দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর পেট্রাপোলে প্রস্তাবিত সুসংহত চেকপোস্ট তৈরির কাজ প্রায় শেষ। বন্দর সূত্রের খবর, খুব শীঘ্রই উদ্বোধন করতে আসতে পারেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। বন্দর সূত্রের খবর, ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহেই যে কোনও দিন ঘোষণা করা করা হতে পারে। চেকপোস্টটি চালু হলে ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে বাণিজ্যের উন্নতি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। সেই সঙ্গে চেকপোস্টে নিরাপত্তাও বাড়বে বলে মনে করছে সব পক্ষ।
বাংলাদেশের সঙ্গে বছরে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য চলে পেট্রাপোল দিয়ে। যদিও এত দিন পর্যন্ত ওই বন্দরের পরিকাঠামো উন্নতমানের ছিল না। বর্তমানে পেট্রাপোল বন্দর এলাকায় সেন্ট্রাল ওয়্যারহাউস কর্পোরেশনের যে ট্রাক টার্মিনাস রয়েছে, সেখানে মাত্র সাড়ে আটশোর মতো পণ্যবাহী ট্রাক দাঁড়াতে পারে। যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। তা ছাড়া, জায়গার অভাবে ‘নো ম্যানস ল্যান্ডে’ই বাংলাদেশ থেকে পণ্য নিয়ে আসা বাংলাদেশি ট্রাক থেকে পণ্য ওঠানো নামানোর কাজ করতে হয়। ‘নো ম্যানস ল্যান্ডে’র মূল গেট দিয়ে একই সঙ্গে পাসপোর্ট নিয়ে সাধারণ মানুষ দু’দেশের মধ্যে প্রায় হাজার পাঁচেক মানুষ যাতায়াত করেন। একই সঙ্গে মূল গেটে পাশের অন্য একটি রাস্তা দিয়ে পণ্য নিয়ে রফতানির জন্য এ দেশের ট্রাক বেনাবোলে যায়। বেনাপোল থেকে পণ্য নামিয়ে খালি ট্রাক ওই এলাকা দিয়েই ফিরে আসে। সব মিলিয়ে একটা জটের সৃষ্টি হয়। মাঝে মাঝে যানজট তৈরি হয় ট্রাক টার্মিনাস থেকে বেরিয়ে পর পর ট্রাক বেনাপোলের দিকে যাওয়ার সময়ে। সাধারণ মানুষে বা বন্দর এলাকায় বিভিন্ন সূত্রে আসা মানুষের যাতায়াত করতে সমস্যায় পড়েন। এমনকী, ট্রাকের ধাক্কায় অতীতে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে।
২০১১ সালের ২৭ অগস্ট তৎকালীন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি চিদম্বরম পেট্রাপোলে এসে ওই প্রকল্পের শিলান্যাস করেছিলেন। উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও বাংলাদেশের তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন। শিলান্যাসের পরে চিদম্বরম জানিয়েছিলেন, সতেরো মাস পরে ওই প্রকল্পের উদ্বোধন হবে। ১১ তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় দেশের ১৩টি আন্তর্জার্তিক স্থলবন্দরে সুসংহত চেকপোস্ট তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছিল কেন্দ্র। পেট্রাপোল ছিল তার অন্যতম। শুল্ক দফতর সূত্রে জানানো হয়েছিল, স্বরাষ্ট্র দফতরের অধীন কেন্দ্রের ডিপার্টমেন্ট অব বর্ডার ম্যানেজমেন্ট’ প্রস্তাবিত চেকপোস্টটি তৈরি করবে। প্রকল্প শেষ করার সম্ভাব্য সময়সীমা ধরা হয়, ২০১৩ সালের জানুয়ারি মাস। প্রকল্পের খরচ প্রাথমিক ভাবে ধরা হয়েছিল, ১৭২ কোটি টাকা।
সূত্রের খবর, পেট্রাপোলে যেহেতু নির্দিষ্ট সময়সীমা মেনে কাজ শেষ করা যায়নি, তাই প্রকল্পের খরচও বেড়ে গিয়েছে। ৪২ হেক্টর জমির উপরে চেকপোস্টটি তৈরি হয়েছে। সে জন্য কৃষকদের কাজ থেকে ক্ষতিপূরণ দিয়ে সরকারকে জমি কিনতে হয়েছে। এলাকার উন্নয়নে স্বার্থে এলাকার মানুষ জমি দানও করেছিলেন। প্রকল্পের জন্য কিছু জলাভূমিও ভরাট করতে হয়েছিল। কিন্তু সময় এতটা বেশি লাগল, তার সদুত্তর নেই কোনও পক্ষের কাছে।
তবে দু’দেশের মধ্যে বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ীরা সে সব নিয়ে এখন ভাবতে নারাজ। তাঁরা ছাইছেন আর সময় নষ্ট না করে দ্রুত উদ্বোধন করে চালু করে দেওয়া হোক সুসংহত চেকপোস্টটি। পেট্রাপোল ক্লিয়ারিং এজেন্ট স্টাফ ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক কার্তিক চক্রবর্তী বলেন, ‘‘আমরা চাই দ্রুত নতুন চেকপোস্টটি চালু হোক। এর ফলে বন্দর এলাকায় থাকা ট্রাক টার্মিনাস যে মালপত্র চুরি হয়ে যাচ্ছে, তা ঠেকানো যাবে। দু’দেশের মধ্যে বাণিজ্যে আরও গতি আসবে।’’ বাংলাদেশের ব্যবসায়ী মতিয়ার রহমানও চাইছেন, চেকপোস্ট দ্রুত চালু হোক। তাঁর মতে পরিকাঠামো না বাড়ালে বাণিজ্যে গতি আসবে না। আর সেটা সম্ভব, সুসংহত চেকপোস্ট চালু হলেই। বন্দর সূত্রের খবর, বর্তমানে প্রতিদিন এ দেশ থেকে প্রায় চারশোটি পণ্যবাহী ট্রাক বেনাপোলে যায়। আর বেনাপোল থেকে ১২০টির মতো বাংলাদেশি ট্রাক পেট্রাপোলে আসে। সুসংহত চেকপোস্ট চালু হলে পণ্যবাহী ট্রাকের যাতায়াতও দু’দেশের মধ্যে বাড়বে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। ফলে দু’দেশের রাজস্ব আয়ও বেড়ে যাবে।
বর্তমানে পেট্রাপোল বন্দরের যে পরিকাঠামো রয়েছে, সেখানে বহু সমস্যা। পেট্রাপোল সেন্ট্রাল ওয়্যার হাউস কর্পোরেশনের যে গুদাম রয়েছে, সেখান থেকে রাতের অন্ধকারে পণ্যবাহী ট্রাক থেকে মালপত্র চুরি হয়ে যায়। নিরাপত্তা ব্যবস্থা উপযুক্ত নয়। বাংলাদেশ থেকেও দুষ্কৃতীরা রাতের অন্ধকারে এসে মালপত্র চুরি করে নিয়ে গিয়েছে, এমন ঘটনাও ঘটেছে কয়েকবার। ট্রাক পরীক্ষার উপযুক্ত ব্যবস্থা নেই। কারণ পণ্য-বোঝাই ট্রাকে একশো শতাংশ তল্লাশি চালাতে গেলে যে পরিকাঠামো প্রয়োজন, তার অভাব আছে। পণ্যভর্তি ট্রাকের মধ্যে পাচারের নানা উপকরণ চলে গেলেও তা বোঝার উপায় নেই। অতীতে এমন ঘটনা ঘটেওছে।
প্রস্তাবিত সুসংহত চেকপোস্ট এলাকায় গিয়ে দেখা গেল, মূল প্রশাসনিক ভবন-সহ বিশ্রামাগার, ঝাঁ চকচকে চওড়া রাস্তা, আলো, ট্রাক রাখার গুদাম ঘর, পণ্য পরীক্ষার জন্য সিকিউরিটি চেক পোস্ট, পার্কিং, কোয়ারেন্টাইন ভবন (পশু খাদ্য ও প্রাণী খাদ্যের গুণগত মান পরীক্ষা করার জায়গা)-সহ বেশির ভাগ কাজই শেষ হয়ে গিয়েছে। সৌন্দর্য্য বাড়ানোর জন্য ঘাস লাগানো হয়েছে। ফুল গাছ পোঁতা হচ্ছে। শুল্ক দফতরের এক কর্তা জানালেন, এখানে এক সঙ্গে দু’হাজার ট্রাক দাঁড়াতে পারবে। এখন শুধু পণ্য আমদানি-রফতানির কাজই হবে। ভবিষ্যতে এখান দিয়ে যাত্রী যাতায়াতের কথা আছে।
বাংলাদেশের দিকের লিঙ্ক রোডও তৈরি হয়েছে। নতুন চেকপোস্টে নিরাপত্তা বাড়ছে। বন্ধেরও প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা নেই। ট্রাকে তল্লাশির কাজও এখানে অনেক সহজ হবে। কমবে ট্রাকে করে পাচারের কারবার।
আপাতত শুধু অপেক্ষা উদ্বোধনের।