ইতিহাসের সমাপতন সম্ভবত একেই বলে। একদা ভোটের ফলাফলে নির্ণায়ক ভূমিকা নেওয়া বফর্স এবং টুজি ‘দুনীতি’র অভিযোগ পরবর্তী সময় প্রমাণিত হয়নি আদালতে। একই পরিণতি হল দিল্লির আবগারি মামলারও।
সুইডেন থেকে বফর্স কামান কেনার নেপথ্যে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পরে ১৯৮৯ সালের লোকসভা ভোটে প্রধানমন্ত্রিত্ব হারিয়েছিলেন রাজীব গান্ধী। ক্ষমতায় বসেছিলেন ‘বফর্স কেলেঙ্কারি’র অভিযোগ তুলে শিরোনামে আসা বিশ্বনাথপ্রতাপ সিংহ। কিন্তু দীর্ঘ আইনি লড়াইয়েও সেই দুর্নীতি প্রমাণ হয়নি। নরেন্দ্র মোদীর জমানায় ২০১৮ সালে সিবিআই নতুন করে মামলা শুরুর আবেদন জানালেও সুপ্রিম কোর্ট পত্রপাঠ তা খারিজ করে দিয়েছিল।
আরও পড়ুন:
একই ভাবে ২০১৪ সালে মনমোহন সিংহকে ক্ষমতাচ্যুত করতে মোদী-সহ বিজেপি নেতৃত্বের অন্যতম অস্ত্র ছিল টুজি স্পেকট্রাম কেলেঙ্কারি। কিন্তু ২০১৭ সালে মামলা খারিজ করে বিশেষ সিবিআই আদালত জানিয়ে দেয়, স্পেকট্রাম বণ্টনে কোনও দুর্নীতি হয়নি! মনমোহন সরকারের স্পেকট্রাম বণ্টন নীতিতেও কোনও অনিয়ম ছিল না। প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী আন্দিমুথু রাজা, করুণানিধির কন্যা কানিমোঝি-সহ অভিযুক্ত ডিএমকে নেতা-নেত্রীদের বেকসুর খালাস দিয়েছিল আদালত।
দিল্লির রাউস অ্যাভিনিউ আদালত শুক্রবার একই যুক্তিতে আবগারি দুর্নীতির মামলা থেকে দিল্লির প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরীওয়াল এবং প্রাক্তন উপমুখ্যমন্ত্রী মণীষ সিসোদিয়াকে মুক্তি দিল। বেকসুর খালাস পেলেন তাঁদের ২১ জন সহ-অভিযুক্তও। এঁদের মধ্যে রয়েছেন, ভারত রাষ্ট্র সমিতির প্রধান তথা তেলঙ্গানার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী কে চন্দ্রশেখর রাওয়ের কন্যা কে কবিতাও। অথচ এই মামলাকে হাতিয়ার করেই কেজরী-সিসোদিয়াকে জেলে পাঠিয়েছিল কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা। আবগারি দুর্নীতি নিয়ে প্রচার-ঝড় তুলে এক বছর আগে আম আদমি পার্টি (আপ) সরকারকে উৎখাত করে দিল্লিতে ক্ষমতা দখল করেছিল বিজেপি।
আপ-প্রধান কেজরীওয়ালের ক্ষেত্রে শুক্রবার আদালতের পর্যবেক্ষণ— গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে জোরালো তথ্যপ্রমাণ প্রয়োজন। কিন্তু তেমন কোনও তথ্যপ্রমাণ দাখিল করতে পারেনি তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই। সিবিআইয়ের তরফে অভিযোগ তোলা হয়েছিল যে, আবগারি দুর্নীতি মামলায় মূল চক্রান্তকারী ছিলেন কেজরীই। সিসোদিয়াকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার ক্ষেত্রে আদালতের পর্যবেক্ষণ, সিবিআই এমন কোনও তথ্যপ্রমাণ দাখিল করেনি, যা থেকে সিসোদিয়ার অপরাধমূলক আচরণের কোনও ইঙ্গিত পাওয়া যায়। আদালতের বক্তব্য, তদন্তকারী সংস্থার তরফে যে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের কথা বলা হয়েছিল, তা স্ববিরোধিতায় ভরা!
সেই সঙ্গে শুক্রবার সিবিআইয়ের উদ্দেশে নিম্ন আদালতের বিচারক জিতেন্দ্র সিংহ বলেন, “অভিযোগের সপক্ষে তথ্যপ্রমাণ দাখিল করতে না-পারলে সরকারি প্রতিষ্ঠানের উপর মানুষের আস্থা টলে যায়।” ঠিক যেমন ২০১৭ সালে ১৫৫২ পাতার রায়ে আদালত বলেছিল, ‘‘১ লক্ষ ৭৬ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতির যে অভিযোগ সিএজি তুলেছিল, তা পুরোপুরি ভিত্তিহীন। সিবিআই এবং ইডি ৩৫ জন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগই প্রমাণ করতে পারেনি। বাছাই করা কিছু তথ্য সাজিয়ে তাকে আকাশছোঁয়া বানিয়ে দুর্নীতি সাজিয়েছেন কিছু লোক। সবাই গুজব, গসিপ, জল্পনায় তৈরি জনমতের ভিত্তিতে চলছিল।’’ কিন্তু তার তিন বছর আগেই মনমোহন সরকারকে ‘বেইমান’ প্রতিপন্ন করে প্রধানমন্ত্রিত্বে আসীন হয়ে গিয়েছেন মোদী। ঘটনাচক্রে, আড়াই দশক পরে দিল্লিতে বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী হওয়া রেখা গুপ্তের শপথের বর্ষপূর্তি হয়ে গিয়েছে আবগারি মামলার রায় ঘোষণার ঠিক এক সপ্তাহ আগেই।