বৃহত্তর কলকাতার মধ্যেই বিধ্বংসী আগুন। সরকারি হিসেবে, এখনও পর্যন্ত উদ্ধার হয়েছে ২৭টি দেহাংশ। বিরোধীদের দাবি, সব মিলিয়ে ‘নিখোঁজে’র সংখ্যা পঞ্চাশের কাছাকাছি। কিন্তু বিধানসভা ভোটের মুখে এমন ভয়াবহ বিপর্যয় ও মৃত্যুর ঘটনা ঘিরে আন্দোলন দানা বাঁধল না! নিজেদের ঘাটতি মেনে নিয়েও বিরোধীরা সরকারের গাফিলতি ও ‘অনৈতিকতা’র দিকে আঙুল তুলছে। আর মুখ্যমন্ত্রীর প্রশ্ন, বেসরকারি সংস্থায় যথাযথ সুরক্ষা বিধি না-মানার দায় তাঁদের উপরে কেন চাপানো হবে?
নাজিরাবাদের দু’টি গুদামে আগুন লাগার পরে দুই সপ্তাহ কেটে গিয়েছে। বিরোধী দলের নেতারা দফায় দফায় ঘটনাস্থলে গেলেও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির লোকজনকে সঙ্গে নিয়ে জোরালো প্রতিবাদ-আন্দোলন গড়ে তুলতে তাঁরা পারেননি। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্যে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় ‘বেনিয়ম ও হয়রানি’র প্রতিবাদে সুপ্রিম কোর্টে চলে গিয়েছেন কিন্তু এত জন শ্রমিকের পুড়ে মৃত্যুর জায়গায় যাননি— এই প্রশ্ন তুলে সরব হয়েছেন বিরোধী নেতারা। কিন্তু জনমানসে তেমন তীব্র প্রতিক্রিয়া চোখে পড়েনি। বাম আমলে কলকাতায় ২০১০ সালে পুরভোটের বছরে স্টিফেন কোর্টের অগ্নিকাণ্ড (মৃত্যু হয়েছিল ৪৩ জনের) ঘিরে যে উত্তপ্ত পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, সেই অতীত স্মরণ করিয়ে রাজনৈতিক শিবিরের একাংশের প্রশ্ন, নাজিরাবাদের এত বড় ঘটনার পরে সরকারকে কোণঠাসা করতে এখনকার বিরোধীরা কি ব্যর্থ? নাকি সামগ্রিক ভাবেই জনতার প্রতিক্রিয়া ভোঁতা হয়ে এসেছে?
আনন্দপুরের নাজিরাবাদে এ বারের আগুনের পরে যে শ্রমিকদের খোঁজ নেই বা মৃত্যু হয়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, তাঁদের অধিকাংশেরই বাড়ি বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর জেলা পূর্ব মেদিনীপুরে। তিনি এবং তাঁর দলের নেতা-কর্মীরা সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলির সঙ্গে বারবার যোগাযোগ করেছেন। সিপিএমের পূর্ব মেদিনীপুর জেলা নেতৃত্ব বাড়ি বাড়ি গিয়ে দেখা করেছেন। দু’পক্ষই চেষ্টা করেছে পরিবারগুলিকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিবাদ জোরালো করতে। বিরোধী নেতাদের মতে, সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলি প্রথমে তাঁদের প্রিয়জনের শেষ পর্যন্ত কী হয়েছে, সে ব্যাপারে নিশ্চিত হতে চায়। তার উপরে আর্থিক ক্ষতিপূরণ ও চাকরির আশ্বাসে তাঁরা প্রতিবাদে পা মেলাতে খুব আগ্রহী হচ্ছেন না। শুধু নাজিরাবাদ নয়, চম্পাহাটির বাজি কারখানায় বিস্ফোরণ বা আরও একাধিক ঘটনায় একই জিনিস দেখা গিয়েছে। বিরোধী নেতৃত্ব মেনে নিচ্ছেন, ক্ষতিপূরণ ও চাকরির প্রশ্নে তাঁদের আপত্তি তোলা বা বাধা দেওয়ার অবকাশ নেই।
প্রকাশ্যে বিরোধীরা অবশ্যই সরকারের বিরুদ্ধে সরব। তবে তাদের তোপ উড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বলেছেন, ‘‘খাস দিল্লির রাস্তায় গাড়িতে বিস্ফোরণ হয়েছিল, গোয়ার নাইট ক্লাবেও বড় আগুন লেগেছিল। সব কি আমাদের দোষ? কোনও মৃত্যু সমর্থনযোগ্য নয়। কিন্তু বেসরকারি জায়গায় তারা সুরক্ষা ব্যবস্থা না-মানলে সব সময়ে আমাদের কিছু করার থাকে না। এর আগে আগুন লাগার পরে ছাদে (রুফটপ রেস্তোরাঁ) একসঙ্গে বেশি সিলিন্ডার রাখতে দেখে বারণ করেছিলাম। আমরা কারও ব্যবসা বন্ধ করতে চাই না। কিন্তু নিজেদের নিরাপত্তার জন্য সতর্ক তো হতে হবে!’’ তাঁর আরও বক্তব্য, ‘‘এখানে (নাজিরাবাদ) ছুটির দিনে আগুন লেগেছিল। ববি (ফিরহাদ) হাকিম, অরূপ বিশ্বাস, ফিরদৌসী বেগমেরা গিয়েছিল। স্থানীয় মুসলিম ছেলেরা রাতভর উদ্ধারের কাজে সাহায্য করেছিল। আমরা করেছি, যা করার।’’
বিরোধী দলনেতা শুভেন্দুর পাল্টা দাবি, ‘‘সারা রাত যেখানে মোমো তৈরি হয়, সেখানে আগুনটা লেগেছিল। মোমো সংস্থার কর্মচারী আর ডেকরেটার্স মালিককে ধরে আনা হয়েছে। মোমো সংস্থার মালিককে উনি বাঁচানোর চেষ্টা করছেন কেন?’’ বিধানসভার চলতি অধিবেশনে আগুন নিয়ে প্রশ্ন তোলা বা দৃষ্টি আকর্ষণের সুযোগ রাখেনি সরকার পক্ষ। বিরোধী নেতার ইঙ্গিত, প্রয়োজনে অন্য পথে গিয়ে লড়াই হবে। ময়নার বিজেপি বিধায়ক অশোক দিন্দার দাবি, তাঁরা অসহায় পরিবারগুলির কাছে বারবার পৌঁছনোর চেষ্টা করেছেন। পুলিশ-প্রশাসন দিয়ে তাঁদের বাধা দেওয়া হয়েছে। আর দলের তরফে পূর্ব মেদিনীপুর জেলার ভারপ্রাপ্ত সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তীর বক্তব্য, ‘‘আমাদের চেষ্টায় ঘাটতি থাকতে পারে। কিন্তু এটাও ঠিক যে, এমন সব মর্মান্তিক ঘটনাতেও সকলকে সে ভাবে আলোড়িত হতে দেখা যাচ্ছে না। আর মেঘালয়ে খনি দুর্ঘটনায় মৃত্যু নিয়ে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়েরা সরব কিন্তু ঘরের কাছে নাজিরাবাদে নীরব! জমির মালিকানায় যোগ কাদের আছে, তদন্ত হবে না?’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)