Advertisement
E-Paper

দিল্লির দিল নেই, বলছেন বাবা

পরিবারে রোজগেরে বলতে ছিলেন বছর ৩৫-এর মতিবুর রহমান একাই। বাবা বসিরুদ্দিন এক সময় ভ্যান চালাতেন। এখন কাজ করার ক্ষমতা হারিয়ে বাড়িতেই বসে আছেন। বৃহস্পতিবার সকালে ছেলে মারা যাওয়ার খবর এসেছে দিল্লি থেকে উত্তর দিনাজপুরের এই প্রত্যন্ত গ্রামে।

অভিজিৎ পাল

শেষ আপডেট: ১২ অগস্ট ২০১৬ ০৩:৫৫
মতিবুরের স্ত্রী ও সন্তানেরা। —নিজস্ব চিত্র।

মতিবুরের স্ত্রী ও সন্তানেরা। —নিজস্ব চিত্র।

পরিবারে রোজগেরে বলতে ছিলেন বছর ৩৫-এর মতিবুর রহমান একাই। বাবা বসিরুদ্দিন এক সময় ভ্যান চালাতেন। এখন কাজ করার ক্ষমতা হারিয়ে বাড়িতেই বসে আছেন। বৃহস্পতিবার সকালে ছেলে মারা যাওয়ার খবর এসেছে দিল্লি থেকে উত্তর দিনাজপুরের এই প্রত্যন্ত গ্রামে। বাড়ির লোকেরা শুনেছেন, কী ভাবে দিল্লির কিছু মানুষের অমানবিক মনোভাবের জন্য মৃত্যু হল ইসলামপুরের অমলঝাড়ির বাসিন্দা মতিবুরের।

বস্তুত, এ দিন সিসিটিভি ক্যামেরার সেই ছবি ভাইরাল হয়ে গিয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার সর্বত্র। প্রচণ্ড গতিতে কী ভাবে এসে একটি মিনি ট্রাক পিছন থেকে ধাক্কা দিচ্ছে মতিবুরকে, স্পষ্ট দেখা গিয়েছে সেই ছবি। তার পরে সেখানে দেড় ঘণ্টা পড়েছিলেন মতিবুর। অজস্র গাড়ি ও মানুষ তাঁকে পাড় হয়ে গিয়েছেন। কিন্তু কেউ সাহায্যের হাত এগিয়ে দেননি। যতবার এই ছবির কথা ঘুরে ফিরে আসছে অমলঝাড়ির বাড়ির বারান্দার আলোচনায়, ততবারই ফুঁপিয়ে উঠছেন বৃদ্ধ বাবা। বলছেন, ইদের আগেই ছেলেটার আসার কথা ছিল!

বাড়ির আর্থিক অবস্থা শোচনীয়। কাজের তাগিদে কয়েক বছর আগে দিল্লিতে গিয়েছিলেন। এক সময় দিল্লিতে রিকশা চালাতেন। এখন টোটো ভাড়া নিয়ে চালাতেন। আর রাতে কাজ করতেন একটি কারখানায়। পাহারার কাজ। নিজের দশ বছরের ছেলে সোহেল আখতারকে কাছে এনে রেখেছিলেন। ইচ্ছে ছিল, হাতের কাজ শেখাবেন। বৃহস্পতিবার ভোরে পাহারার কাজ সেরে ফিরছিলেন। তখনই মিনি ট্রাকের ধাক্কা। পুলিশ যখন ঘটনাস্থলে পৌঁছয় তত ক্ষণে মৃত্যু হয়েছে মতিবুরের।

Advertisement

টিভির ছবি দেখার কথা বলছিলেন বাবা বসিরুদ্দিন। বলছিলেন, ‘‘দেখলাম ছেলেটিকে ধাক্কা দেওয়ার পর কিছুক্ষণ দাঁড়িয়েছিল গাড়িটা। চালক নেমেছিল। কিন্তু আমার ছেলেকে তুলে হাসপাতালে নিয়ে যায়নি। তার পরেই দেখলাম, এক টোটো চালক ছেলের মোবাইল তুলে নিল। এক জন নাকি টাকাও নিয়ে গিয়েছে।’’ এত ক্ষণ পড়েছিলেন মতিবুর। যদি কেউ তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যেত, বেঁচেও যেতে পারতেন, বলছিলেন বাবা। তাঁর কথায়, ‘‘শুনেছিলাম দিল্লি দিলওয়ালে কা শহর। কিন্তু কোথায়! মানবিকতার লেশমাত্র নজরে পড়ল না।’’

দাওয়া পেরিয়ে ঘরে মতিবুরের মা মঙ্গলি খাতুন তখন বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন। নিজের একচিলতে ঘরের সামনে বারান্দার কোণ ঘেঁষে তিন সন্তানকে জাপটে ধরে বসে আছেন মতিবুরের স্ত্রী সহেরুম খাতুন। যেন কথা ভুলে গিয়েছেন তিনি। বাড়ির সামনে তখন ভিড় আত্মীয়-বন্ধুদের। তাঁদের এক জন, রহিমুদ্দিন জানান, দিল্লিতে অনেকেই রয়েছেন ওই এলাকার। প্রথম খবরটা আসে তাঁদের কাছ থেকেই।

রহিমুদ্দিনের কাছ থেকেই জানা যায়, মৃত্যু খবর পেয়ে মতিবুরের সঙ্গী-পরিজনেরা সোজা চলে যান স্থানীয় থানায়। দেহ তত ক্ষণে হাসপাতাল হয়ে ময়নাতদন্তের টেবিলে। দশ বছরের ছেলেটিকে সঙ্গে নিয়ে একটি অ্যাম্বুল্যান্সে করে দেহ নিয়ে তারা ইসলামপুরের উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন।

বাড়ির একমাত্র ছেলেকে শেষ বার বাড়িতে আনা হচ্ছে। রহিমুদ্দিন বলেন, ‘‘আমরা গ্রামে থাকি। একে অন্যের বিপদে পাশে দাঁড়াই। মানুষ যে এমন অমানবিক হতে পারে, সেটা আগে কখনও দেখিওনি। ভাবতেও পারি না।’’

তাঁর কথায়, ‘‘সবে একটু আয়ের মুখ দেখছিল পরিবারটি। একটু ভাল করে বাঁচতে শিখছিল। মতিবুরের অকাল মৃত্যু সমস্ত কিছুই কেড়ে নিল।

Motibur rahman Delhi accident
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy