ভোটের কয়েকদিন আগের ঘটনা। ইসলামপুরে মোবাইলের ব্যবসার কাজ শেষ করে শিলিগুড়ি ফেরার জন্য পুর বাসস্ট্যান্ডে যান, মিলনপল্লির বাসিন্দা সুরজিৎ সাহা। বিকাল ৪টা নাগাদ সরকারি বাসের কাউন্টারে গেলে জানিয়ে দেওয়া হয়, ‘‘স্ট্যান্ড থেকে কোনও বাস নেই। ৩১ নম্বর জাতীয় সড়কে দাঁড়িয়ে পড়ুন। বহরমপুর, রায়গঞ্জ বা বালুরঘাটের মত দূরপাল্লার কোনও বাস পেতে পারেন।’’
শিলিগুড়ি আসার সুযোগ অবশ্য পেয়েছিলেন সুরজিৎবাবু। তবে রাস্তার ধারে ধুলো খেয়ে প্রায় আড়াই ঘণ্টা অপেক্ষার পর। বাসে অবশ্য বসার আসন মেলেনি। আসতে হয়েছিল দাঁড়িয়ে। পরদিন, সকালে শিলিগুড়ি জংশনে কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাসে গিয়ে মালদহ যাওয়ার বাসের খোঁজ নিলে জানা যায়, বিকেল অবধি বাস নেই। শেষে ট্রেনে পৌঁছন মালদহ। শুধু সুরজিৎবাবুই নন, গোটা উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলা সদর ও গ্রামের বাসিন্দারা গত দেড় মাস ধরে উত্তরবঙ্গ রাষ্ট্রীয় পরিবহণ নিগমের (এনবিএসটিসি) বাসের অভাবে এমনই সমস্যায় পড়ছেন।
নিগম সূত্রের খবর, ৩ মার্চ থেকে গত ১০ এপ্রিল অবধি দফায় দফায় এনবিএসটিসি-র ১৭৫টির মত বাস নির্বাচন কমিশন ভোটের কাজে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। সেই সঙ্গে শুধুমাত্র উররবঙ্গের ১৭ এপ্রিলের ভোটের জন্য প্রায় ৭০টি বাস নেওয়া হয়েছিল। সেগুলিই ধীরে ধীরে নিজেদের ডিপোতে আসতে শুরু করেছে। এতে বহু রুটে নিগমের বাস বন্ধ হয়ে যাওয়া ছাড়াও একাধিক রুটে বাসের সংখ্যা কমে গিয়েছে। কোচবিহার, বালুরঘাট, বহরমপুর এবং রায়গঞ্জ ডিপোতে সমস্যা বেশি দেখা দিয়েছে। জহরলাল নেহেরু আর্বান রিনিউয়াল মিশনের বাসগুলি না নেওয়ায় শিলিগুড়ি এবং জলপাইগুড়িতে তুলনামূলকভাবে সমস্যা কম। প্রতি বাস পিছু দুই জন চালক ভোটের কাজে চলে যাওয়ায় ৩৫০ বাসকর্মীও কমে গিয়েছে। কিছু কিছু ডিপোতে হাতে বাস থাকলেও চালকের অভাবে সেগুলি চালানো যাচ্ছে না বলে নিগম সূত্রের দাবি। তৃতীয়, চতুর্থ এবং পঞ্চম দফার ভোটের পর বাসগুলি ফিরবে। আবার কোচবিহারের শেষ দফার জন্যও আলাদা করে ৭০টি বাস পাঠানোর কথা জানানো হয়েছে। এনবিএসটিসির ম্যানেজিং ডিরেক্টর সুবলচন্দ্র রায় বলেছেন, ‘‘পুরোটাই কমিশনের বিষয়। সরকারি নির্দেশে আমাদের চাহিদা মত বাস পাঠাতে হয়েছে।’’
পরিস্থিতি নিয়ে নিগমের কর্মী, অফিসারেরা তো বটেই সাধারণ বাসিন্দারাও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। মঙ্গলবার সকালে শিলিগুড়ির কেন্দ্রীয় বাসস্ট্যান্ডে উত্তরের বিভিন্ন গন্তব্যের বাস ধরতে এসেছিলেন, শিউল বসাক, মনতোষ পাল, মহম্মহ ইসমাইল, ধীরাজ কুমারের মত যাত্রীরা।
অনেক অপেক্ষার পর তাঁরা বাদুড়ঝোলা অবস্থায় বাসে উঠে গন্তব্যে রওনা হয়েছেন। তাঁরা জানান, প্রতি লোকসভা বা বিধানসভা ভোটের সময় মাস দু’য়েক ধরে যাত্রীদের এমন সমস্যায় পড়তে হয়। সেক্ষেত্রে ভোটকর্মী, পুলিশ বা নিরাপত্তা রক্ষীদের নিয়ে যাওয়ার জন্য ট্রেনের আরও ব্যবহার বাড়ালে যাত্রীরা উপকৃত হন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাসের জন্য দাঁড়িয়ে থাকার হাত থেকে রেহাই পাওয়া যেত। প্রশাসনিক সূত্রের খবর, বাসের সমস্যার কথা মাথায় রেখে গত সোমবারই এনজেপি থেকে দক্ষিণবঙ্গে ভোটকর্মীদের নিয়ে যাওয়ার জন্য কমিশনের তরফে স্পেশাল ট্রেনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। সন্ধ্যা সাতটায় ট্রেনটি পুলিশ, নিরাপত্তারক্ষীদের নিয়ে কলকাতা রওনা দিয়েছেন। বাসের থেকে বেশি ট্রেনের উপর জোর দিলে এ সমস্যা এড়ানো সম্ভব হত বলে যাত্রীদের বক্তব্য।
নিগমের কয়েকজন অফিসার জানান, সিএসটিসি-র ৬৫টি বাস, এসবিএসটিসি ১০০টি, ভূতল পরিবহণের ২০টি বাস। সেখানে কমিশন এনবিএসটিসি-র বাস সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় নিয়েছে। অসম থেকে নিরাপত্তারক্ষীদের আনার কাজেও নিগমের বাস ব্যবহার করা হয়েছে। এখন কলকাতা ও দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় বাসগুলি রয়েছে। বাসগুলি ভোটকর্মীদের নামিয়ে ফিরে এলেও কিছুটা সমস্যা মিটত। শিলিগুড়ির ডিভিশনেরই রঘুনাথগঞ্জ, ফরাক্কা, ওমরপুর বা কল্যানীর মত রুটগুলি আপাতত বন্ধ হয়ে রয়েছে। বহরমপুর থেকে কলকাতার বিভিন্ন রাতের বাস বন্ধ।
তেমনই, কোচবিহার, শিলিগুড়ি, বহরমপুর, রায়গঞ্জ থেকে কলকাতাগামী চার-পাঁচটি করে বাস চললেও এখন দু-একটির বেশি চলছে না। লোকাল রুটেও বাসের সংখ্যা দু-তিনটি করে কমাতে হয়েছে।
উল্লেখ্য, এনবিএসটিসির হাতে বর্তমানে ৭৫৯টির মত বাস রয়েছে। এর মধ্যে ৬০০টি বাস রোজ রাস্তায় চলাচল করে। নিবার্চনী বিধি লাগু থাকায় কর্মী ইউনিয়নের নেতারা প্রকাশ্যে বিষয়টি নিয়ে কিছু বলতে চাননি। ইনটাক, সিটু বা তৃণমূলের কর্মী ইউনিয়নের নেতারা জানিয়েছেন, বাসের নির্ভরতা কমিয়ে সাধারণ ট্রেন বা স্পেশাল ট্রেনের উপর জোর দিলে যাত্রীদের ভোগান্তি কমবে।