সবেধন নীলমণি এক শিক্ষিকা নিয়ে কোনও মতে চলছিল শিশুশিক্ষাকেন্দ্র। সেই শিক্ষিকাও অবসর নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তালা পড়ল শিশুশিক্ষাকেন্দ্রে। অনিশ্চয়তার অন্ধকারে অন্তত ৪০টি শিশুর ভবিষ্যৎ। কোনও উপায় না-পেয়ে শিক্ষক নিয়োগের দাবিতে প্ল্যাকার্ড হাতে বন্ধ হওয়া শিশুশিক্ষাকেন্দ্রে আছড়ে পড়ল পড়ুয়া এবং অভিভাবকদের বিক্ষোভ। শুরু হল রাজনৈতিক দোষারোপ।
গ্রামে প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই। তাই শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার জন্য ২০০২ সালে বাঁকুড়ার পাত্রসায়র ব্লকের গঞ্জেরডাঙা গ্রামে একটি শিশুশিক্ষাকেন্দ্র তৈরি হয়। ধীরে ধীরে সেই শিশুশিক্ষাকেন্দ্রে পড়ুয়ার সংখ্যা যেমন বৃদ্ধি পায়, তেমনই কলেবরে বাড়ে পরিকাঠামো। ক্লাসরুমের অবস্থা বেহাল হয়েছিল। ২০২১-’২২ অর্থবর্ষে সে জন্য নতুন ভবন তৈরি হয়। কিন্তু একের পর এক শিক্ষক-শিক্ষিকা অবসর নেওয়ার পরেও শিক্ষক নিয়োগ হয়নি। একমাত্র শিক্ষিকা তপতী মণ্ডল মেদ্দা অবসর নিয়েছেন গত ৩১ জানুয়ারি। তার পরেই বন্ধ হয়ে গিয়েছে এই শিশুশিক্ষাকেন্দ্র।
স্থানীয়দের দাবি, গ্রাম থেকে প্রায় ২ কিলোমিটার দূরে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়। তা ছা়ড়া শিশুদের পড়াশোনার কোনও বিকল্প ব্যবস্থা নেই। ওই শিশুশিক্ষা কেন্দ্রে শিক্ষক নিয়োগের দাবি তুলে সরব হয়েছেন তাঁরা। গ্রামবাসীরা এ-ও জানান, আগে থেকে শিক্ষক নিয়োগের দাবি নিয়ে শিক্ষা দফতর থেকে ব্লক প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়েছেন। কিন্তু কাজ হয়নি। অগত্যা সকাল থেকে প্ল্যাকার্ড নিয়ে বন্ধ হওয়া শিশুশিক্ষা কেন্দ্রে হাজির হন তাঁরা। শুরু করেন বিক্ষোভ।
বন্ধ হয়ে যাওয়া শিশুশিক্ষা কেন্দ্রের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী দোয়েল বাউড়ি বলে, ‘‘আমাদের বাড়ি থেকে নারাঙ্গি প্রাথমিক বিদ্যালয় অনেক দূর। রাস্তায় সবসময় ট্রাক, বাস ছোটে। ওখানে একা যেতেই ভয় করবে।’’ চতুর্থ শ্রেণির আর এক পড়ুয়া সাহেব বাউড়ি বলে, ‘‘দিদিমণি অবসর নেওয়ার পর থেকে আমাদের স্কুল বন্ধ। আমরা গ্রামের স্কুলেই পড়তে চাই।’’ অভিভাবক শিল্পা বাউড়ির বক্তব্য তা-ই। তিনি জানান, গ্রামের অধিকাংশ মানুষ পেশায় দিনমজুর। দূরের স্কুলে ছেলেমেয়েকে পড়ানোর মতো সঙ্গতি তাঁদের নেই। গ্রামের একটাই স্কুল। সেখানে শিক্ষক নিয়োগ না-হলে ‘বৃহত্তর আন্দোলন’ করবেন তাঁরা।
আরও পড়ুন:
শিক্ষকের অভাবে শিশুশিক্ষাকেন্দ্রে তালা পড়ার কথা শুনে সোনামুখীর বিজেপি বিধায়ক দিবাকর ঘরামি দুষেছেন রাজ্যকে। তিনি বলেন, ‘‘রাজ্য সরকার ভাতার রাজনীতি করছে। চাকরির দাবিতে শিক্ষিত বেকারেরা রাস্তায় বসে রয়েছেন। শিক্ষকের অভাবে একের পর এক স্কুল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।’’ তাঁর সংযোজন, ‘‘আসলে প্রতিবাদের ভয়ে রাজ্য সরকার মানুষকে শিক্ষার আলো থেকে দূরে রাখতে চায়। এ ঘটনা তারই নমুনা।’’ তৃণমূল পরিচালিত পাত্রসায়ের পঞ্চায়েত সমিতির শিক্ষা কর্মাধ্যক্ষ বিপ্লব রায় বলেন, ‘‘শিশুশিক্ষাকেন্দ্রের সমস্ত পড়ুয়াকে পার্শ্ববর্তী একটি প্রাথমিক স্কুলে ভর্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাশাপাশি ওই শিশুশিক্ষাকেন্দ্রে দ্রুত শিক্ষক নিয়োগের চেষ্টা চলছে।’’ স্থানীয় বিধায়কের অভিযোগ প্রসঙ্গে তাঁর খোঁচা, ‘‘শিক্ষা যৌথ তালিকাভুক্ত। শিক্ষা মিশনে এ রাজ্যের জন্য বরাদ্দ কমিয়ে দিয়েছে কেন্দ্র। প্রাপ্য টাকাও দিচ্ছে না। শিশুশিক্ষাকেন্দ্রগুলির হাল কেন এমন, সেই খবর উনি রাখেন? দায় কেন্দ্রেরই।’’