নিজের জীবন নিজে গড়ে নেওয়ার স্বপ্ন দেখে বিয়ে রুখেছে কেউ। কেউ পাশে পেয়েছে বন্ধু ও সহপাঠীদের। অনেকের ক্ষেত্রে আবার পাশে দাঁড়িয়েছেন স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকারা। কিন্তু গ্রামের মহিলারা একজোট হয়ে কোনও নাবালিকার বিয়ে রুখেছে এমন নজির মেলে না বড় একটা। এ বার সেই কাজটাই করে দেখালেন হবিবপুরের বুলবুলচণ্ডীর বাঁধপাড়া গ্রামের মহিলারা। শুক্রবার সকালে তাঁরাই আটকে দিলেন চোখের সামনে বড় হয়ে ওঠা ১৩ বছরের ছোট্ট মেয়ের বিয়ে।
জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে প্রতিবেশীর বাড়ি নিমন্ত্রণ খেতে গিয়ে নাবালিকার বিয়ের প্রতিবাদ করেছিল মালদহেরই মেয়ে অষ্টম শ্রেণির পড়ুয়া বিউটি খাতুন। তার জেরে বেধড়ক মার খেয়ে হাসপাতালে ভর্তি থাকতে হয়েছিল প্রতিবাদী বিউটিকে। অবশ্য তাতে পিছু না হটে আবারও কেউ নাবালিকার বিয়ে দিলে রুখে দাঁড়াবে বলে জানায় সে। ইংরেজবাজারের অমৃতি গ্রামে বাড়ি বিউটির। এখান থেকে বুলবুলচণ্ডীর বাঁধপাড়া গ্রামের দূরত্ত্ব ৪২ কিলোমিটার।
জানা গিয়েছে, তেরো বছরের কিশোরীকে একবার দেখেই পছন্দ করে ফেলেছিল চল্লিশোর্ধ পাত্র। বাড়িতে বিয়ে হলে রুখে দিতে পারে প্রশাসন, এমনটা আশঙ্কা করেই গ্রাম থেকে দুরে মন্দিরে নিয়ে গিয়ে বিয়ে করার ফন্দি এঁটেছিল সে। তাতে সামিল হয় কনে পক্ষও। এ দিন সকালে হাতে মেহেন্দি, পায়ে আলতা পড়িয়ে কনেকে নিয়ে মন্দিরে হাজির হয় তারা। মোটর বাইকে চেপে পাত্র বিয়ে করতে হাজির হলে কান্না জুড়ে দেয় মেয়েটি। হইচই শুনে ছুটে আসেন গ্রামের মহিলারা। এরপরেই বিষয়টি আঁচ করে রুখে দাঁড়ান। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে নাবালিকাকে উদ্ধার করে তার দুই আত্মীয়কে গ্রেফতার করলেও পালিয়ে যায় পাত্র। গ্রামের মহিলাদের এমন উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন পুলিশ প্রশাসনের কর্তারা। মালদহের পুলিশ সুপার অর্ণব ঘোষ বলেন, পুরো ঘটনাটি খতিয়ে দেখে আইননত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গ্রামের বধূ জ্যোৎস্না হালদার বলেন, ‘‘আমাদের চোখের সামনে ছোট্ট মেয়েটা বড় হচ্ছে। ভালো করে কথাই বলতে পারে না এখনও। ও কী করে সংসারের ঝক্কি সামলাবে এটা কেউ ভাবল না?’’ আরেক বধূ রীতা সরকার বলেন, ‘‘সারাক্ষণ প্রচার হচ্ছে নাবালিকার বিয়ে দেওয়া যাবে না। তারপরেও মানুষ কী ভাবে সাহস পায়? সব দেখে মুখ বুঝে থাকতে পারিনি।’’
জানা গিয়েছে স্বামীর মৃত্যুর পর দুই মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে ভাই শম্ভু হালদারের বাড়িতে থাকেন ওই কিশোরীর মা। আর্থিক কারণে প্রাথমিকের পর আর পড়াতে পারেননি মেয়েকে। অভিযোগ, শম্ভুবাবুই তার নাবালিকা ভাগ্নির বিয়ে ঠিক করেন মৎস্যজীবী কাঞ্চন বিশ্বাসের সঙ্গে। নাবালিকা মেয়ের বিয়ে দিতে মা অস্বীকার করলেও শম্ভু তাঁর ভাগ্নির বিয়ে দেওয়ার তোড়জোড় শুরু করে। বুধবার ওই নাবালিকার মা এক আত্মীয়ের বাড়িতে ঘুরতে গেলে, সেই সুযোগকে কাজে লাগানো হয়। তিনি বলেন, ‘‘আমি না থাকলে তাঁরা যে জোর করে বিয়ে দেবে তা ভাবতেই পারছি না। গ্রামের মানুষ না সাহায্য করলে আমার মেয়েটা শেষ হয়ে যেত।’’ আর ওই নাবালিকা বলে, ‘‘টাকার জন্য পড়তে পারিনি। মায়ের সঙ্গে লোকের বাড়িতে কাজ করি। মামা আর মামিই জোর করে বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। শুনেছি অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে দেওয়া ঠিক নয়। তাই কান্নাকাটি শুরু করেছিলাম।’’
হবিবপুর থানার পুলিশ নাবালিকার মামা শম্ভু হালদার ও তাঁর স্ত্রী চন্দনাকে গ্রেফতার করেছে। অভিযুক্ত পাত্রের খোঁজে তল্লাশি শুরু হয়েছে। অন্যদিকে বাঁধপাড়ার মহিলারা জানিয়েছেন, যে মেয়ের বিয়ে রুখে দিয়েছেন তাঁরা, সে সাবালিকা হলে নিজেরাই উদ্যোগী হয়ে চাঁদা তুলে বিয়ে দেবে তার। তবে মাত্র ১৩ বছর বয়সে কখনওই বিয়ে দিতে দেবেন না।