ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) সংক্রান্ত মামলায় সুপ্রিম কোর্ট সোমবার যে নানা নির্দেশ দিয়েছে, তাকে সামনে রেখে পুরো বিষয়টিকে নির্বাচন কমিশন এবং বিজেপির জন্য ধাক্কা হিসাবে তুলে ধরে প্রচার শুরু করল তৃণমূল কংগ্রেস। উল্টো দিকে, রাজ্য সরকারেরই মুখ পুড়েছে বলে পাল্টা দাবি বিজেপির। আর সিপিএমের মতে, কমিশন-রাজ্য টানাপড়েনে মানুষের হয়রানি চলছে। দু’পক্ষকেই ধাক্কা খেতে হয়েছে সর্বোচ্চ আদালতে।
মাইক্রো অবজ়ার্ভারেরা ভোটার তালিকা সংক্রান্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত যে নিতে পারবেন না, সুপ্রিম কোর্ট তা এ দিন স্পষ্ট করে দিয়েছে। এর পরেই তৃণমূলের প্রতিক্রিয়া, ‘সুপ্রিম কোর্ট নির্বাচন কমিশনের খামখেয়ালিপনা, ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে ভর্ৎসনা করেছে। বিজেপির সঙ্গে যোগসাজশে খেলা এই কূটচাল প্রকাশিত। এটা গণতন্ত্র, বাংলার জয়।’ পাশাপাশি, এসআইআর প্রক্রিয়ায় রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে অসহযোগিতার যে অভিযোগ বিজেপি ও কমিশন তুলেছিল, তারও জবাব দিয়েছে তৃণমূল। শাসক দল বলেছে, ‘রাজ্য সম্পর্কে কিছুই জানেন না এমন মাইক্রো অবজ়ার্ভারদের ‘প্যারাশুটে নামিয়ে’ আনার কী প্রয়োজন ছিল? রাজ্যের তরফে অসহযোগিতার প্রশ্নই ওঠে না।’ এই সূত্রেই এসআইআর-এর বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পরে রাজ্য সরকারের এক লক্ষ আধিকারিক এই প্রক্রিয়ায় রয়েছেন বলে ‘হিসাব’ দিয়েছে তৃণমূল।
সুপ্রিম-নির্দেশকে স্বাগত জানিয়ে তৃণমূলকে পাল্টা নিশানা করেছে বিজেপিও। দলের রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের দাবি, “তৃণমূল দিল্লিতে এসেছিল কালো কাপড় পরে। তাতে সুপ্রিম কোর্ট চুনকাম করে দিয়েছে! মুখ্যমন্ত্রীর দাবি কার্যত নস্যাৎ করেছে। সংবিধান যে ভারতের সব রাজ্যের জন্য প্রযোজ্য, পশ্চিমবঙ্গ আলাদা রাষ্ট্র নয়, তা বোঝানোর জন্য সুপ্রিম কোর্টকে ধন্যবাদ।” এই সূত্রে এসআইআর চলবেই এবং ভোটারের নামে আপত্তি তোলার ফর্ম ৭ পোড়ানোর অভিযোগ নিয়ে এখনও এফআইআর না-হওয়ায় রাজ্য পুলিশের ডিজি-কে শো-কজ়— সুপ্রিম কোর্টের এই দুই পদক্ষেপকে হাতিয়ার করেছে বিজেপি। তাদের বক্তব্য, ‘সুপ্রিম-নির্দেশে মমতা-সরকারের বড় ধাক্কা। রাজ্যের পক্ষ থেকে সিনিয়র ইআরও নিয়োগে ব্যর্থতা সামনে এসেছে। আদালত স্পষ্ট করেছে, মাইক্রো অবজ়ার্ভারেরা তাঁদের সহায়ক ভূমিকা বজায় রাখবেন এবং ইআরও-দের আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’
বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীও বলেছেন, “মুখ্যমন্ত্রী চেষ্টা করেছিলেন ২০২৪-এর ত্রুটিযুক্ত ভোটার তালিকাকে সামনে রেখে নির্বাচন করতে। সফল হননি। চূড়ান্ত তালিকায় অনুপ্রবেশকারী মুসলিমদের নাম থাকলে আমরাও সুপ্রিম কোর্টে যেতে পারি।” তৃণমূলের মুখপাত্র কুণাল ঘোষের পাল্টা দাবি, “মোটের উপরে মুখ্যমন্ত্রী যা যা বলেছিলেন, সুপ্রিম কোর্ট তাতে মান্যতা দিয়েছে। মাইক্রো অবজ়ার্ভারেরা নাম দিতে পারবেন না, এটা প্রথম থেকে মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন।”
সুপ্রিম কোর্টে মুর্শিদাবাদের মোস্তারি বানুর দায়ের করা এসআইআর মামলারও শুনানি ছিল এ দিন। সেই সূত্র ধরেই সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তী বলেছেন, ‘‘এসআইআর-এ ভুক্তভোগী এক জন গরিব মানুষ মামলা করেছিলেন, মুখ্যমন্ত্রী এক বারও খোঁজ করার সময় পাননি। নিজেরা অনেক দেরিতে একই বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টে গেলেন। সাড়ে ৮ হাজার আধিকারিক এখন দেওয়ার কথা বললেন, যেটা আগে দিলে মানুষের হয়রানি কমত। আর মানুষের নাম বাদ দিতে কমিশনের মাধ্যমে বিজেপির ষড়যন্ত্রও ফের ধরা পড়ল।’’ তাঁর সংযোজন, ‘‘আমাদের দাবি নির্ভুল তালিকা। আদালত বাড়তি সময় দেওয়ায় তালিকা বিলম্বিত হবে কিন্তু নির্ভুল হবে কি না, এখনও বিশ্বাস নেই!’’
প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকারের মামলারও শুনানি এ দিনই ছিল। শুভঙ্করের মতে, ‘‘মুখ্যমন্ত্রী ও তাঁর দল হয়তো প্রচার পেল। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট সমস্যার খুব গভীরে যেতে চায়নি বলেই আমাদের মনে হয়েছে। যে কারণে মানুষের এত হয়রানি, সেই যুক্তিগ্রাহ্য অসঙ্গতি (লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি) বাতিল হলেই বেশি স্বস্তি মিলত।’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)