কলকাতা হাই কোর্টের তীব্র ভর্ৎসনার মুখে পড়ে রাজ্যের কারা ব্যবস্থার বেহাল অবস্থার প্রশ্নে তৎপর হল নবান্ন। বুধবার বিচারপতি দেবাংশু বসাকের নেতৃত্বাধীন ডিভিশন বেঞ্চে মামলার শুনানির শুরুতেই রাজ্যের অ্যাডভোকেট জেনারেল কিশোর দত্ত জানান, আদালতের নির্দেশের পরই বুধবার বিকেলে হাই কোর্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠকে বসছে রাজ্য সরকার। উদ্দেশ্য, জেলগুলির পরিকাঠামো, অতিরিক্ত বন্দির চাপ, কর্মীর অভাব এবং বকেয়া অর্থ সংক্রান্ত দীর্ঘ দিনের সমস্যার সমাধান সূত্র বার করা।
অ্যাডভোকেট জেনারেল আদালতে স্বীকার করেন, রাজ্যের প্রায় সব জেলেই তিনটি বড় সমস্যা প্রকট আকার নিয়েছে, অতিরিক্ত বন্দিদের সমাগম, পর্যাপ্ত সংখ্যক কর্মীর অভাব এবং পরিকাঠামোর ঘাটতি। আদালতের একের পর এক নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও এই তিনটি ক্ষেত্রে বাস্তব অগ্রগতি খুবই সীমিত। এই পরিস্থিতিতে অবসরপ্রাপ্ত কোনও বিচারপতির নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে গোটা বিষয়টি খতিয়ে দেখার প্রস্তাব দেয় রাজ্য।
কিন্তু হাই কোর্ট স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, শুধু কমিটি গঠন বা আশ্বাসে সন্তুষ্ট নয় তারা। বিচারপতিরা মনে করিয়ে দেন, গত বছর মুখ্যসচিব নিজে জেল পরিকাঠামো উন্নয়নের জন্য একটি স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) তৈরির আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবে সেই এসওপি কার্যকর হওয়ার কোনও দৃশ্যমান ফল এখনও নেই। বরং একাধিক জেল সংস্কারের কাজ বকেয়া টাকার অজুহাতে থমকে রয়েছে।
বিশেষ করে পূর্ত দফতরের এক ইঞ্জিনিয়ারের ভূমিকা নিয়ে ডিভিশন বেঞ্চ ক্ষোভ প্রকাশ করে। আদালতে জানানো হয়, সংশ্লিষ্ট ইঞ্জিনিয়ার দাবি করেছেন, সরকারের কাছে তাঁর প্রাপ্য বকেয়া না মেটানো পর্যন্ত তিনি জেল সংস্কারের কোনও কাজ করবেন না। এই বক্তব্য শুনে বিচারপতি বসাক বলেন, এই ধরনের মানসিকতা ‘উদ্বেগজনক’ এবং এমন মনোভাব নিয়ে কেউ আদালতের সঙ্গে যুক্ত কোনও কাজ করার যোগ্য নন। আদালতের পর্যবেক্ষণে, বন্দিদের মৌলিক অধিকার এবং মানবাধিকার প্রশ্নে এমন উদাসিনতা প্রশাসনিক ব্যর্থতারই পরিচয়।
আরও পড়ুন:
ডিভিশন বেঞ্চ রাজ্যকে স্পষ্ট নির্দেশ দেয়, ওই ইঞ্জিনিয়ারের বিরুদ্ধে কী প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা লিখিত ভাবে জানাতে হবে। একই সঙ্গে রাজ্যকে মনে করিয়ে দেওয়া হয়, জেলগুলি কেবল সাজাপ্রাপ্ত বা বিচারাধীন বন্দিদের রাখার জায়গা নয়, সেখানে মানবাধিকারের সুরক্ষা নিশ্চিত করা সাংবিধানিক দায়িত্ব। বন্দিদের নাগরিক অধিকার লঙ্ঘিত হলে আদালত আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হবে বলেও ইঙ্গিত দেয় বেঞ্চ।
উল্লেখ্য, জেলগুলিতে অতিরিক্ত বন্দির চাপ, চিকিৎসা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি, নতুন ব্যারাক নির্মাণে বিলম্ব এবং বকেয়া বিল নিয়ে দফতরগুলির টানাপড়েন— এই সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ক্রমশ উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। আদালতের মতে, শুধু ফাইল চালাচালি নয়, মাঠপর্যায়ে কাজের অগ্রগতি নিশ্চিত করাই এখন রাজ্যের প্রধান দায়িত্ব। মামলার পরবর্তী শুনানি ধার্য হয়েছে আগামী ১০ ফেব্রুয়ারি। সেই দিন রাজ্য সরকারকে কমিটি গঠন, প্রশাসনিক পদক্ষেপ এবং জেল সংস্কার সংক্রান্ত বাস্তব অগ্রগতির বিস্তারিত রিপোর্ট আদালতে পেশ করতে হবে। না হলে, বন্দিদের নাগরিক অধিকার রক্ষায় হাই কোর্ট আরও কঠোর নির্দেশ দিতে পারে বলে স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলেছে।