Advertisement
E-Paper

সবুজ উধাও হয়ে জঙ্গল এখন কংক্রিটের

এক সময় ব্রিটিশ সরকারের প্রতিনিধি থাকতেন ওই বাড়িতে। রাজ আমলের ঐতিহ্য বজায় রেখেই তৈরি করা হয়েছিল দোতলা বাড়িটি। বড় বড় গম্বুজ। ছোট ছোট কুঠুরি। ওই বাড়ির নাম ছিল নীলকুঠি। ওই বাড়ি ঘিরে থাকত প্রহরীরা। এখন তাঁর ধ্বংসাবশেষও নেই। আছে শুধু নামটুকু। ওই এলাকা এখনও নীলকুঠি নামে পরিচিত। শুধু নীলকুঠি নয়, গত সাত দশকে পুরোপুরি বদলে গিয়েছে শহর কোচবিহারের চেহারা।

নমিতেশ ঘোষ

শেষ আপডেট: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৫ ০২:০৩
(বাঁ দিকে) রাজ আমলের চিলা রায়ের ব্যারাক। (ডান দিকে) কোচবিহার এখন। —নিজস্ব চিত্র।

(বাঁ দিকে) রাজ আমলের চিলা রায়ের ব্যারাক। (ডান দিকে) কোচবিহার এখন। —নিজস্ব চিত্র।

এক সময় ব্রিটিশ সরকারের প্রতিনিধি থাকতেন ওই বাড়িতে। রাজ আমলের ঐতিহ্য বজায় রেখেই তৈরি করা হয়েছিল দোতলা বাড়িটি। বড় বড় গম্বুজ। ছোট ছোট কুঠুরি। ওই বাড়ির নাম ছিল নীলকুঠি। ওই বাড়ি ঘিরে থাকত প্রহরীরা। এখন তাঁর ধ্বংসাবশেষও নেই। আছে শুধু নামটুকু। ওই এলাকা এখনও নীলকুঠি নামে পরিচিত। শুধু নীলকুঠি নয়, গত সাত দশকে পুরোপুরি বদলে গিয়েছে শহর কোচবিহারের চেহারা। বহু জায়গা থেকে হারিয়ে গিয়েছে রাজ আমলের ঐতিহ্য। সেই সবুজ ঘাস, গাছ আর ফুলবাগানে ঢাকা শহর এখন ইট-কাঠ-পাথরের জঙ্গলে পরিণত হয়েছে। রাজার তৈরি রাস্তা থাকলেও তা শুধু নামেই। রাস্তা ঘেঁষে তৈরি হওয়া বাড়িগুলির সামনে আর ফুলের বাগান নজরে আসেনা। এমনকি সরকারি অফিস-আদালতের সামনেও আর দেখা যায় না সেই সুসজ্জিত বাগানগুলি।
কোচবিহারের ৭০-৮০ বছর কিংবা তদূর্ধ্বদের অনেকেই পুরানো শহরের কথা বলতে গিয়ে স্মৃতিমেদুর হয়ে পড়েন। তাঁদের চোখে সেই শহরের ছবি এখনও ঘুরে বেড়ায়। ইতিহাস ঘাঁটলেও উঠে আসে পুরনো সেই কোচবিহারের ছবি। যা নিয়ে আক্ষেপের শেষ নেই। কেমন ছিল সেই সময়ের কোচবিহার? রাস্তার রং ছিল লাল। সুরকি দিয়ে তৈরি করা হত রাস্তা। সুরকি শেষ হতেই সবুজ ঘাসের আবরণে ঢাকা থাকত মাটি। তার পরেই নিকাশি। রাস্তার দুই ধার দিয়ে শোভা পেত সারিবদ্ধ কৃষ্ণচূড়া ও রাধাচূড়া গাছ। গাছের ডালে ঘুরে বেড়াত কাঠবেড়ালি। রঙ-বেরঙের পাখির ডাকে মুখর হয়ে থাকত সকাল থেকে রাত। সুনীতি রোড, রাজা রাজেন্দ্র নারায়ণ রোড, বিশ্বসিংহ রোড, ম্যাগাজিন রোড সর্বত্র ছিল একই ছবি। সেই সময় অবশ্য এত ইটের বাড়ি শহরে ছিল না। বেশিরভাগ ছিল টিন ও দরমার। সেই বাড়িগুলি ছিল সাজানো-গোছানো। প্রত্যেকটি বাড়ির পাশে ছোট গলিপথ। কংক্রিটের বাড়ি বলতে রাজার তৈরি বাড়ি আর দফতর যেখানে সরকারি কাজকর্ম হত। কয়েকটি বাড়িতে থাকতেন মন্ত্রীরাও।
এখন যেটা রাসমেলার মাঠ নামে পরিচিত একসময় তা ছিল মিলিটারি প্যারেড গ্রাউন্ড। সেনা বাহিনী সেখানে প্যারেড করত। তোপধ্বনি করে শহরের বাসিন্দাদের সময় জানান দিত তাঁরা। ভবানীগঞ্জ বাজারে ছিল ছোট ছোট দোকান। দরমার বেড়া ও টিনের সেই সমস্ত ঘরে পসরা সাজিয়ে বসতেন দোকানিরা। বাজারের ঠিক মাঝখানে নজরদারির জন্য ছিল একটি মিনার যা ভিক্টোরিয়া জুবিলি টাওয়ার নামে পরিচিত ছিল। বাজার সংলগ্ন লালদিঘি, চন্দন দিঘি সহ শহরের বেশ কয়েকটি দিঘি ছিল। ওই দিঘিগুলিতে চারটি করে ঘাট ছিল। গ্রাম থেকে বাসিন্দারা গরুর গাড়ি, মহিষের গাড়ি করে শহরে আসতেন। দিঘির ধারে গরু, মোষের খাবারের জন্য বড় পাথরের পাত্র থাকত।

এখন ভবানীগঞ্জ বাজার ছেয়ে গিয়েছে কংক্রিটের দোকানে। এখন যা রানিবাগান নামে পরিচিত সেখান থেকে তোর্সা নদী ছিল অনেকটা দূরে। সেখানে একটি মসজিদ ছিল। সে সব এখন নেই। এখন সাগর দিঘির পাড়ে মহারাজার মূর্তি যেখানে, তার ঠিক পিছনে ছিল আইন সভার ঘর। কোচবিহারের স্টেশনের কাছে একটি বাংলো ছিল। বাইরের থেকে অতিথিরা আসলে ওই বাংলোতে থাকতেন।

রাজবাড়ি এখন পুরাতত্ত্ব বিভাগের হাতে। তাঁরাই তা দেখভাল করেন। সেখান থেকে এক কিলোমিটার দূরেই সাগরদিঘি। মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণের সময়েই ওই দিঘি তৈরি করা হয়। দিঘির চারদিকে একসময় সবুজ ঘাসে ভরা ছিল। এখন অবশ্য তা কংক্রিটে ঘেরা। দিঘির চারদিকে ছড়িয়ে রয়েছে স্থাপত্য। একশো বছর আগে রাজকুমার ভিক্টর নৃপেন্দ্র নারায়ণের জন্য তৈরি হয়েছিল ভিক্টর প্যালেস। মহারানি ভিক্টোরিয়া রাজকুমার ভিক্টরকে ওই উপাধি দিয়েছিলেন। রাজকুমার তাঁর স্ত্রী নিরুপমা দেবীকে নিয়ে সেখানে থাকতেন। সেই ভিক্টর প্যালেস এখন হয়েছে রাজবংশী ভাষা অ্যাকাডেমির অফিস। কয়েকদিন আগেও ওই বাড়ির হাল দেখলে শিউরে উঠতে হতো। ঝোপ –জঙ্গলে ভরে গিয়েছিল চারিদিক। সরকারি অফিস হওয়ার পরে তা সংস্কার করা হয়েছে। পাশেই রয়েছে কোচবিহার জেলাশাসকের পুরনো অফিস। ল্যান্সডাউন হল নামে কোচবিহারে তা বিখ্যাত হয়ে রয়েছে। একসময় অতিথিদের আপ্যায়নের জন্য ওই ভবন তৈরি করেছিলেন মহারাজা।

পাশেই পরিবহণ দফতরের অফিস। মহকুমাশাসকের অফিস। আদালত ভবন। অনগ্রসর কল্যাণ দফতরের অফিস মতিমহল। একসময় তা ছিল কোচবিহারের রাজস্ব মন্ত্রীর বাড়ি। চিলারায় ব্যারাকে একসময় রাজার সৈন্য থাকত। এখন তা ভারতীয় সেনার ক্যাম্প হয়েছে। রানিদের সমাধিস্থল এখন রানি বাগান। ভোলা আশ্রম পূর্ত দফতরের বাস্তুকারের আবাস। কুমার গজেন্দ্রনারায়ণ স্ত্রী সাবিত্রীদেবীকে নিয়ে যে বাড়িতে থাকতেন সেটি সাবিত্রী লজ নামে পরিচিত। তা আজ ধংসের মুখে। (চলবে)

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy