Advertisement
E-Paper

পশুজবাই আইন কার্যকর ছিল না, দাবি বিকাশের! তা হলে প্রতি বছর বিজ্ঞপ্তি জারি হত কেন, পাল্টা প্রশ্ন তুলল হাই কোর্ট

মামলাকারী মহম্মদ জাফর ইয়াসনির বক্তব্য, কর্তৃপক্ষ যেন আইনের বিধি মেনে ইদের কোরবানির বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশিকা জারি করে। সরকার অনুমোদিত জবাইখানার তালিকা প্রকাশ করে।

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২১ মে ২০২৬ ১৪:৪৪

— প্রতীকী চিত্র।

বকরি ইদের আগে গরু এবং মহিষ জবাইয়ের উপর রাজ্য সরকার যে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে, তাকে কেন্দ্র করে বেশ কয়েকটি জনস্বার্থ মামলা রুজু হয়েছে হাই কোর্টে। তারই শুনানিতে বৃহস্পতিবার মামলাকারী সংগঠনের আইনজীবী বিকাশ ভট্টাচার্যের সওয়াল, কোনও আইন যদি দীর্ঘ দিন কার্যকর না করা হয়, তবে তার কার্যকারিতা ক্ষীণ হয়ে যায়। এই নিয়ে হাই কোর্টের পর্যবেক্ষণ, পশু জবাই নিয়ে আইন কার্যকর ছিল বলেই এত মামলা রুজু হয়েছে। প্রতি বছর তা নিয়ে বিজ্ঞপ্তিও জারি হয়।

রাজ্যের সওয়াল

রাজ্য জানিয়েছে, ১৪ বছরের বেশি বা স্থায়ী ভাবে অক্ষম পশুকেই জবাইয়ের ‘উপযুক্ত’ হিসাবে বিবেচনা করা হবে।

জনস্বার্থ মামলাকারীর বক্তব্য

মামলাকারী রামকৃষ্ণ পালের বক্তব্য, গরু জবাই সম্পূর্ণ ভাবে বন্ধ করা হোক। এমনকি, সমস্ত ধরনের জবাইয়ের উপরে পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করুক আদালত। বকরি ইদের নামে নিরীহ ও বোবা পশুদের হত্যা করা হয়। হিন্দু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে ‘বলিদান’-এর অর্থ কোনও পশুকে হত্যা করা নয়, বরং নিজের ভিতরের পশুসুলভ প্রবৃত্তিকে দমন করা।

মামলাকারীর বক্তব্য

মামলাকারী মহম্মদ জাফর ইয়াসনির বক্তব্য, কর্তৃপক্ষ যেন আইনের বিধি মেনে ইদের কোরবানির বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশিকা জারি করেন। সরকার অনুমোদিত জবাইখানার তালিকা প্রকাশ করুক। সাধারণ নাগরিকের যাতে কোনও রকম বেআইনি হয়রানির শিকার হতে না হয়, সেটিও নিশ্চিত করুক আদালত। রাজ্যের বিজ্ঞপ্তি জবাই নিয়ন্ত্রণ নিয়ে জনসাধারণের জন্য নোটিস। এই বিষয়ে ১৯৫০ সালের আইনের নিয়মে স্পষ্ট ভাবে উল্লেখ রয়েছে জবাইয়ের জন্য ‘ফিটনেস শংসাপত্র’ লাগবে। কিন্তু এই রাজ্যে ‘ফিটনেস শংসাপত্র’ কে দেবে, সেই পরিকাঠামোই নেই। এর আগে আদালত রাজ্যকে প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো গড়ে তোলার নির্দেশ দিয়েছিল, কিন্তু তারা তা করতে ব্যর্থ হয়েছে।

মামলাকারীর বক্তব্য, অর্ধশিক্ষিত ও নিরক্ষর মানুষও এই কাজের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। তাঁদের আইনের বিষয়ে সচেতন হওয়া জরুরি, কিন্তু তাঁরা কোথায় যাবেন? পশু চিকিৎসক কারা? সেই বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা নেই। আগামী ২৮ মে বকরি ইদ। তার আগে তড়িঘড়ি এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হল। রাজ্যের উচিত ছিল, সব পক্ষের সঙ্গে ওই বিষয়ে আলোচনা করা। বর্তমান পরিস্থিতিতে এখনই আইন কার্যকর করা সম্ভব কি না, তা বিবেচনা করা। একটি গরুর গড় আয়ু প্রায় ১৫ বছর, তা হলে হঠাৎ করে ১৪ বছরের গরু খুঁজে পাওয়া কী ভাবে সম্ভব?

বিজ্ঞপ্তি বাতিলের আবেদন

মহম্মদ শাকিল ওয়ারসির আইনজীবী সব্যসাচী চট্টোপাধ্যায় রাজ্যের বিজ্ঞপ্তি বাতিলের আবেদন জানান। তাঁর বক্তব্য, ১৯৫০ সালের আইনের সাংবিধানিক বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করছি। রাজ্যের বিজ্ঞপ্তি বাতিল করা হোক। যাঁরা ইতিমধ্যেই গরু কিনে ফেলেছেন, তাঁদের জন্য আইন শিথিল করা হোক।

বিকাশের সওয়াল

জমিয়ত ই-উলেমার আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য জানান, আমরা রাজ্যের বিজ্ঞপ্তি এবং সংশ্লিষ্ট আইনের সাংবিধানিক বৈধতা— উভয়কেই চ্যালেঞ্জ করেছি। ১৯৫০ সালের আইনটির উদ্দেশ্য ছিল, পশু জবাই নিয়ন্ত্রণ করা। কৃষিকাজের স্বার্থে পশু সংরক্ষণ করা উচিত, তাই ওই আইন আনা হয়। কিন্তু এখন আর কৃষিকাজ গরু বা মহিষের উপর নির্ভরশীল নয়। প্রযুক্তির উন্নতির ফলে সেই পরিস্থিতি বদলে গিয়েছে। অন্য দিকে, পরিসংখ্যান বলছে গবাদি পশুর সংখ্যা স্বাস্থ্যকর হারে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং দুধ উৎপাদনও বেড়েছে। মোট গবাদি পশুর জনসংখ্যার ৩৬ শতাংশেরও বেশি গরু। গরুর সংখ্যা ১.৩ শতাংশ বেড়েছে। পুরুষ গবাদি পশুর সংখ্যা কমলেও, স্ত্রী গবাদি পশুর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। উত্তরপ্রদেশে গবাদি পশুহত্যা সম্পূর্ণ ভাবে বন্ধ, তবুও সেখানে গরুর সংখ্যা কমছে। আর পশ্চিমবঙ্গে বাড়ছে।

বিকাশের সওয়াল, ওই আইনটি শুধুমাত্র সেই সব পুর এলাকায় কার্যকর, যেগুলি ১৯৫২ সালে পুরসভা ছিল। এর বাইরে নয়। কারণ, আইনটি ১৯৫২ সালেই কার্যকর হয়েছিল। ফলে কলকাতা এবং কালিম্পংয়ের বাইরে এই আইন কার্যকর করা উচিত নয়। আইনে বলা হয়েছে, ‘‘কোনও ব্যক্তি সার্টিফিকেট ছাড়া কোনও পশু জবাই করতে পারবেন না।’’ কিন্তু এই আইনের অধীনে পঞ্চায়েত সমিতিগুলিকে কখনও আনুষ্ঠানিক ভাবে বিজ্ঞাপিত করা হয়নি। কোনও জৈবিক পরীক্ষা ছাড়া কী ভাবে একটি পশুর বয়স নির্ধারণ করা সম্ভব?

তাঁর যুক্তি, আইনে বলা হয়েছে, শংসাপত্র দিতে অস্বীকার করলে কোনও ব্যক্তি ১৫ দিনের মধ্যে রাজ্যের কাছে আপিল করতে পারবেন। অর্থাৎ, আইনে আপিলের অধিকারটি বাধ্যতামূলক। আর বিজ্ঞপ্তি জারি হয়েছে গত ১৩ মে। বলা হয়েছে, ধর্মীয়, চিকিৎসা বা অন্যান্য বিশেষ উদ্দেশ্যে এই আইন প্রযোজ্য হবে না, যত ক্ষণ না তা প্রতিবেশীদের ধর্মীয় অনুভূতি বা আইন-শৃঙ্খলার উপর প্রভাব ফেলে। অর্থাৎ, ধর্মীয় উদ্দেশ্যের জন্য আইনেই ব্যতিক্রমের ব্যবস্থা রয়েছে। কোনও আইন যদি দীর্ঘ দিন কার্যকর করা না হয়, তবে তার কার্যকারিতা ক্ষীণ হয়ে যায়।

বিকাশের বক্তব্য, মানুষ এখানে কোনও প্রদর্শনীর জন্য আসেননি। গরুর হাট বন্ধ হয়ে গিয়েছে। এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যে, দোকানপাটও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। মানুষ তাঁদের ধর্মীয় আচার পালন করতে না পেরে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন। আমি ব্যক্তিগত ভাবে ধার্মিক নই, কিন্তু সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়েছেন। অন্য ধর্মের সঙ্গে যুক্ত গবাদি পশু ব্যবসায়ীরাও ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে জবাইয়ের জন্য ফিটনেস সার্টিফিকেট পাওয়া বাস্তবে সম্ভব নয়। কোনও পশুকে জবাইয়ের উপযুক্ত ঘোষণা করা হলে, পুরসভা অনুমোদিত জবাইখানায় জবাই করা যাবে। পশ্চিমবঙ্গে এমন কতগুলি কেন্দ্র রয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

হাই কোর্টের পর্যবেক্ষণ

হাই কোর্ট জানায়, যদি এই আইন কার্যকর না থাকত, তা হলে এতগুলি মামলা দায়ের করারই কোনও প্রয়োজন হত না। প্রতি বছর এই সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি জারি হয়েছে। তা হলে কি এটা বলা ন্যায্য হবে যে আইনটি কার্যকর ছিল না?

পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসার পর বিজেপি সরকার পশুহত্যা সংক্রান্ত আইন কার্যকর করেছে। ১৯৫০ সালের প্রাণিসম্পদ আইন অনুযায়ী কয়েকটি নিয়ম বলবত করা হয়েছে। নির্দেশ অনুযায়ী, প্রশাসনের অনুমোদন ছাড়া গবাদি পশু হত্যা করা যাবে না। ১৪ বছর বয়স হয়নি, এমন গবাদি পশুকে জবাই করা যাবে না। তা ছাড়াও মাংস কাটার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট স্থানীয় কর্তৃপক্ষ কিংবা পশ্চিমবঙ্গের প্রাণিসম্পদ দফতরের লিখিত অনুমতি প্রয়োজন। এর ফলে ইদে গরুজবাই নিয়ে ‘অনিশ্চয়তা’ তৈরি হয়েছে বলে দাবি।

Calcutta High Court Animal Slaughter
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy