Advertisement
E-Paper

পাশাপাশি লাল-সবুজ, ভরসা পাচ্ছেন সুনীল

খেতের পর খেত বোরো ধান। কয়েক পশলা বৃষ্টির পরে রোদে লালচে। তীব্র গরম আর প্রখর রোদে হালকা হাওয়ায় উড়ছে ধানের রং ধরা শিস। ফসল ভাল হওয়ায় চিন্তার ছাপ নেই এলাকায়।

কৌশিক চৌধুরী

শেষ আপডেট: ১৩ এপ্রিল ২০১৬ ০১:৪৬

খেতের পর খেত বোরো ধান। কয়েক পশলা বৃষ্টির পরে রোদে লালচে। তীব্র গরম আর প্রখর রোদে হালকা হাওয়ায় উড়ছে ধানের রং ধরা শিস। ফসল ভাল হওয়ায় চিন্তার ছাপ নেই এলাকায়।

সেই সঙ্গে রাতারাতি যেন বদলে গিয়েছে সুনীলচন্দ্র তিরকের ‘বডি ল্যাঙ্গুয়েজটাই’। সাত সকালে তেল-পাট করা চুল, সাদা পাঞ্জাবি, ঢোলা পাজামা, প্লাস্টিকের ব্যাগে কাগজপত্র দিয়ে বার হয়ে যাচ্ছেন। গত কয়েক মাসের আগের, কপালের চিন্তার ভাঁজটা উধাও। গ্রামের লোকে ঘিরে ধরছেন। চায়ের দোকান থেকে পাড়ার বটগাছের মোড়ে দাঁড়াচ্ছেন। গাছের ডালে লাল, সবুজ পতাকা উড়ছে। সকাল থেকে রাত অবধি টানা মিটিং-মিছিল। চটহাট থেকে বিধাননগর, ফাঁসিদেওয়া সদর থেকে ঘোষপুকুর, খড়িবাড়ি। এক একটি চা বাগানে চরকিপাক। দিন যত যাচ্ছে, ততই যেন হাসি চওড়া হচ্ছে সুনীলবাবুর। পঞ্চায়েত নিবার্চনের ‘ত্রিফলা’ লড়াইয়ের রেজাল্টের পর বিধানসভায় কী হবে নিয়ে সন্দেহ ছিল। রাজ্যের জোট ‘ঝড়়ে’ সে প্রশ্নের উত্তর দেওয়াটা খুব কঠিন নয় বলে মনে করছেন ফাঁসিদেওয়ার অনেকেই।

সুনীলবাবু ফাঁসিদেওয়া কেন্দ্রের এ বারও কংগ্রেস প্রার্থী, এলাকার বিধায়ক। গতবার জিতেছিলেন তৃণমূল সমর্থিত প্রার্থী হিসাবে। এবার দাঁড়িয়েছেন বাম সমর্থিত প্রার্থী হয়ে। কংগ্রেসের ‘ঘাঁটি’ বলে পরিচিত থাকলেও ফাঁসিদেওয়ায় বরাবর এই ‘সমর্থনে’র অঙ্ক অনেকটাই কংগ্রেসকে এগিয়ে দিচ্ছে, তা মানছেন এলাকার প্রবীণ কংগ্রেসিরাই। তাঁদের কথায়, ‘‘প্রতিপক্ষ প্রতিবার বদল হচ্ছে। সময়ের তাগিদে অন্য পক্ষ বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়েছে।’’ জেলার কৃষি বলয় বলে পরিচিত ফাঁসিদেওয়ার প্রবীণ কংগ্রেসিরা জানান, পঞ্চায়েতের ভোটে লালেরা জিতেছে বহু জায়গায়। কংগ্রেস থাকলেও ভোট কাটা কাটাকাটির অঙ্কে দিদির পার্টি এগিয়ে যায়। মহকুমা পরিষদের আসনে তো তাই হয়েছে। অথচ পাঁচ বছর আগে, ২০১১ বিধানসভা ভোটের পরেও ঠিকঠাক খুঁজে পাওয়া যায়নি ঘাসফুলদের। পরে দলবদলের খেলায় শাসক পার্টি ‘মজবুত’ হয়েছে। তবে শাসক দলের প্রার্থীও কয়েক মাস আগে দল ছাড়া কংগ্রেসিই। তাই ঘাসফুলের প্রতীক চেনাতেই তাঁদের ঘুরতে হচ্ছে।

ফাঁসিদেওয়া থানার সামনে সদরের বাজার। এক পাশে হাইস্কুল, থানা, কিছু দূরে বিডিও অফিস। কয়েকশো মিটারের মধ্যেই বাংলাদেশ সীমান্ত। ছোট ছোট হোটেল, চা দোকান, মুদি মোবাইল দোকান মিলিয়ে শ’খানেক। কয়েক জন স্থানীয় ব্যবসায়ী জানাচ্ছেন, কংগ্রেস প্রার্থীর এ বার বেশি ভরসা কিন্তু লাল জার্সির লোকেরাই। গত পঞ্চায়েতে কিছুটা আড়ালে বোঝাপড়াটা হয়েছিল। পরে বোর্ড গড়তে দুই পক্ষ প্রকাশ্যে পাশাপাশি আসায় শাসকরা অনেক জায়গায় কোণঠাসা হয়। জালাস থেকে ফাঁসিদেওয়া, বিধাননগর-২ থেকে ঘোষপুকুর বা হেটমুড়ি পঞ্চায়েত এমনকী, পঞ্চায়েত সমিতিতেও তাই হয়েছে। বিধানসভায় তা এ বার প্রকাশ্যে। কংগ্রেসের থেকেও লালেরা খাটছে খুব।

জোট যে জোরদার তা সিপিএমের রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য অশোক ভট্টাচার্যের কথায় স্পষ্ট। তিনি বলেন, ‘‘কংগ্রেস এ বার আমাদের সঙ্গী। তাই কংগ্রেসকে জেতানোর দায়িত্ব আমাদেরও।’’ তাই হয়তো কংগ্রেসের গঙ্গোত্রী দত্ত, সুবীন ভৌমিক, কুন্তল গোস্বামীদের সঙ্গে সিপিএমের বীরেন নন্দী, ছোটন কিস্কু, মনোহর ব্রজবাসী, রামকুমার ছেত্রীদের একসঙ্গে গ্রামেগঞ্জে, হাটে-বাগানে সভা, মিছিলে জোরদার ভাবে দেখা যাচ্ছে। সকলের টার্গেট একটাই, ভোট কাটাকাটিকে এবার ভোট জোড়া দেওয়াতে বদলানো।

শাসক শিবিরের মাথাব্যথাও যেন ক্রমেই বাড়ছে। একে তো গরুপাচার, আফিম, স্পিরিট থেকে নানা আপত্তিকর কাজকর্মে অভিযোগ উঠেছে তৃণমূল নেতাদের বিরুদ্ধে। তার উপরে সোমবারই চা শ্রমিক নেতা তথা জেলার তৃণমূলের কার্যকরী সভাপতি অলোক চক্রবর্তী কংগ্রেসে যোগ দিয়েছেন। দলের প্রার্থী কারলুস লাকড়া তাই জোট রাজনীতির থেকেও বেশি উন্নয়নে জোর দিয়ে ভোট যুদ্ধে নেমেছেন। রাস্তা, স্কুল কলেজ, সংখ্যালঘু হস্টেল, কিসান মান্ডি, কন্যাশ্রী, যুবশ্রীর প্রচারপত্র, পোস্টার, লিফলেট নিয়েই ঘুরছেন। তিনি বলছেন, ‘‘গত চার বছরেই তো ফাঁসিদেওয়াকে উন্নয়নের মানচিত্রে এনেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আর গৌতম দেব। কী হয়নি আর কী হচ্ছে না। মানুষ সব দেখেই ভোট দেবে। সিপিএম-কংগ্রেস তো কিছুই করেনি।’’

প্রকল্পের খতিয়ান দিচ্ছেন আরেক প্রার্থীও। ‘নড়বড়ে সংগঠন আর দুর্বল লোকবল’কে পরোয়া না করে ভোট বাজারে পদ্মফুলকে সম্বল করে ঘুরছেন বিজেপির আদিবাসী মোর্চার ব্লক সভাপতি, প্রার্থী দুর্গা মুর্মু। সঙ্গে মোদীর হাজারো প্রকল্পের খতিয়ানের লিফলেট।

ফেরার সময়ে চোখে পড়ল বহু খেতেই সবুজ আর লালচে ধানের ছড়াছড়ি। দুই রঙের এই জোটই যেন ভরসা যোগাচ্ছে সুনীলবাবুর স্বরে, ‘‘কে কোথায় দ্বিতীয়, কে তৃতীয় হবে, তা ওঁরাই ঠিক করুক!’’

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy