প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার জমানার মার্কিন বিদেশসচিব হিলারি ক্লিন্টন ২০১১ সালের ২১ অক্টোবর ইসলামাবাদে গিয়ে তৎকালীন পাক বিদেশমন্ত্রী হিনা রব্বানি খারের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন। আলোচনার শেষে যৌথ সাংবাদিক বৈঠকে তিনি একটি তীক্ষ্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেছিলেন। যা গত দেড় দশকে ভারতীয় উপমহাদেশের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণে বার বার ব্যবহৃত হয়েছে।
হিলারির মন্তব্য ছিল, ‘‘তুমি নিজের উঠোনে সাপ পুষবে, অথচ ভাববে, সেটা শুধু পড়শিকেই ছোবল মারবে, তা হয় না! শেষপর্যন্ত সেই সাপ তার পালককেও রেহাই দেবে না।” সরাসরি কিছু না বললেও হিলারির নিশানা ছিল পাক সেনা এবং সামরিক গুপ্তচর সংস্থা আইএসআই-এর ‘দ্বিমুখী নীতি’। আমেরিকার নিযুক্ত তৎকালীন পাক রাষ্ট্রদূত হুসেন হক্কানি পরবর্তী সময়ে তাঁর লেখা বই ‘পাকিস্তান বিটুইন মস্ক অ্যান্ড মিলিটারি’তে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাবে ইসলামাবাদের সেই দ্বিচারিতা তুলে ধরেছিলেন।
আরও পড়ুন:
কী সেই দ্বিচারী নীতি? ৯/১১ সন্ত্রাসের জেরে ২০০১ সালে আফগানিস্তানে হামলা চালিয়ে তালিবান সরকারের পতন ঘটিয়েছিল আমেরিকার নেতৃত্বাধীন নেটো বাহিনী। কিন্তু সে সময় হক্কানি (যে গোষ্ঠীর নেতা সিরাজুদ্দিন হক্কানি বর্তমানে আফগানিস্তানের তালিবান সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) নেটওয়ার্ককে কাজে লাগিয়ে আফগান সীমান্তবর্তী খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের (তৎকালীন নাম, ‘উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ) উত্তর ওয়াজিরিস্তানে তালিবান যোদ্ধাদের আশ্রয়, প্রশিক্ষণ ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছিল পাক সেনা এবং আইএসআই। এমনকি, পাক সেনার মদতে কাবুলে ভারতীয় দূতাবাস, বহুজাতিক বাহিনীর পরিকাঠামোর উপরেও হামলা চালিয়েছে হক্কানি নেটওয়ার্ক। যা ছিল হিলারির ক্ষোভের কারণ।
২০১১ সালের শেষপর্বে তৎকালীন মার্কিন সেনার জয়েন্ট চিফ অফ স্টাফসের চেয়ারম্যান অ্যাডমিরাল মাইক মুলেন সেনেট প্যানেলে আফগান যুদ্ধ পরিস্থিতির বিবরণ দিতে গিয়ে সরাসরি হক্কানি নেটওয়ার্ককে ‘আইএসআই-এর শাখা সংগঠন’ বলেছিলেন। হুসেনের দাবি, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধে পরাজয় এবং আশির দশকের গোড়ায় ভারতীয় সেনার সিয়াচেন দখলের পরে পাক সেনাকর্তাদের মনে আতঙ্ক গ্রাস করেছিল। ভারতীয় সেনার হামলায় কোণঠাসা হয়ে পড়লে তাঁরা যাতে আফগানিস্তানের মাটি ব্যবহার করে প্রত্যাঘাতের জন্য পুনর্সংগঠিত হতে পারেন, সে উদ্দেশ্যেই শুরু করা হয়েছিল কাবুলে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা।
আরও পড়ুন:
১৯৮৯ সালে তৎকালীন পাক সেনাপ্রধান জেনারেল মির্জা আসলাম বেগ এই সামরিক তত্ত্বের নাম দিয়েছিলেন ‘স্ট্র্যাটেজিক ডেপ্থ’ বা কৌশলগত গভীরতা। যা রূপায়ণের দায়িত্ব পেয়েছিল আইএসআই-এর গোপন অভিযান শাখা ‘ডিরেক্টরেট এস’। পুলিৎজ়ার জয়ী সাংবাদিক এবং পাকিস্তান-আফগানিস্তান বিশেষজ্ঞ স্টিভ কল তাঁর বই ‘ডিরেক্টরেট এস: দি সিআইএ অ্যান্ড আমেরিকা’স সিক্রেটস ওয়ার ইন আফগানিস্তান অ্যান্ড পাকিস্তান’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘ইসলামাবাদ মনে করেছিল আফগান তালিবান এবং অন্য পশতুন সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলিকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম। আশ্রয়, অর্থ, অস্ত্র এবং প্রশিক্ষণের বিনিময়ে ভারত ও অন্যান্য শত্রুদের বিরুদ্ধে চিরকাল তাদের ব্যবহার করা যাবে। কিন্তু পশতুন জাতীয়তাবাদের স্বাধীনচেতা সত্তার কথা ভুলে গিয়েছিল পাকিস্তান।’ ২০২১ সালের অগস্টে কাবুলে তালিবানের ক্ষমতা দখলের পর থেকেই শুরু হয়েছিল টানাপড়েন। এ বার তা বদলে গেল পুরদস্তুর যুদ্ধে।