Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

২০ জানুয়ারি ২০২২ ই-পেপার

Padma Awardees 2021: প্রধানমন্ত্রীকে বাংলায় বললাম, ভাল আছি, দিল্লিতে মাতৃভাষা বলতে পেরে আমি গর্বিত

সুজিত চট্টোপাধ্যায়
নয়াদিল্লি ১০ নভেম্বর ২০২১ ২১:০৫
সুজিত চট্টোপাধ্যায়কে পদ্মশ্রী সম্মান তুলে দিচ্ছেন রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ।

সুজিত চট্টোপাধ্যায়কে পদ্মশ্রী সম্মান তুলে দিচ্ছেন রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ।
—নিজস্ব চিত্র।

বর্ধমানের আউশগ্রামের রামনগর থেকে নয়াদিল্লি। ২০০৪ সাল থেকে ২০২১। এই ১৭ বছরে আমার নানা মাইলস্টোন ছুঁয়ে আসার কথা দিয়ে লেখা হল এই ইতিবৃত্তটা।
আনন্দবাজার অনলাইন ২০২০-তে আমাকে তাদের বিচারে ‘বছরের বেস্ট’ মনোনীত করেছিল। সেই স্বীকৃতি পেয়ে জীবন ভরে গিয়েছিল। তার পরেই আমার সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে যোগাযোগ করা হয়। পদ্মশ্রীও আমার কাছে ব়ড প্রাপ্তি। গ্রামের এক জন সাধারণ শিক্ষককে নিয়ে দিল্লির লোকজন খোঁজখবর নেবেন এটা আমি কখনও ভাবিনি। এ জন্য আমি কেন্দ্রীয় সরকারকে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। আনন্দবাজার অনলাইনের কাছেও আমি কৃতজ্ঞ। দিল্লিতে পা রাখার পর থেকে যে ব্যবস্থা দেখছি তাতে আমি অভিভূত। যে হোটেলে ১৬০ টাকা এক পেয়ালা চায়ের দাম সেখানে থাকতে পারব কখনও ভাবিনি। দেশের সমস্ত রাষ্ট্রনায়করা সম্মান প্রদান অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রী আমাদের কাছে এলেন। প্রধানমন্ত্রী আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘‘কেমন আছেন?’’ এটা উনি বাংলায় বললেন। আমি বাংলাতেই বললাম, ‘‘ভাল আছি।’’ দিল্লির বুকে দাঁড়িয়ে বাংলা ভাষা বলতে পেরে আমার খুব গর্ব হয়েছে। ওঁরা সকলকে খুব উৎসাহ দিয়েছেন। এটা আমার কাছে একটা অভাবনীয় ঘটনা। আমি ভাবতেই পারিনি এমন ঘটনা জীবনে ঘটবে।

জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এই সম্মান যে আমি পাব এটা কখনও ভাবতে পারিনি। কারণ, ২০০৪ সালে আমি বিদ্যালয়-শিক্ষকতা থেকে অবসর নিই। তখন আজকের মতো স্কুলে পুনর্নিয়োগ ব্যবস্থা ছিল না। ফলে অবসরের পর আমার মাথায় খালি ঘুরছিল এ বার কী করব? বিষয়টা নিয়ে আমি বেশ চিন্তিত হয়ে পড়েছিলাম। সেই সময় আমাকে বাঁচিয়েছিল কয়েক জন ছেলে মেয়ে। এক দিন সকালে বিষ্ণুপুর, গেড়াই, বালিকাঁদর, হোয়েড়া, বেলেমাঠ আশপাশের এমন কয়েকটি গ্রাম থেকে কয়েক জন ছেলেমেয়ে এল আমার সঙ্গে দেখা করতে। ওরা তখন সদ্য মাধ্যমিক পাশ করেছে। ওরা বলল, ‘‘আমরা আপনার কাছে পড়তে চাই।’’ ওদের এই প্রস্তাবে আমি হাতে স্বর্গ পেলাম। আমি বললাম, ‘‘তোরা যখন পড়তে চাইছিস তা হলে পড়াব।’’ তখন ওদের যেন মুখে কিছুটা অন্ধকার নেমে এল। একটু কুণ্ঠিত স্বরেই ওরা জানতে চাইল, ‘‘কত বেতন দিতে হবে?’’ আমি বললাম, ‘‘বছরে ১ টাকা মাইনে নেব। তোরা দিতে পারবি তো?’’ ওদের মুখে খুশি আর ধরে না। সেই সোনাঝরা দিনটার কথা আমি ভুলব না। কারণ ওখান থেকেই আমার পুনর্জন্ম বলুন বা নতুন করে পথচলা সেটা শুরু হল। এ ভাবে কয়েক বছর যাওয়ার পর আমার ছাত্রছাত্রীদের সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু কর। এখন সেই সংখ্যাটা ৩০০-র বেশি। এখন আমি আর নিচু ক্লাসের ছেলেমেয়েদের আর পড়াতে পারি না। আর সময় পাই না। প্রথমে নবম শ্রেণীর পড়ুয়াদের পড়াতাম। পরে ওটা বাদ দিই। এখন সকালে দুপুরে, বিকালে তিনটি ব্যাচ পড়াই। বেতন নয়, আমি গুরুদক্ষিণা নিই ১ টাকা। কেউ হয়তো সাময়িক ভাবে ভুলে যায়। তবে প্রত্যেকেই পাশ করে গেলেও আমার কাছে এসে দিয়ে যায়।

Advertisement

এত দিন এ ভাবেই চলছিল। বছর পাঁচ-ছয় আগে আমার জীবন নতুন একটা দিকে মোড় নিল। আমি সাধারণত খুব ভোরে উঠি। ভোর সাড়ে তিনটে প্রথমে ফুল তুলি। তেমনই এক দিন ফুল তুলছি। আমাদের এলাকার বাসস্ট্যান্ডে দেখি একটি মেয়ে তার সন্তানকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘‘এত ভোরে কী ব্যাপার? কোথায় যাবি?’’ ও বলল, ‘‘আমার ছেলেটার থ্যালাসেমিয়া আছে। হাসপাতালে যাচ্ছি ওকে রক্ত দিতে।’’ মেয়েটির সেই উত্তর শুনে আমার মধ্যে একটা নতুন বিক্রিয়া শুরু হল। আমার একটা তীব্র খারাপ লাগা তৈরি হল। এর থেকেই মনে হতে লাগল, যতটা পারি ততটা সামর্থ নিয়েই ওদের পাশে দাঁড়াব। আমার পাঠশালার সকলের থেকে ১০ টাকা করে চাইলাম। উদ্দেশ্যটাও ছাত্রছাত্রীদের সকলকে খুলে বললাম। সকলেই খুব আগ্রহ ভরে দিল। প্রথম বছরে ওই মেয়েটিকে ৩ হাজার টাকা তুলে দিতে পেরেছিলাম। আজ সেই সংখ্যাটা আরও বেড়েছে। এখন ১০ জনকে আমরা সকলে মিলে আর্থিক সাহায্য দিতে পারি। প্রতি বছর সরস্বতী পুজোর সময় আমরা একটা অনুষ্ঠান করি থ্যালাসেমিয়া আক্রান্তদের নিয়ে। কলকাতা থেকে অনেকে আসেন। আমি তাঁদের কাছে কৃতজ্ঞ। এখন চাঁদাও ১০ টাকা বেড়ে ১০০ টাকা হয়েছে। ১০ জনের প্রত্যেককে আমরা ৫ হাজার টাকা তুলে দিতে পারি। আমার ছাত্রছাত্রীরাও গ্রামে গ্রামে ঘোরে। আমার ছাত্রছাত্রীরা পড়াশোনায় ভাল ফল করে। আমার এক ছাত্র মাধ্যমিকে ৯৯ শতাংশ নম্বর পেয়েছে। ওরা পড়াশোনা করে। আবার সমাজসেবাও করে। উন্নত চরিত্র গঠন করতে পারছে। এটা আমার কাছে একটা বড় প্রাপ্তি। আমি তাদের দীর্ঘজীবন এবং সাফল্য কামনা করি।

এত পাওয়ার মাঝেও একটা না পাওয়া আমাকে খোঁচা দেয় অবিরত। আমার স্ত্রী অসুস্থ ছিলেন। আমার ‘বছরের বেস্ট’ হওয়ার খবর উনি জানতেন। তার পর পদ্মশ্রী সম্মান পাওয়ার কথা শুনে অসুস্থ অবস্থাতেই তিনি আমাকে মিষ্টি খাইয়েছিলেন। উনি সবটা শুনে গেলেন। কিন্তু আমার সম্মান প্রাপ্তির এই দিনটা দেখে যেতে পারলেন না। গত ফেব্রুয়ারি মাসে উনি প্রয়াত হয়েছেন। ওঁর ত্যাগের জন্যই আজ আমি এই জায়গায়। উনি সেই সম্মান প্রাপ্তিটা দেখে যেতে পারলেন না এটাই আমার কাছে বড় কষ্টের। যে আগুন জ্বেলেছি তা মশালের মতো হাতে নিয়ে এগিয়ে যাব। যতটা পারি, যত দূর যাওয়া যায়।

(লেখক: আনন্দবাজার অনলাইনের ‘বছরের বেস্ট’ এবং পদ্মশ্রীপ্রাপ্ত শিক্ষক)

আরও পড়ুন

Advertisement