চা বাগানের জমি ব্যবহারের নীতিতে নতুন সংশোধন ঘিরে ‘উত্তাপ’ বাড়ছে উত্তরে। তৃণমূল ছাড়া সব শ্রমিক সংগঠনই চা বাগানের ৩০ শতাংশ জমিতে পর্যটন এবং অনুসারী ব্যবাসয়িক কাজকর্ম করার সম্মতির সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে পথে নামার কথা ঘোষণা করেছে। বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনগুলিও মঞ্চ বেঁধে আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। যদিও চা শিল্পের বড় অংশ বলছে, এই সিদ্ধান্ত বর্তমান চা বাগানের ‘পরিস্থিতি’ সামাল দিতে পারবে। তবে পদক্ষেপ করতে হবে সাবধানে। যাতে চা বাগানের আয়তন না কমে বা চায়ের উৎপাদনও না কমে। রাজ্য সরকারের তরফে দাবি করা হচ্ছে, এমন সংশয়ের কারণ নেই। চা বাগানের অব্যবহৃত জমিতেই পর্যটন বা অনুসারী কাজকর্ম হবে। প্রশ্ন তৈরি হয়েছে বন্ধ চা বাগান নিয়েও।
উত্তরবঙ্গের বেশ কিছু বড় চা বাগান ইতিমধ্যে পর্যটন দেখেছে। দার্জিলিঙের মকাইবাড়ি, জলপাইগুড়ির বড়দিঘি চা বাগানে দেশ-বিদেশের পর্যটকেরা আসছেন। তবে এখনও যে চা পর্যটনগুলি তৈরি হয়েছে, তার বেশিরভাগই অভিজাত এবং মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে। প্রশাসনের দাবি, রাজ্য সরকার চা পর্যটনকে সাধারণের ধরাছোঁয়ার মধ্যে আনতে চাইছে এবং সেই কারণেই চা বাগানের অনুমোদিত জমির পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে। চা পরিচালকদের দেশের বৃহৎ সংগঠন ‘ইন্ডিয়ান টি অ্যাসোসিয়েশনের’ ডুয়ার্স শাখার সম্পাদক শুভাশিস মুখোপাধ্যায় বলেন, “চা শিল্প বর্তমানে যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, তাতে অনুসারী শিল্প বা কর্মকাণ্ড সবসময়ে স্বাগত। তবে চাষযোগ্য জমি কমলে চায়ের বাজারের ক্ষতি। এই দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় সাধন করেই এগোতে হবে।”
২০১৯ সালে চা পর্যটন নিয়ে রূপরেখা প্রকাশ করেছিল সরকার। সেই নীতিতে চা বাগানের অব্যবহৃত ১৫ শতাংশ জমিতে পর্যটন এবং সহযোগী কর্মকাণ্ড করার অনুমোদন ছিল। চলতি মাসে নতুন করে গেজ়েট বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে ১৫ শতাংশকে ৩০ শতাংশ করা হয়েছে। এবং চা বাগানের জমিতে কী কী করা যাবে, সেই তালিকায় রেস্তোরাঁ, ক্যাফেটেরিয়ারও উল্লেখ করা হয়েছে। বাকি জমি-নীতি এবং স্থানীয়দের কর্মসংস্থান-বিধি একই রয়েছে বলে দাবি। তবে সংশয় তৈরি হয়েছে শ্রমিকদের পাট্টার বিষয়টি ঝুলে থাকায়।
রাজ্য সরকার ‘চা সুন্দরী’ প্রকল্পে শ্রমিকদের আবাসন দিয়েছিল। পরবর্তীতে চা শ্রমিকেরা যেখানে বসবাস করছেন, সেখানেই পাট্টা দিয়ে বাড়ি তৈরির জন্য ১ লক্ষ ২০ হাজার টাকা করে দেওয়া শুরু হয়। বহু চা বাগানে সেই কাজ এখনও শুরু হয়নি। তারই মধ্যে চা বাগানের ৩০ শতাংশ জমিতে পর্যটন করার সিদ্ধান্তে শ্রমিকেরা আদৌও জমি পাবেন কিনা, সেই প্রশ্ন উঠছে। চা বাগানের জমি দখল হয়ে যেতে বসেছে বলে দাবি করেছে শ্রমিক সংগঠনগুলি।
পাহাড়ের রাজনৈতিক নেতারা ইতিমধ্যে ঘোষণা করেছেন, পাহাড়ের কোনও চা বাগানে তিরিশ শতাংশ জমি দেওয়া হবে না। চা শ্রমিক নেতা তথা তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ প্রকাশ চিক বরাইক দাবি করেছেন, শ্রমিকদের ভুল বোঝানো হচ্ছে। প্রকাশ বলেন, “চা শ্রমিকদের ভুল বোঝাচ্ছে বিরোধীরা। মুখ্যমন্ত্রী সাফ ঘোষণা করেছেন, এক জনও আদিবাসীর জমি নেওয়া হবে না। হলে কঠিন ব্যবস্থা হবে। কোথাও চা শ্রমিকদের এক ইঞ্চি জমি নেওয়া হচ্ছে কেউ দেখাতে পারবেন না।“
যদিও একাধিক আদিবাসী সংগঠন জোট বেঁধে আন্দোলনের প্রস্ততি নিচ্ছে। নানা ঘোষণায় উত্তাপ বৃদ্ধির আশঙ্কা বাড়ছে। তৃণমূল বাদে অন্য শ্রমিক সংগঠনগুলির যৌথ মঞ্চের আহ্বায়ক তথা সিটু নেতা জিয়াউফল আলম বলেন, “রাজ্যের ঘোষণা উত্তরবঙ্গের পরিস্থিতিতে অস্থির করেছে। চা বাগানের ৩০ শতাংশ জমি পর্যটনে দেওয়া লোকদেখানো। আসলে প্রোমোটিং বা আবাসন শিল্প হবে। চা পরিচালক-সহ সংশ্লিষ্ট কারও সঙ্গেই আলোচনা করা হল না।”
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)