Advertisement
E-Paper

ভার্চুয়াল ডাক্তারই কি ভরসা প্রত্যন্ত গ্রামে

সালোয়ার কামিজের ওপরে সাদা অ্যাপ্রন। হাতের আঙুল স্বচ্ছন্দে ঘুরছে কম্পিউটারের কি-বোর্ডে। অদূরে ব্লাড প্রেশার মাপার যন্ত্র। রয়েছে ব্লাড সুগার মাপার ব্যবস্থা। এমন কী ইসিজি-র যন্ত্রও। রোগী ঘরে ঢোকামাত্রই তরুণী জানিয়ে দিলেন, ‘‘সরাসরি স্পেশ্যালিস্ট ডাক্তারকে দেখাতে পারবেন না। কিন্তু আমরা যারা এখানে রয়েছি, তারা ওই ডাক্তারেরই চোখ আর হাত।

সোমা মুখোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ ০২:৫৪
কম্পিউটারের অন্য প্রান্তে রয়েছেন ডাক্তার। চলছে রোগী দেখার কাজ।নিজস্ব চিত্র

কম্পিউটারের অন্য প্রান্তে রয়েছেন ডাক্তার। চলছে রোগী দেখার কাজ।নিজস্ব চিত্র

সালোয়ার কামিজের ওপরে সাদা অ্যাপ্রন। হাতের আঙুল স্বচ্ছন্দে ঘুরছে কম্পিউটারের কি-বোর্ডে। অদূরে ব্লাড প্রেশার মাপার যন্ত্র। রয়েছে ব্লাড সুগার মাপার ব্যবস্থা। এমন কী ইসিজি-র যন্ত্রও। রোগী ঘরে ঢোকামাত্রই তরুণী জানিয়ে দিলেন, ‘‘সরাসরি স্পেশ্যালিস্ট ডাক্তারকে দেখাতে পারবেন না। কিন্তু আমরা যারা এখানে রয়েছি, তারা ওই ডাক্তারেরই চোখ আর হাত। আমাদের মাধ্যমেই তিনি আপনাকে দেখবেন। আর কয়েক মিনিটের মধ্যে তাঁর প্রেসক্রিপশন পৌঁছে যাবে আপনার হাতে।’’

পোশাকি নাম ‘রুরাল হেলথ কিয়স্ক’। প্রথম ধাক্কায় ব্যাপারটা একটু গুলিয়ে যাওয়ার মতো মনে হলেও বিষয়টা বুঝিয়ে দিলেন ‘স্পেশ্যালিস্ট’ ডাক্তারদের ওই ‘দূত’রাই।

সেটা কেমন? কিয়স্কের কর্মীরা জানালেন, বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররা বসে রয়েছেন কলকাতায়। রোগী এলে তাঁদের সঙ্গে কথা বলে সমস্ত উপসর্গ, প্রাথমিক পরীক্ষানিরীক্ষার ফল, এমন কী রোগীর সমস্যা অনুযায়ী শরীরের কোন নির্দিষ্ট অংশে অসুবিধাটা হচ্ছে, তার সবিস্তার বিবরণ বিশেষ সফটঅয়্যারের মাধ্যমে ডাক্তারের কাছে পাঠিয়ে দিচ্ছেন তাঁরা। তারপর রোগীর সঙ্গে ফোনেও কথা বলে নিচ্ছেন ডাক্তার। সেই কথোপকথনের ভিত্তিতেই কম্পিউটারের মাধ্যমে প্রেসক্রিপশন পৌঁছে যাচ্ছে রোগীর কাছে। যদি সমস্যা গুরুতর হয়, তা হলে রোগীকে কোথায় যেতে হবে, কী কী পরীক্ষা করতে হবে, সেই সংক্রান্ত পরামর্শও দেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজনে কথা হতে পারে স্কাইপ-এও।

Advertisement

২০ টাকার টিকিট করিয়ে এই ‘ভার্চুয়াল ডাক্তার’দেরই শরণাপন্ন হচ্ছেন বহু মানুষ। বীরভূমের বড়ঞাঁ গ্রামে পরীক্ষামূলকভাবে এই প্রকল্প শুরু করেছে এক বেসরকারি সংস্থা। ইতিমধ্যেই এই প্রকল্পে যুক্ত হয়েছে জনস হপকিনস ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া আরভাইন, আইআইটি খড়্গপুর, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ও শিবপুরের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ারিং সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি। রাজ্যের স্বাস্থ্যকর্তারাও জানিয়েছেন, যে ভাবে প্রশিক্ষিত ডাক্তারের আকালে ভুগছেন প্রত্যন্ত গ্রামের অসংখ্য মানুষ, সেখানে এই বিকল্প ব্যবস্থা কিছুটা হলেও সমস্যার সুরাহা করতে পারবে।

প্রকল্পের অন্যতম পরামর্শদাতা, খড়্গপুর আইআইটি-র প্রাক্তন অধিকর্তা অমিতাভ ঘোষ বললেন, ‘‘বড়ঞাঁ গ্রামটার কথাই ধরুন। বড় গ্রাম। প্রায় ২৫ হাজার মানুষের বাস। অথচ একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারও নেই। বিশেষজ্ঞের কাছে যেতে হলে ৫৫ কিলোমিটার দূরে সিউড়িতে যেতে হয়। সেই আতঙ্কে শরীর খারাপ হলেও সেটা চেপে রাখতে বাধ্য হন অধিকাংশই।’’ এই পরিস্থিতিতে প্রশিক্ষণহীন কারও কাছে যাওয়ার বদলে প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াটাই অনেক ভাল বলে মনে করছেন তিনি।

ঠিক কী ধরনের প্রশিক্ষণ? কারাই বা তা নিতে আসছেন? প্রতিষ্ঠানের তরফে কুহেলি সাহা এবং সোহম বন্দ্যোপাধ্যায় জানালেন, এই মুহূর্তে রাজ্যে এমন চারটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র খোলা হয়েছে। অল্প দিনের মধ্যেই খোলা হবে আরও দু’টি। ইতিমধ্যেই ন্যাশনাল স্কিল ডেভলপমেন্ট অর্গানাইজেশন-এক অনুমোদনও পেয়েছেন তাঁরা। ক্লাস এইট পাশ করা ছেলেমেয়ে থেকে শুরু করে স্নাতকোত্তর তরুণ-তরুণীরাও আসছেন। এক বছরের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। থিওরি এবং প্র্যাক্টিক্যাল, দু’রকমের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাই থাকছে।

প্রশ্ন উঠেছে, এ ভাবে কি অ-চিকিৎসকদের দিয়ে ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা সম্ভব? নাকি এতে রোগীরা আরও বিভ্রান্ত হবেন? সংগঠনের কর্ণধার, চিকিৎসক শতদল সাহার দাবি, বিভ্রান্ত হওয়ার প্রশ্নই নেই। তিনি বলেন, ‘‘যেখানে প্রত্যন্ত গ্রামে ডাক্তারের অভাবে সাধারণ মানুষ প্রতি মুহূর্তে হোঁচট খাচ্ছেন, সেখানে প্রশিক্ষিত কর্মীদের সাহায্যে ডাক্তার ও রোগীর মধ্যে যদি সেতু তৈরির চেষ্টা হয়, তা হলে তাতে আখেরে মানুষের উপকারই হবে। ভবিষ্যতে এই কিয়স্ক বিভিন্ন গ্রামে ছড়িয়ে দেওয়া হবে।’’

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রাজ্যের ৩৮ হাজার গ্রামে হাতুড়ে ডাক্তারের সংখ্যা প্রায় দু’লক্ষ। আর রাজ্যে নথিভুক্ত চিকিৎসকের সংখ্যা ৪০ হাজারের কিছু বেশি। চিকিৎসকের ঘাটতিটা ঠিক কোন জায়গায়, তা এই পরিসংখ্যান থেকেই স্পষ্ট হয়। এর আগে পল্লী চিকিৎসক বা চালু কথায় হাতুড়ে ডাক্তারদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার কাজ শুরু করেছিল একটি বেসরকারি সংগঠন। এমন কী সরকারি স্তরেও হাতুড়ে ডাক্তারদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

এ-ও কি তা হলে খানিকটা ‘উন্নত’ মানের হাতুড়ে তৈরির চেষ্টা চলছে? উদ্যোক্তা সংস্থা অবশ্য সরাসরি তা বলতে রাজি নয়। তাদের বক্তব্য, পল্লী চিকিৎসকেরাই এই মুহূর্তে গ্রামাঞ্চলের চিকিৎসার একটা বড় অঙ্গ সে কথা ঠিক। কিন্তু এ ক্ষেত্রে যাঁদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে তাঁরা ‘ফ্রন্টলাইন হেলথ ওয়ার্কার’। তাঁরা রোগীর প্রাথমিক পরিচর্যাটুকু করে রোগীর সঙ্গে ডাক্তারের যোগাযোগটা ঘটিয়ে দিচ্ছেন। রাতবিরেতে কারও কোনও সমস্যা হলে, যেখানে বহু ক্ষেত্রে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুই ভবিতব্য হয়ে ওঠে, সেখানে তাঁরা প্রাথমিক চিকিৎসা করে অনেকের প্রাণও বাঁচাচ্ছেন। যা হচ্ছে, তার সবটাই বিজ্ঞানভিত্তিক। তাই হাতুড়ে ডাক্তারদের সঙ্গে এঁদের এক পংক্তিতে ফেলা ঠিক হবে না।

সংশয় অবশ্য আরও আছে। প্রশ্ন উঠেছে, যেখানে বহু প্রত্যন্ত গ্রামে এখনও পর্যন্ত বিদ্যুতের সরবরাহই ঠিকঠাক নেই, সেখানে ইন্টারনেটের ভরসায় এমন একটা প্রকল্প কী ভাবে বাস্তবসম্মত হবে?

এর উত্তর সময়ই দেবে বলে মনে করছেন উদ্যোক্তারা।

Virtual Doctors Rural Health Kiosk
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy