করে মিলছে সীমান্ত এলাকায়। গত কয়েক মাস ধরে জলপাইগুড়ি জেলার প্রায় ১২২ কিলোমিটার বাংলাদেশ সীমান্তের আশপাশের গ্রামে সভা করে তাঁরা বোঝাচ্ছেন, এ বারের ভোটে যদি বিজেপি না জেতে, তা হলে ‘বিপদ’ আছে। সীমান্তের ও পারে বাংলাদেশের ভোটে জামাতের প্রার্থীদের জয়ের তথ্য ছড়ানো হচ্ছে মোবাইলে-মোবাইলে। যা নিয়ে সীমান্ত এলাকার দীর্ঘ দিনের ফরওয়ার্ড ব্লক নেতা সারদাপ্রসাদ দাসের ক্ষোভ, “ওরা মানুষকে ভয় দেখাচ্ছে। বলছে, বিজেপি না জিতলে নাকি এ দিকটা বাংলাদেশ হয়ে যাবে।”

পদ্ম শিবিরে জোরালো হয়েছে সঙ্ঘের উপস্থিতি। ময়নাগুড়ি আসনে বিদায়ী বিধায়ক কৌশিক রায়কে প্রার্থী করার পরে দলে তুমুল বিক্ষোভ হয়। তার পরেও প্রার্থী বদল হয়নি। বিজেপি সূত্রের দাবি, সঙ্ঘের একটি বৈঠকে অলিখিত সিদ্ধান্ত হয়, প্রার্থী বদল না হলে ময়নাগুড়িতে আর প্রচার করবে না তারা। সে খবর জেলা হয়ে রাজ্য স্তরে পৌঁছতেই বদলে যান ময়নাগুড়ির প্রার্থী। নতুন প্রার্থী ডালিম রায়। সঙ্ঘের ‘ভয়ে’ প্রার্থী বদলে যাওয়ায় ফের বিক্ষোভ করেন কৌশিক-অনুগামীরা। তাতেও কপালে চিন্তার ভাঁজ বিজেপি নেতৃত্বের। ‘ভয়’ এতটাই যে, শুধু ময়নাগুড়ির বিধানসভা কেন্দ্রের বদলে যাওয়া বিজেপি প্রার্থীর মনোনয়ন জমা দেওয়ার সময়ে জলপাইগুড়িতে হাজির ছিলেন বিজেপি সাংসদ তথা কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার।

দীর্ঘ কয়েক বছর পরে এ বার জেলায় সব আসনে লড়ছে সিপিএম তথা বামফ্রন্ট। সিপিএমের জেলা সম্পাদক পীযূষ মিশ্রের দাবি, ভয় দেখিয়ে ভোট নয়, ন্যায্য অধিকারের কথা বলে মানুষের সমর্থন চাইছেন তাঁরা। কংগ্রেসও জেলার সব আসনে প্রার্থী দিয়েছে। ভোটের ডুয়ার্সে ফের দেখা যাচ্ছে হাত চিহ্নের পতাকা। প্রাক্তন সাংসদ-বিধায়ক, প্রবীণ কংগ্রেস নেতা দেবপ্রসাদ রায় বলেন, ‘‘চার দিকে ভয় আর ঘৃণার পরিবেশ। সে পরিবেশ থেকে বেরোনোর বার্তা বহু দিন ধরে দিচ্ছেন রাহুল গান্ধী। আমরা সুস্থ পরিবেশ এবং ভালবেসে রাজনীতির পথ দেখাতে চাই। মানুষও তা-ই চাইছেন।’’

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Jalpaiguri TMC CPIM BJP

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy