শিক্ষক-শিক্ষিকারা একজোট হওয়ায় সাহস পেয়ে এবার জোট বাঁধছেন মালদহের সামসি কলেজের পড়ুয়ারাও। এরপর কলেজে কেউ কোনও অভব্য আচরণ করলে তা জোট বেঁধেই রুখতে চান ছাত্রছাত্রীদের একাংশ। কেননা কলেজে ঢুকে দুই শিক্ষিকার সঙ্গে টিএমসিপি নেতার আচরণে শুধু সংগঠনের নয়, মুখ পুড়েছে কলেজেরও। তাই কলেজের সুনামের স্বার্থেই ভবিষ্যতে এমন ঘটনা যাতে আর না ঘটে, তা নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু করেছেন পড়ুয়াদের অনেকেই। আপাতত কলেজে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা চলছে। পরীক্ষা শেষ হলেই তাঁরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে কলেজের সুনাম যাতে বজায় থাকে সে বিষয়ে সচেষ্ট হবেন বলে জানিয়েছেন।
এ বারই প্রথম সামসি কলেজের ছাত্র সংসদ দখল করেছে টিএমসিপি। সেই সংসদের সংস্কৃতি সম্পাদক তাজামুল হকের বাড়বাড়ন্তে অতিষ্ঠ ছিলেন পড়ুয়াদের অনেকেই। শুধু তাজামুল নয়। আরও এক শ্রেণির নেতা ও পড়ুয়া কলেজে মাঝে মধ্যেই দাদাগিরি করেন বলে অভিযোগ। তাজামুলের লাগামছাড়া আচরণে শুধু পড়ুয়ারাই নয়, কলেজ কর্তৃপক্ষও অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন বলে অভিযোগ। কেননা মদ খেয়ে কলেজে আসাটা একরকম অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল তাঁর। কিন্তু সংগঠনের পাশাপাশি কলেজ কর্তৃপক্ষও কড়া ব্যবস্থা না নিয়ে তাঁকে বারবার সতর্ক করে ছেড়ে দেওয়ায় তাঁর দাপট বেড়েই চলেছিল বলেও অভিযোগ তুলেছেন পড়ুয়াদের পাশাপাশি সংগঠনের একাংশ। আর তার পরিণতিতেই বুধবারের ঘটনাটি ঘটে বলেও অভিযোগ তাঁদের। তাজামুলের অভব্য আচরণের বিষয়টি অজানা নয় কলেজ কর্তৃপক্ষেরও। পরিচালন সমিতির সভাপতি তথা জেলা যুব তৃণমূলের সভাপতি অম্লান ভাদুড়িও বলেন, ‘‘ও দুষ্ট প্রকৃতির ছেলে। ওকে আগে সতর্ক করা হলেও নিজেকে শোধরায়নি। এবার বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত হল।’’
কলেজের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মনোজ ভোজ বলেন, ‘‘আমরা তো শিক্ষক। ছাত্রছাত্রীদের ক্ষমার চোখেই দেখতে হয়। শোধরানোর সুযোগ দেওয়া হয়। কিন্তু তারও একটা সীমা আছে। সেই সীমা পার করায় কর্তৃপক্ষ ওর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে।’’
কলেজ ও পুলিশ সূত্রেই জানা গিয়েছে, বুধবার বারমুডা ও টি শার্ট পরে পরীক্ষা হল-এ ঢুকে দাদাগিরি করছিলেন তাজামুল। সামসি কলেজে পরীক্ষা দিচ্ছে হরিশ্চন্দ্রপুর কলেজের পড়ুয়ারা। মদ্যপ অবস্থায় নিছক দাদাগিরি দেখাতেই সঙ্গীদের নিয়ে তিনি পরীক্ষাকেন্দ্রে ঢুকে পড়েন। তাঁকে হল থেকে বের হতে বলায় শিক্ষিকাদের সঙ্গে তর্কাতর্কি জুড়ে দেন। তারপরেই ওই শিক্ষিকাদের ‘রেপ করিয়ে দেওয়ার’ হুমকি সহ কলেজের ছাদ থেকে নীচে ফেলে দেওয়ার মতো হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। তাঁকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করায় বাকি শিক্ষকদেরও তিনি অশালীন ভাষায় গালাগালি করতে থাকে বলেও অভিযোগ। তখনকার মতো নিরস্ত হলেও পরীক্ষা শেষে সে ফের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের ঘরে ঢুকে উল্টে দুই শিক্ষিকার বিচারের দাবিতে হম্বিতম্বি শুরু করে দেয়।
বুধবারের ওই ঘটনার পরে আর চুপ করে থাকতে পারেননি শিক্ষক-শিক্ষিকা এমনকি কলেজের অশিক্ষক কর্মীরাও। তাজামুলের বিরুদ্ধে পুলিশে অভিযোগ জানানোর পাশাপাশি কলেজে থেকে তাঁকে বহিষ্কারের দাবিতে কার্যত অন্দোলন শুরু করে দেন তাঁরা। তাঁদের দাবি মতো ব্যবস্থা নেওয়া না হলে পরদিন থেকে তাঁরা আর পরীক্ষায় পর্যবেক্ষকের দায়িত্ব নিতে পারবেন না বলেও লিখিতভাবে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষকে জানিয়ে দেন। এরপর রাতে কলেজ পরিচালন সমিতির সভাপতির বাড়িতে জরুরি বৈঠক ও সেখানেই তাজামুলের বিরুদ্ধে এফআইআর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
আর এসব কিছুই সম্ভব হয়েছে শিক্ষক-শিক্ষিকা-সহ কলেজের অশিক্ষক কর্মীরা মুখ বুজে না থেকে জোট বেঁধে প্রতিবাদের পথে হাঁটায়। আর তাঁদের দেখানো পথেই সাহস পেয়েছেন পড়ুয়ারাও। তাজামুলের সহপাঠী কলেজের কয়েকজন দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র বলেন, ‘‘যা হল তাতে নিজেকে সামসি কলেজের ছাত্র বলতেই লজ্জা হচ্ছে। এ বার আর আমরা মুখ বুজে থাকব না। শিক্ষকদের সঙ্গে তো বটেই, কলেজে কোনও অসভ্যতা দেখলেও আমরা রুখে দাঁড়াব।’’