এসআইআরের শুনানির নোটিস এসেছিল প্রাক্তন রেলকর্মীর। পশ্চিম বর্ধমানের সালানপুরের অরবিন্দনগরে তখন থেকেই চিন্তায় ছিলেন নারায়ণচন্দ্র সেনগুপ্ত (৭২) নামে চিত্তরঞ্জন রেল ইঞ্জিন কারখানার প্রাক্তন ওই কর্মী, দাবি পরিবারের। সে আতঙ্কে রবিবার দুপুরে বাড়িতে গলায় চাদরের ফাঁস দিয়ে তিনি আত্মঘাতী হন বলে অভিযোগ তাদের। দক্ষিণ ২৪ পরগনার রায়দিঘির কাশীনগরে কাজের চাপে এক বিএলও গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এসআইআরে শুনানির নামে হয়রানির অভিযোগে রবিবারও নানা জেলায় চলল বিক্ষোভ-অবরোধ।
সালানপুরে মৃত বৃদ্ধের পরিবারের দাবি, ২০০২-এর ভোটার তালিকায় তাঁর নাম ছিল না। তাই নোটিস পেয়ে চিন্তায় ছিলেন। এ দিন বাজার থেকে বাড়ি ফিরে তিনি আত্মঘাতী হন বলে দাবি পরিজনের। রবিবার সন্ধ্যায় বীরভূমের রামপুরহাটে জনি শেখ (৩৭) নামে এক যুবকের ঝুলন্ত দেহ মেলে। পরিবারের দাবি, এসআইআর-আতঙ্কে তিনি আত্মঘাতী হয়েছেন। দক্ষিণ ২৪ পরগনার রায়দিঘির চাঁদপাশায় বিএলও মাহবুব রহমান মোল্লা শুক্রবার অসুস্থ হয়ে পড়ায় কলকাতার এক বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। পরিবারের অভিযোগ, এসআইআরের কাজের অতিরিক্ত চাপেই তিনি অসুস্থ হন। শুক্রবার মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে অবস্থার অবনতি হয়।
শুনানির এক দিন আগে ফর্ম বিলির অভিযোগে উত্তর দিনাজপুরের কালিয়াগঞ্জের সিংতোরে বিএলও-কে প্রায় ছ’ঘণ্টা ঘেরাও করে রাখেন বাসিন্দারা। মালদহের মানিকচকের নুরপুরে একটি বুথে অনেককে শুনানিতে ডাকায়, বিএলওকে ঘিরে বিক্ষোভ হয়। অতিরিক্ত কাজের চাপের অভিযোগে কোচবিহারের সিতাইয়ে ব্লক অফিসে গণ-ইস্তফা কর্মসূচি নেন ৪০ জন বিএলও। কাজ থেকে অব্যাহতি চেয়ে ২৭ জন বিএলও চিঠি দেন তুফানগঞ্জ ১ ব্লকেও। এসআইআরের নামে হয়রানির অভিযোগে মালদহের সামসিতে মিছিল ও বিক্ষোভ করে ওয়েলফেয়ার পার্টি।
ভোটার এবং বিএলও-দের হয়রানির অভিযোগে এ দিন বীরভূমের দুবরাজপুরের ব্লক অফিসে স্মারকলিপি দেয় তৃণমূল। উত্তর ২৪ পরগনার বসিরহাটের নানা জায়গায় বিক্ষোভ দেখান বাসিন্দাদের একাংশ। যোগ দেয় আইএসএফ এবং তৃণমূল। ভাঙড় ১ ব্লক থেকে ঘটকপুকুর পর্যন্ত মিছিল করে তৃণমূল। ঘটকপুকুর চৌমাথায় বাসন্তী হাইওয়ে অবরোধ করা হয়। অবরোধ হয় দক্ষিণ ২৪ পরগনার মগরাহাট, উত্তর ২৪ পরগনার অশোকনগরের আমড়াগাছি, পূর্ব বর্ধমানের মঙ্গলকোটেও। পূর্ব মেদিনীপুরের কাঁথি ১ ব্লকের গিমাগেড়িয়ায় অনেককে শুনানিতে ডাকায় বিক্ষোভ হয়।
তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এ দিন নদিয়ায় দাবি করেন, ‘‘আরও ১২টি রাজ্যে এসআইআর হচ্ছে। উত্তর প্রদেশে চার কোটি, গুজরাটে এক কোটি মানুষের নাম বাদ গিয়েছে। সব থেকে কম বাদ আমাদের বাংলায়। নির্বাচন কমিশন ও ভ্যানিশ কুমারকে কাজে লাগিয়ে জোর-জবরদস্তি নাম বাদ দেওয়ার ষড়যন্ত্র করছে বিজেপি।’’ নির্বাচন কমিশন তৃণমূলের কোনও প্রশ্নের সদুত্তর দিতে পারেনি দাবি করে অভিষেক বলেন, ‘‘যে ভাবে আপনাদের নোটিস পাঠিয়ে হয়রান করেছে, কষ্ট দিয়েছে, একই ভাবে বিজেপিকে কষ্ট দিতে হবে।’’ রাজ্য বিজেপির প্রধান মুখপাত্র দেবজিৎ সরকার বলেন, ‘‘উনি কি গণৎকার? এসআইআর এখন মাঝপথে। এখন কোথায় বেশি, কোথায় কম, বলে দিচ্ছেন কী করে? এর আগে বিরোধী দলনেতা যখন বলেছিলেন, এত নাম বাদ যাবে। তখন কত কটাক্ষ হয়েছিল!’’ তাঁর সংযোজন, ‘‘আমরা বলছি, কোথায় বেশি, কোথায় কম সেটা বিচার্য নয়। আমরা চাই, ত্রুটিমুক্ত, স্বচ্ছ ভোটার তালিকা। জনতা ঠিক করবে, কাকে ভোট দেবে, কাকে দেবে না।’’
হাওড়ার বাউড়িয়ায় কংগ্রেস নেতা অধীর চৌধুরী বলেন, ‘‘এসআইআরের মাধ্যমে দেশের মানুষের অধিকার কেড়ে নেওয়ার ঘৃণ্য চক্রান্ত হচ্ছে।’’ বর্ধমানে তৃণমূল নেতা দেবু টুডুর হুঁশিয়ারি, ‘‘কোনও ভোটারের নাম বাদ গেলে বিজেপি নেতাদের পিটিয়ে ছাল-চামড়া তুলে দেব।’’ বিজেপির বর্ধমান সাংগঠনিক জেলা সভাপতি অভিজিৎ তায়ের প্রতিক্রিয়া, “তৃণমূল ভয় পেয়েছে। তাই এ সব বলছে।”
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)