করোনার উপসর্গ নেই, এমন সন্দেহভাজনদের লালারসের নমুনা পরীক্ষা না করানোর পথেই হাঁটতে চলেছে উত্তরবঙ্গের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা। দায়িত্বে থাকা স্বাস্থ্য আধিকারিকরা জানান, করোনা আক্রান্তদের ৯০ শতাংশেরও বেশিরই কোনও উপসর্গ নেই। কোভিড হাসপাতালে বর্তমানে সাড়ে পাঁচশো রোগী রয়েছে, যাদের মধ্যে উপসর্গ রয়েছে মাত্র চার জনের। পরীক্ষা না করানোর পিছনে যুক্তি হিসেবে তাঁরা বলছেন, উপসর্গহীন রোগীদের থেকে সংক্রমণ আশঙ্কা অনেক কম বলে জানিয়েছে ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিক্যাল রিসার্চ (আইসিএমআর)। বিশ্ব সাস্থ্য সংস্থা ‘হু’-ও একই কথা বলেছিল। কিন্তু পরে তারা সেই বক্তব্য থেকে সরে আসে।
তবে এই ব্যবস্থা কার্যকর হলে সিঁদুরে মেঘ দেখছেন চিকিৎসকদের অনেকেই। কারণ, উপসর্গহীন রোগীদের থেকে কিন্তু অন্য কারও সংক্রমণ হতেই পারে। বিশেষ করে যাদের অন্য রোগ বা কো-মর্বিডিটি রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে রোগটি বিপজ্জনক হতে পারে।
করোনা নিয়ন্ত্রণে উত্তরবঙ্গের দায়িত্বে থাকা আধিকারিক সুশান্ত রায় বলেন, ‘‘আইসিএমআর-এর গাইডলাইন অনুযায়ী উপসর্গহীনদের পরীক্ষা করানোর প্রয়োজন নেই। যদিও আমাদের মুখ্যমন্ত্রী সকলকে সুস্থ রাখতে বলেছেন। তাই সুরক্ষার জন্য সবার পরীক্ষা করেছি। তবে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এখন উপসর্গহীনদের পরীক্ষার দরকার নেই বলেই মনে করা হচ্ছে।’’ তিনি এ-ও বলেন, ‘‘তবে নির্দিষ্ট সময় তাঁদের কোয়রান্টিনে থাকতে হবে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ এলে এই ব্যবস্থা চালু হবে।’’
উত্তরবঙ্গ মেডিক্যালের অ্যাসিসোসিয়েট প্রফেসর কল্যাণ খান কিন্তু সাবধান করে দিয়ে বলেছেন, ‘‘হু একদিন আগে জানিয়েছেল উপসর্গহীনদের থেকে সংক্রমণ ছড়ানোর সম্ভাবনা খুবই কম। এ দিন আবার বিবৃতি বদলে তাদের বলতে শোনা যাচ্ছে, আক্রান্তদের ৪০ শতাংশ উপসর্গহীনদের থেকেই সংক্রমিত হয়েছে। তাই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বিষয়টি ভেবে দেখা দরকার।’’
চিকিৎসকদের একাংশ মনে করছেন, উত্তরবঙ্গে ফিরে আসা পরিযায়ী শ্রমিকদের অনেকের বাড়িতেই কোয়রান্টিনে থাকার পরিস্থিতি নেই। সরকারি কোয়রান্টিন ব্যবস্থাও অপ্রতুল। সেই ঘাটতির জেরে উপসর্গহীনরা ঘুরে বেড়ালে রোগ সংক্রমণ হু হু করে বাড়তে থাকবে। তা ছাড়া কোনও এলাকায় করোনা নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে সেই এলাকায় ব্যাপক হারে লালারসের পরীক্ষাই জরুরি। পরীক্ষা না হলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। অন্য দিকে লালারস পরীক্ষা করে এখন পর্যন্ত উত্তরবঙ্গে এক হাজারের বেশি পজ়িটিভ মিলেছে। তাঁদের অনেককেই কোভিড হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। তাতে জায়গার সমস্যা তৈরি হয়েছে। মালদহ এবং উত্তর দিনাজপুরে সম্প্রতি ১০ দিন পেরিয়ে গেলে তাদের বাড়িতেই কোয়রান্টিনে থাকতে বলা হচ্ছে। সে কারণে উপসর্গহীন রোগীদের আলাদা রাখার ব্যবস্থার কথাও ভাবা হয়েছে।
উপসর্গ না থাকলে লালারস আর পরীক্ষা হবে না— এমন ইঙ্গিতে উদ্বেগ বেড়েছে কোচবিহার থেকে মালদহ সর্বত্রই। মালদহ জেলা স্বাস্থ্য দফতর জানিয়েছে, বুধবার পর্যন্ত জেলায় আক্রান্ত ২৩১ জনের মধ্যে কারও উপসর্গ নেই। পরীক্ষা না হলে এরা পজ়িটিভ কি না, জানাই যেত না। তাদের হাসপাতালেও আনা হত না। ফলে রোগ ছড়ানোর মাত্রা হয়তো আরও বেড়ে যেত।
বাসিন্দারা বলছেন, হাজার হাজার শ্রমিক ফিরছেন। তাঁরা অনেকেই করোনায় আক্রান্ত। পরীক্ষা না হলে বোঝার কোন উপায় থাকবে না। মালদহের মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক ভূষণ চক্রবর্তী বলেন, ‘‘উপসর্গ না থাকলে পরীক্ষা করার দরকার নেই— গাইডলাইন এমন রয়েছে। কিন্তু আমরা মানুষের আতঙ্ক দূর করতে লালার পরীক্ষা করছি।’’