Advertisement
E-Paper

জঙ্গল যেন জঞ্জালময়

লাটাগুড়ি বেড়াতে এসে নিজস্বী তুলতে গেলে সাবধান। জঞ্জালের ছবি ঢুকে পড়তে পারে ফ্রেমে। সাফারির টিকিট কাটতেও পেরোতে হবে আবর্জনার স্তূপ। উত্তরবঙ্গের পর্যটনের অন্যতম মুখ গরুমারার জঙ্গল। লাটাগুড়িকে কেন্দ্র করেই গরুমারা জঙ্গলের পর্যটন পরিকাঠামো গড়ে উঠেছে। সেই লাটাগুড়ির মুখ ঢাকতে শুরু করেছে জঞ্জাল। পর্যটনের মানচিত্রে গুরুত্বপূর্ণ লাটাগুড়িতে জঞ্জাল অপসারণের কোনও পরিকাঠামোই গড়ে ওঠেনি।

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১৩ নভেম্বর ২০১৫ ০২:১০
(বাঁ দিকে) জঙ্গলের মধ্যেই গর্ত খুঁড়ে ফেলা হয়েছে আবর্জনা। (ডান দিকে) জঙ্গলে গিয়ে এ সবই ফেলে আসেন অনেকে। —দীপঙ্কর ঘটক

(বাঁ দিকে) জঙ্গলের মধ্যেই গর্ত খুঁড়ে ফেলা হয়েছে আবর্জনা। (ডান দিকে) জঙ্গলে গিয়ে এ সবই ফেলে আসেন অনেকে। —দীপঙ্কর ঘটক

উত্তরবঙ্গের পর্যটনের অন্যতম মুখ গরুমারার জঙ্গল। লাটাগুড়িকে কেন্দ্র করেই গরুমারা জঙ্গলের পর্যটন পরিকাঠামো গড়ে উঠেছে। সেই লাটাগুড়ির মুখ ঢাকতে শুরু করেছে জঞ্জাল। পর্যটনের মানচিত্রে গুরুত্বপূর্ণ লাটাগুড়িতে জঞ্জাল অপসারণের কোনও পরিকাঠামোই গড়ে ওঠেনি। নেই কোনও ডাম্পিং গ্রাউন্ড। অভিযোগ, জনপদের নিকাশি ব্যবস্থাও না থাকার মতোই। সেই সঙ্গে বিষফোঁড়ার মতো রমরমিয়ে চলছে প্লাস্টিকের ক্যারিব্যাগের ব্যবহার। সবুজে ঘেরা হলেও, লাটাগুড়ি সহ জঙ্গল লাগোয়া এলাকা জঞ্জাল দূষণে আক্রান্ত বলে অভিযোগ। দীপাবলির পরের দিনই লাটাগুড়ি জুড়ে দেখা গেল কেবল দূষণ-দৃশ্য।

লাটাগুড়ি বাজার

৩১ নম্বর জাতীয় সড়কের পাশেই এই বাজার। স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে পর্যটকদেরও নানা প্রয়োজনীয় জিনিস কেনারও অন্যতম ভরসাস্থল। যদিও এই বাজারে যথাযথ নিকাশি ব্যবস্থা গড়েই তোলা হয়নি বলে অভিযোগ। বাজারের রাস্তায় মাছের আঁশ, রক্তের সঙ্গেই সব্জির খোসার সহাবস্থান। জঞ্জালের স্তূপে ঘুরে বেড়াচ্ছে কুকুর, বেড়াল। জঞ্জালের সঙ্গে মিশছে প্রাণীদের মলমূত্র। প্রতিদিন এই পরিবেশেই বাজার করতে যেতে হয় ক্রেতাদের। বুধবার ও শনিবার দু’দিন এই বাজারেই হাট বসে। তখন বাজারের পরিবেশ আরও দূষিত হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ। লাটাগুড়িতে নেই কোনও ডাম্পিং গ্রাউন্ড। অস্বাস্থ্যকর পরিস্থিতির মধ্যে বসে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া বাজারের ব্যবসায়ীরাও ক্ষুব্ধ। যদিও, ক্ষোভ জানিয়েও ফল মেলেনি বলে দাবি। হাট ব্যবসায়ী সমিতি সম্পাদক দিব্যেন্দু সাহার কথায়, ‘‘নানা মহলে নিকাশি তৈরির দাবি জানিয়েছি। এখন কার্যত হাল ছেড়েই দিয়েছি।’’

জঞ্জাল পেরিয়ে টিকিট

জাতীয় সড়কের বাসস্ট্যান্ডের পাশেই বন দফতরের লাটাগুড়ি রেঞ্জের অফিস। এখান থেকেই পর্যটকদের জঙ্গল সাফারির টিকিট কাটতে হয়। চারদিকেই দোকান, হোটেল সবই রয়েছে এবং আবর্জনা জমে রয়েছে যত্রতত্র। দীপাবলির পরদিন, বৃহস্পতিবার সেই ছবিটা বরং আরও একটু বেড়েই গিয়েছে। রেঞ্জ অফিসের পিছনে আবর্জনা জমে রয়েছে। পরিষ্কারের কোনই ব্যবস্থা এখানেও নেই বলে অভিযোগ। রেঞ্জ অফিসের পাশে থাকা বেশ কিছু দোকান মালিকের কথায়, ‘‘পর্যটকদের আবর্জনা মাড়িয়ে ঘুরে বেড়াতে দেখে দুঃখ হলেও বিকল্প কোনও উপায় নেই। ডাম্পিং গ্রাউন্ড নেই, ময়লা ফেলব কোথায়?’’

জঞ্জাল সর্বত্র

লাটাগুড়ি নেওড়া মোড় লাগোয়া এই প্রকৃতি বীক্ষণ শিবির থেকেই গরুমারা জাতীয় উদ্যানের প্রবেশের টিকিট সংগ্রহ করতে হয়। এখানেই জাতীয় সড়কের পাশে সার করে জঙ্গলে নিয়ে যাবার হুডখোলা জিপসি গাড়িও দাঁড়িয়ে থাকে। পর্যটকদের ভিড় সব সময়ই এই চত্বরে বেশি থাকে। কিন্তু দূষণ এখানেও থাবা বসিয়েছে। থার্মোকলের থালা, প্লাস্টিকের গ্লাস, বিয়ারের ক্যান জাতীয় সড়কের পাশে পড়ে থাকতে দেখা যায়। এখান থেকে একটু এগোলেই রেলের লেভেল ক্রসিং-এর পাশেও নোংরা আবর্জনার স্তুপও পড়ে থাকে। সাত সকাল বা ভরদুপুর—দূষণ চিত্রের বদল হয় না এখানে।

নেশার ঘোরে

লাটাগুড়ি লাগোয়া গরুমারা জাতীয় উদ্যানের মহাকালধামও আকর্ষণের কেন্দ্র। পুণ্যার্থীরা আসেন পুজো দিতে। পর্যটকরাও গভীর জঙ্গল চিরে চলে যাওয়া সড়কে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে আসেন। মহাকাল ধামের পাশের সেই ঝোরার ছবিও তোলেন পর্যটকরা। মহাকালের সামনে দাঁড়িয়ে নিজস্বী তুলতেও দেখা যায় অনেককে। তবে নিজস্বী হোক বা ছবি, ফ্রেমে ঢুকে পড়ে জঞ্জালের ছবিও। হয়ত রাস্তার পাশে বিয়ারের খালি বোতল গড়িয়ে যেতে দেখা যাচ্ছে, অথবা চিপসের প্যাকেট বা প্লাস্টিক, কাগজ ছড়িয়ে রয়েছে সবুজ ঘাস জমির উপরে। জঙ্গল ছুঁয়ে বয়ে গিয়েছে মূর্তি নদী। নদীর দু’পারে মদ আর বিয়ারের বোতল জমে জঙ্গলের পরিবেশ দূষিত করে তুলছে বলে অভিযোগ। প্লাস্টিকে করে নিয়ে আসা খাবার খেয়ে সেই প্লাস্টিকও জঙ্গলের ভেতরেই ছুড়ে ফেলে যাচ্ছে পথ চলতিরা। জঙ্গলে আসা নেশাগ্রস্ত অনেক পর্যটকেরাই এটা করছেন বলে ক্ষোভ স্থানীয়দের।

অতিষ্ঠ বাসিন্দারা

নিকাশি নিয়ে লাটাগুড়ির বাসিন্দারাও অতিষ্ঠ। বাসস্ট্যান্ড এলাকার ব্যবসায়ী রতন অধিকারীর কথায়, ‘‘এখানে ডাম্পিং গ্রাউন্ড নেই। সেই খেসারতটাই দিতে হচ্ছে।’’ যেখানে সেখানে ময়লা ফেলা হচ্ছে বলে অভিযোগ। ন্যূনতম বাধাও পঞ্চায়েতের তরফে কোনও দিন দেওয়া হয়নি বলে দাবি। লাটাগুড়ির বাসিন্দা তথা পরিবেশপ্রেমী অনির্বাণ মজুমদার বলেন, ‘‘পর্যটন এলাকা হিসাবে লাটাগুড়ির এই পরিস্থিতি কোনও ভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।’’ সমস্যার কথা মেনেছেন গরুমারা বন্যপ্রাণ বিভাগের ডিএফও সুমিতা ঘটকও। তাঁর কথায়, ‘‘লাটাগুড়ি গ্রাম পঞ্চয়েতে যদি প্লাস্টিক বন্ধ করা যেত, তা হলে জঙ্গলের উপরে অনেকটাই চাপ কমে আসত। আমরা আমাদের বনকর্মীদের দিয়ে নজরদারি চালাতে নির্দেশ দিলেও সব সময় দূষণ এড়ানো সম্ভব হচ্ছে না।’’

ক্ষুব্ধ পর্যটক

জঙ্গলের পরিবেশে বেড়াতে এসে ময়লা আবর্জনার স্তুপ যত্রতত্র পড়ে থাকতে দেখে অসন্তুষ্ট পর্যটকেরাও। কলকাতার চিংড়িঘাটা বেড়াতে আসা সন্দীপন নাগের কথায়, ‘‘কদিন খোলা হাওয়ায় নিঃশ্বাস নেব বলে বেড়াতে এসেছি। কিন্তু এখানেও দেখছি দূষণের হাত থেকে নিস্তার নেই।’’ চোখের সামনে আবর্জনা পড়ে থাকতে দেখে বিদেশি পর্যটকেরা তো রীতিমতো অবাক। তাঁদের অনেকের মত, পর্যটনকেন্দ্রে তো দূষণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আরও কড়াকড়ি থাকবে বলেই আশা করেছিলেন। কিন্তু এখানে তো কোনই প্রশাসনিক নজরদারি চোখে পড়ল না। পর্যটন ব্যবসায়ীদের বক্তব্য, ‘‘এমনটা চললে কিন্তু দেশবিদেশের পর্যটকদের কাছে ভুল বার্তা চলে যাবে।’’

দায়িত্ব এড়িয়ে

তবে পর্যটকদের যে কেবল ক্ষুব্ধ হলে চলবে না, তাঁদেরও নিজস্ব দায়িত্ব রয়েছে—মনে করাচ্ছেন হোটেল ব্যবসায়ী ও বাসিন্দারা। তাঁরা বলেন, একাংশ পর্যটক জঙ্গলে ঘুরতে এলেও অরণ্যভ্রমণের রীতিনীতি সম্বন্ধে একেবারেই সচেতন নন। প্লাস্টিক ফেলা তো বটেই, তাঁরা গভীর অরণ্যে গিয়ে জোরে গান বাজান। চেঁচামেচি করে বন্যপ্রাণের শান্তি বিঘ্নিত করেন। একদিকে তাঁদের যেমন সচেতন করা দরকার, তেমনই এমন পর্যটকদের কড়া শাস্তি না দিলে এই দূষণ সংক্রমণে রাশ টানা কঠিন।

ছড়াচ্ছে রোগও

প্লাস্টিকে বন্ধ হয়ে থাকা নর্দমার জমা জলে মশার বংশবিস্তার অবাধে চলছে। মশাবাহিত নানা রোগ ছড়ানোর আশঙ্কা বেড়েই চলেছে প্রতিদিন। বাসিন্দাদের দাবি, আগের থেকে এলাকায় জ্বরের সংক্রমণ অনেকটাই বেড়েছে। ছড়াচ্ছে শ্বাসকষ্টের মতো রোগও। সেই সঙ্গে ময়লার গন্ধেও অনেক সময় নাকে রুমাল দিতে হচ্ছে বাসিন্দাদের। সব মিলিয়ে অস্বাস্থ্যকর পরিস্থিতি রয়েছে লাটাগুড়িতে। সন্ধ্যার পর থেকেই লাটাগুড়ি বাজার এলাকায় মশার উপদ্রব যে পরিমাণে বেড়ে গিয়েছে তার জন্যে দূষণকেই দায়ি করছেন বাসিন্দারা।

অসহায় পঞ্চায়েত

লাটাগুড়ি গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান মুনি রায় জানান, একবার জাতীয় সড়ক লাগোয়া পুকুরের পেছনে জঙ্গল লাগোয়া এলাকাতে ডাম্পিং গ্রাউন্ড তৈরি করার চেষ্টা হয়েছিল। তারপর পশ্চিম লাটাগুড়ির নেওড়া নদীর পারে জঞ্জাল ফেলা শুরু হয়। এরপর ক্রান্তিমোড়ের কাছে স্থায়ীভাবে লালপুল লাগোয়া এলাকাতে ডাম্পিং গ্রাউন্ড তৈরির চেষ্টা চলছে। কিন্তু সেই চেষ্টা কবে সফল হবে তা নিয়ে কোনও দিশা দিতে পারেননি তিনি। প্রধান বলেন, ‘‘ডাম্পিং গ্রাউন্ড অবধি গিয়ে ময়লা ফেলাবার ইচ্ছা আমাদের থাকলেও সামর্থ্য নেই। পর্যটনের কথা ভেবে রাজ্য সরকার যদি বাড়তি আর্থিক তহবিল দেয় তাহলে লাটাগুড়িকে আরও পরিচ্ছন্ন করে গড়ে তোলা যেতে পারে।’’ তিনি জানান, কিন্তু সব প্রকল্পের বাধাই হল অর্থ। আর প্লাস্টিক বর্জনে চেষ্টা চালালেও সাড়া মিলছে না।

চাই কড়া দাওয়াই

লাটাগুড়ির এই দূষণ আক্রান্ত হয়ে ওঠায় যে বিদেশী পর্যটকদের আনাগোনা অনেক কমে যেতে পারে তা জানাচ্ছেন পর্যটন ব্যবসায়ীরা। তাঁদের মতে, দেশের অন্য অনেক জায়গায় এমন ক্ষেত্রে প্রশাসন যথেষ্ট কড়া। জঙ্গলের এলাকায় ঢোকার আগে প্লাস্টিক আছে কি না তা দেখতে পর্যটকদের গাড়ি পরীক্ষা করা হয়। যে সব প্লাস্টিক রয়েছে তা খাতায় নথিভুক্ত করে যেতে হয়। ফেরার সময়েও সেই তালিকা ধরে ধরে মেলানো হয় প্লাস্টিকের সংখ্যা। যাতে পর্যটকেরা জঙ্গলে প্লাস্টিক ফেলে না আসেন। অন্যথা হলে রয়েছে কড়া জরিমানার নিদান। বাংলার লাটাগুড়িতেও সেই একই ‘ফর্মুলা’ প্রয়োগ করুক প্রশাসন— চান বাসিন্দা, পরিবেশপ্রেমীদের অনেকে।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy