সমাজমাধ্যমে রাজনৈতিক সমালোচনা করে শাসকের রোষে পড়ার ঘটনা যখন অহরহ ঘটছে, তখন একটি মামলায় ‘তাৎপর্যপূর্ণ’ নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। তেলঙ্গানা হাই কোর্টের একটি নির্দেশ বহাল রেখে শীর্ষ আদালত সম্প্রতি জানিয়েছে, সমাজমাধ্যমে কেউ রাজনৈতিক সমালোচনা করলেই তাঁর বিরুদ্ধে ‘যান্ত্রিক’ ভাবে অভিযোগ দায়ের করে গ্রেফতার বা অন্য কোনও ধরনের হেনস্থা করা যাবে না।
শীর্ষ আদালত ওই নির্দেশে স্পষ্ট বলে দিয়েছে, একটি অভিযোগ দায়ের হলেই পুলিশ পদক্ষেপ করতে পারবে না। প্রশাসনকে সময় নিয়ে তদন্ত করে দেখতে হবে, আদৌ অভিযোগের ভিত্তি রয়েছে কিনা। সংশ্লিষ্ট পোস্টটি বাক্ স্বাধীনতার গণ্ডির মধ্যে রয়েছে কি না। তার পরেই যা করার করতে হবে। ‘অতিসক্রিয়তা’ থেকে প্রশাসনকে দূরত্ব বজায় রাখারও পরামর্শ দিয়েছে আদালত।
গত দেড় দশকে পশ্চিমবঙ্গে নানা ঘটনায় সমাজমাধ্যমে পোস্টের জেরে শাসকের কোপে পড়ার অভিযোগ উঠেছে। বাম জমানায় যে হেতু সমাজমাধ্যমের এই রমরমা ছিল না, তা-ই সেই পর্বে এই ধরনের অভিযোগও খুব একটা উঠত না। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারে আসার পরে এমন একাধিক ঘটনা নিয়ে সরব হয়েছে বিরোধী দল থেকে মানবাধিকার সংগঠনগুলি। ২০১২ সালের এপ্রিল মাসে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অম্বিকেশ মহাপাত্রকে গ্রেফতার করা হয়েছিল ফেসবুকে একটি কার্টুন ‘ফরওয়ার্ড’ করার অভিযোগে। প্রেক্ষাপট ছিল কেন্দ্রের রেলমন্ত্রী পদে দীনেশ ত্রিবেদীর জায়গায় মুকুল রায়কে স্থলাভিষিক্ত করা। সেই অম্বিকেশকে এক রাত লকআপে কাটিয়ে পরের দিন জামিন পেতে হয়েছিল আদালত থেকে। তিনি সুপ্রিম কোর্টের ওই রায়কে স্বাগত জানিয়েও বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। অম্বিকেশের কথায়, ‘‘এই রায়কে আমি স্বাগতই জানাচ্ছি। কিন্তু অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, এই রায় কতটা অনুসৃত হবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। যে আইনগুলি রয়েছে, তা-ই অনেক সময়ে কার্যকর হয় না।’’ অম্বিকেশ জানিয়েছেন, ওই মামলায় পুলিশ আদালতে তাঁকে ১৪ দিন হেফাজতে নিতে চেয়েছিল। যদিও আদালত জামিন মঞ্জুর করে। তবে সেই মামলা তাঁকে টানতে হয়েছে ১১ বছর ধরে। ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে সেই মামলার নিষ্পত্তি হয়। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের এ-ও দাবি, তিনি জানতেও পারেননি, ওই পর্বে তাঁর বিরুদ্ধে হরিদেবপুর এবং হেয়ার স্ট্রিট থানাতেও দু’টি পৃথক মামলা দায়ের হয়ে গিয়েছিল।
আরও পড়ুন:
ফেসবুকে বিদ্রূপাত্মক পোস্টের জন্য সরকারি হাসপাতালের অরুণাচল দত্ত চৌধুরীকে নিলম্বিত করেছিল স্বাস্থ্য দফতর। ২০১৭ সালের সেই ঘটনাতেও হইচই পড়েছিল রাজ্য রাজনীতিতে। তিনি সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক রায় সম্পর্কে বলেন, ‘‘এটাই তো হওয়া উচিত। কেন কেউ আমার মুখে লাগাম পরাতে চাইবে? আমার কথা খারাপ হলে সমাজমাধ্যমে তার সমালোচনা করার সুযোগ রয়েছে। সেই পরিসরকে কেন সঙ্কুচিত করে সরকার পদক্ষেপ করবে?’’ ২০১৭ সালের অক্টোবরে বারাসত হাসপাতালের চিকিৎসক থাকাকালীন অরুণাচলকে নিলম্বিত করেছিল স্বাস্থ্য ভবন। তিনি জানিয়েছেন, আইনজ্ঞের পরামর্শেই তিনি মামলা না-করে চুপ করে ছিলেন। তার পরে দেখা যায়, ২০২০ সালে অবসরের চার মাস আগে তাঁকে কাজে নিয়োগ করে স্বাস্থ্য ভবন। কিন্তু সল্টলেকের বাসিন্দা অরুণাচলকে বারাসত থেকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল উত্তরবঙ্গের কালিম্পঙে।
মানবাধিকার সংগঠন এপিডিআর-এর সাধারণ সম্পাদক রঞ্জিত শূরের কথায়, ‘‘সুপ্রিম কোর্টের এই রায় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। গোটা দেশ জুড়েই শাসকের বিরুদ্ধে কথা বললে এ হেন পদক্ষেপ করা হচ্ছে। সেই তালিকায় পশ্চিমবঙ্গের মতোই রয়েছে অসম, উত্তরপ্রদেশ-সহ বিভিন্ন রাজ্য। তবে এই রায় যাতে কার্যকরী হয়, তা-ও শীর্ষ আদালতেরই দেখা উচিত।’’