দু’দিন আগেই বাড়িতে বেড়াতে এসেছিলেন নাতনি আর ভাইপো। তাঁদের জন্য অনেক সাধ করে রবিবার দুপুরে নিজে হাতে ভাত, খেতের মুলো দিয়ে মাসকলাই ডাল, সব্জি রান্না করেন শুকতারা মণ্ডল ও তাঁর পুত্রবধূ কিরণদেবী। রান্না শেষে শুকতারাদেবী ছেলে বেণু, বৌমা আর নাতনিদের নিয়ে খেতেও বসেন। ভাইপো গৌতম সরকার তখন বাইরে ছিলেন। ফিরেই দেখেন বাড়ির সবাই পেট ব্যথায় কাতরাচ্ছেন। কোনও মতে তাঁদের হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করা গেলে রাত ১২টা নাগাদ শুকতারাদেবী মারা যান। রাত দু’টোয় মারা যান বেণুবাবু। আশঙ্কাজনক অবস্থায় পরিবারের আরও ৪ জনের চিকিৎসা চলছে জলপাইগুড়ি সদর হাসপাতালে।
জেলা স্বাস্থ্য কর্তাদের প্রাথমিক সন্দেহ, ময়নাগুড়ির দক্ষিণ খাগরাবাড়ি গ্রামে রবিবার দুপুরের ওই খাবার খেয়েই গভীর রাতে মা শুকতারা মণ্ডল (৬৫) ও ছেলে বেণু মণ্ডলের (৪৬) মৃত্যু হয়। খাবারে বিষক্রিয়াতেই এই ঘটনা ঘটেছে। কী ধরনের বিষক্রিয়া ঘটেছে সে বিষয়ে নিশ্চিত হতে সোমবার ওই পরিবারের রান্নাঘর থেকে চাল, ডাল, নুন, তেল-সহ রান্নার বিভিন্ন উপকরণের নমুনা সংগ্রহ করেছে স্বাস্থ্য দফতর।
জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক প্রকাশ মৃধা বলেন, “বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।” এ দিকে মৃত মা ও ছেলের দেহ ময়নাতদন্ত না করেই সকালে বাড়িতে নিয়ে আসা হলে এলাকায় হইচই শুরু হয়। পরে দুপুর নাগাদ ব্লক প্রশাসনের নির্দেশে পুলিশ ফের দেহ দু’টি ময়নাতদন্তের জন্য জলপাইগুড়ি সদর হাসপাতালে নিয়ে যায়। ময়নাগুড়ির বিডিও শ্রেয়সী ঘোষ বলেন, “ওই বিষয়ে কেউ আমাকে অভিযোগ জানাননি। কিন্তু ঘটনাটি শোনার পরে মনে হয়েছে ময়নাতদন্ত করা জরুরি। তাই স্থানীয় থানাকে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেই।”
ওই ঘটনার পরে প্রশ্ন উঠেছে কেন ময়নাতদন্ত না করে দেহ দু’টি হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হল? হাসপাতাল সুপার গয়ারাম নস্কর বলেন, “এ সব ক্ষেত্রে অনেক সময় পরিবারের লোকজন ময়নাতদন্ত করাতে চান না। অভিযোগও ছিল না। তাই পরিবারের লোকজনের অনুরোধে দেহ ছেড়ে দেওয়া হয়।”
স্থানীয় বাসিন্দাদের সূত্রে জানা গিয়েছে, রবিবার দুপুরে গৌতমবাবু যখন ফিরে দেখেন সবাই যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে, তখন তার কারণ জানতে তিনি ডাল-সব্জি খেয়ে দেখেন। কিছু ক্ষণের মধ্যে তিনিও অসুস্থ হয়ে পড়েন। প্রতিবেশী মিঠুন মণ্ডল বলেন, “কোনও মতে গাড়ি এনে ছ’জনকে ময়নাগুড়ি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। পরিস্থিতি খারাপ জানিয়ে চিকিৎসক তখনই সবাইকে জলপাইগুড়িতে পাঠিয়ে দেন।” পড়শিরা জানান, মা ও ছেলের অবস্থা দ্রুত খারাপ হয়। তার পর রাত বাড়তেই সব শেষ।
সকালে ঘটনার খবর পেয়ে এলাকায় যান স্থানীয় পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি সুভাষ বসু, কর্মাধ্যক্ষ মনোজ রায়, খাগরাবাড়ি-১ গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধান সীমা রায় এবং জেলা স্বাস্থ্য দফতরের কর্তারা। মৃত কৃষক বেণুবাবুর মামা ধীরেন সরকার বলেন, “কেমন করে এত বড় ঘটনা ঘটল বুঝতে পারছি না। ডাল অথবা সব্জির মধ্যে কিছু একটা মিশেছে।” কিন্তু কী মিশেছে সেটা স্পষ্ট নয় কারও কাছেই। চাষি পরিবারে রাসায়নিক সার, কীটনাশক থাকেই। স্থানীয় পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি বলেন, “অসাবধানবশত সেখান থেকে কিছু রান্নায় মিশেছে কিনা সেটা খতিয়ে দেখা দরকার।”