Advertisement
E-Paper

ওষুধ ঘিরে আতঙ্ক, ডাক্তারদের মতে ভিত্তিহীন

কৃমির ওষুধ খাওয়ানোকে ঘিরে বুধবার থেকে তিন জেলায় হুলুস্থূল। আতঙ্ক-অশান্তি-মারপিট-রাস্তা অবরোধ কোনও কিছুই বাকি নেই। বুধবার সরকারি স্কুলে কৃমির ওষুধ খাওয়ার পরেই হাওড়া, দক্ষিণ ২৪ পরগনা এবং পূর্ব মেদিনীপুরের কয়েক হাজার শিশু অসুস্থ হয়ে পড়েছে বলে খবর ছড়ায়। যদিও বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য— কৃমির ওষুধ খেয়ে অসুখ হয়েছে, এমন ধারণার কোনও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১১ মার্চ ২০১৬ ০৩:৩৯

কৃমির ওষুধ খাওয়ানোকে ঘিরে বুধবার থেকে তিন জেলায় হুলুস্থূল। আতঙ্ক-অশান্তি-মারপিট-রাস্তা অবরোধ কোনও কিছুই বাকি নেই। বুধবার সরকারি স্কুলে কৃমির ওষুধ খাওয়ার পরেই হাওড়া, দক্ষিণ ২৪ পরগনা এবং পূর্ব মেদিনীপুরের কয়েক হাজার শিশু অসুস্থ হয়ে পড়েছে বলে খবর ছড়ায়। যদিও বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য— কৃমির ওষুধ খেয়ে অসুখ হয়েছে, এমন ধারণার কোনও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

এ ব্যাপারে কী বলছেন ডাক্তারেরা? তাঁদের মতে, যাদের শরীরে বেশি কৃমি থাকে, কৃমির প্রতিষেধক খেলে কখনও কখনও তাদের শরীরে প্রাথমিক কিছু প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। কিন্তু তা নেহাৎই সামান্য। যদি কৃমির ওষুধ খেয়ে কোনও শিশুর শরীরে কোনও মারাত্মক প্রতিক্রিয়া হয়ে থাকে, তবে তার পিছনে অন্য কোনও কারণ আছে বলে মনে করতে হবে। কারণ তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নেওয়া যায় যে, ওষুধের মান খারাপ ছিল বা মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে গিয়েছিল— তা হলেও তার থেকে গণহারে অসুস্থতা ছড়ানো সম্ভব নয় বলেই জোর দিয়ে বলছেন চিকিৎসকরা। তাঁদের কথায়, তেমন হলে ওষুধটি বড়জোর কার্যকরী হবে না। কিন্তু ওষুধের যা রাসায়নিক গঠন, তাতে হাজারে হাজারে শিশু অসুস্থ হয়ে পড়ার সম্ভাবনা নেই। স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যেরও দাবি, ‘‘১৬টা জেলায় ঠিকঠাক ভাবে সব হয়ে গেছে। বাকি কয়েকটা জায়গাতেই শুধু এমন আতঙ্ক ছড়িয়েছে। ওষুধের মান, মেয়াদ কোনওটাতেই সমস্যা ছিল না।’’

বিরোধী নেতাদের কারও কারও অবশ্য অভিযোগ, ওষুধের মেয়াদ পেরিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু স্বাস্থ্য দফতর এই অভিযোগকে আমল দেয়নি। আর মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ খেলেও যে এমনটা হওয়ার কথা নয়, সেটা মনে করিয়ে দিয়েছে তারা। স্বাস্থ্য অধিকর্তা বিশ্বরঞ্জন শতপথী, ‘‘প্রায় ৩৩ হাজার স্কুল পড়ুয়া হাসপাতালে এসেছিল। তা হলেই বুঝতে হবে কী পরিমাণ ফিয়ার সাইকোসিস ছড়িয়েছে! এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।’’ প্রতিষেধক খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ার খবর ঘিরে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে তা সামগ্রিক ভাবে এই টিকাকরণ কর্মসূচিরই ক্ষতি করবে বলে আশঙ্কা শিশু চিকিৎসকদের।

চিকিৎসক অপুর্ব ঘোষ বলেন, ‘‘কৃমির প্রতিষেধক খেয়ে সাধারণ ভাবে এমন হওয়ার কথাই নয়।’’ চিকিৎসক সুব্রত চক্রবর্তীর মতে, কৃমির ওষুধ খেয়ে অসুস্থ হওয়া অবাস্তব। তিনি বলেন, ‘‘যদি মেয়াদ ফুরোনো ওষুধও খেয়ে থাকে, তা হলেও অসুস্থ হওয়ার কথা নয়। অন্য কারণে বিষক্রিয়া হয়ে থাকতে পারে। কিংবা গুজব থেকেও আতঙ্ক ছড়াতে পারে।’’

স্বাস্থ্য দফতরের তথ্য অনুযায়ী, কেবল আতঙ্কের বশেই ৩৩ হাজার স্কুলপড়ুয়া হাসপাতালে এসেছিল। ১৮৮ জনকে ভর্তি করানো হয়। তাদের অধিকাংশকেই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বৃহস্পতিবার। স্বাস্থ্যকর্তা ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা বলছেন, রাজ্যের গ্রামাঞ্চলে অধিকাংশ শিশুই কৃমির সমস্যায় ভোগে। পাঁচ থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের ওই ওষুধ খাওয়ানো হয়েছে। যাদের কৃমি বেশি, ওষুধের জেরে তাদের অনেকেরই পেটে মোচড় দিতে পারে। গা গোলাতে পারে, মাথাও ঝিমঝিম করতে পারে। কিন্তু টানা বমি হতে পারে না।

এক স্বাস্থ্য-কর্তা বলেন, ‘‘এর আগে একাধিকবার পালস পোলিও কর্মসূচিকে ঘিরে এমন গুজব ওঠায় প্রতিরোধ ব্যবস্থাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরিস্থিতি এমন হয়েছিল যে বিভিন্ন এলাকায় পোলিও টিকা নিয়ে স্বাস্থ্যকর্মীরা ঢুকতেই পারেননি।’’ তাই বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, স্থানীয় ক্লাব এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কাছে স্বাস্থ্য দফতরের আর্জি, মানুষের বিভ্রান্তি দূর করার চেষ্টা করুক তারা। পূর্ব মেদিনীপুর, হাওড়া এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনায় শিশুদের অসুস্থ হয়ে পড়ার খবর ছড়াতে থাকে বুধবার থেকে। হঠাৎই রটে যায়, কোলাঘাট, ময়না, চণ্ডীপুর, ভগবানপুর এলাকার স্কুলের অনেক পড়ুয়া অসুস্থ বোধ করছে। কয়েকশো শিশুকে নিয়ে জেলার হাসপাতালগুলিতে ভিড় করেন বাবা-মায়েরা। অসুস্থদের দেখতে দিঘা স্টেট জেনারেল হাসপাতালে যান রামনগরের বাম প্রার্থী তাপস সিংহ। বিক্ষোভকারীদের মুখে পড়েন তিনি। তাপসবাবুর ডান চোখে আঘাত লাগা ছাড়াও কপালে ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে।

যে জেলাগুলিতে সমস্যা হয়নি, দ্রুত খবর ছড়ানোয় সেখানেও আতঙ্কিত হয়ে পড়েন বাবা-মায়েরা। বালি থেকে কয়েক জন পড়ুয়া বুধবার রাতে অসুস্থ হয়ে উত্তরপাড়া স্টেট জেনারেল হাসপাতালে যায়। চিকিৎসকেরা পরীক্ষা করে দেখেন, মূলত আতঙ্ক থেকেই তারা অসুস্থ বোধ করছিল। আতঙ্কের জেরে দক্ষিণ ২৪ পরগণার বাসন্তীর ফুলমালঞ্চ ঋতুভগৎ হাইস্কুল, সোনাখালি হাইস্কুল, যশোদা হাইস্কুল, ঝড়খালি হেড়োভাঙা বিদ্যাসাগর বিদ্যামন্দির, নারায়ণতলা রামকৃষ্ণ বিদ্যামন্দির এ দিন বন্ধ ছিল। কিছু প্রাইমারি স্কুলও বন্ধ ছিল। জেলার সহকারী স্কুল-পরিদর্শক শুভেন্দু মিস্ত্রি বলেন, ‘‘শিক্ষকেরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। তাই স্কুলে আসছেন না।’’

এ দিন হাওড়ার উলুবেড়িয়ায় রাস্তা অবরোধ হয়। বেশ কিছু অভিভাবক জগাছার উনসানি হাইস্কুলে চড়াও হয়ে টেবিল-চেয়ার ভাঙচুর করেন। তবে বিভিন্ন জেলায় ‘অসুস্থ’ শিশুর অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে বোঝা যায়, ওষুধ খেয়ে শরীর খারাপের চেয়েও হাসপাতালে গিয়ে পরিষেবা না পেয়ে তাঁরা বেশি ক্ষুব্ধ। হাসপাতালগুলির পক্ষে রোগীর চাপ সামলানো অসম্ভব হয়ে উঠেছিল। সেই সুযোগেই ভোটের বাজারে ‘পাশে দাঁড়ানো’র প্রতিযোগিতায় নামে রাজনৈতিক দলগুলি। এই পরিস্থিতিতে আইনজীবী আবু সোহেল একটি জনস্বার্থ মামলা দায়ের করে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের আর্জি জানান। আজ, শুক্রবার হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি মঞ্জুলা চেল্লুর ও বিচারপতি অরিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আদালতে মামলাটি শুনানির জন্য উঠতে পারে।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy