জনশ্রুতি ১: বৈষ্ণব বলয়ে ফিরে চললেন ধ্রুব গোস্বামী। সঙ্গে কিছু পুঁথি। আর বারোটি গোপাল। একে একে সব ঘাটের নৌকোতে চাপলেও বাধ সাধলো এক গোপাল। তাকে মাটি থেকে তোলা গেল না আর। মাটি আঁকড়ে পরে থাকা দারুমূর্তিই পরে বিখ্যাত হবেন ভান্ডিরবনের গোপাল হয়ে।
জনশ্রুতি ২: রাজনগরের রাজার অনাচারে দেখা দিল মহা প্লাবন। কুলদেবী কালীর পাথরের প্রতিমা ভেসে গেল কুশকর্ণিকার জলের টানে। সেই মূর্তি এক জেলের জালে আটকে গেলেন ভান্ডিরবন সংলগ্ন খটঙ্গা গ্রামে। তিনিই বীরসিংহপুরের কালীরূপে পূজিতা হলেন। এখনও লোকে বলে মগধরাজ জরাসন্ধ এই কালীর উপাসক।
জনশ্রুতি ৩: গহন বনে আরাধ্যদেবতা শিবের সাধনায় বিভোর ছিলেন বিভান্ডক নামে এক মুনি। তাঁর নামেই দেবতার নাম বিভান্ডেশ্বর। সেখানেই থেকেই লোক মুখে মুখে ভান্ডিরবন। সম্প্রতি এই এলাকাটিকে ঘিরেই পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলার ভাবনা চিন্তা শুরু হয়েছে। এলাকার রাস্তা তৈরি, বড় দিঘিতে বোটিং, বিনোদন পার্ক, মন্দির সংরক্ষণের কথা ভাবা হচ্ছে। সিউড়ি ১-এর বিডিও মহম্মদ বদরুদ্দোজা বলেন, ‘‘ধাপে ধাপে এলাকার সব দর্শনীয় জায়গাকে পর্যটনের গুরুত্ব দেওয়ার প্রশাসনিক তৎপরতা চলছে।”
গোটা জেলাজুড়েই ছড়িয়ে পর্যটনের আহ্বান। ভান্ডিরবনে শৈব, শাক্ত, বৈষ্ণব— তিন ধারার তিন মন্দিরের জনশ্রুতি এরকমই।
বীরভূমের ইতিহাস বলে, রাজনগরের রাজা আসাদউলজামানের বাকি পড়া খাজনা আদায়ে এসেছিলেন মুর্শিদাবাদের নবাব আলিবর্দির দেওয়ান রামনাথ ভাদুড়ি। রাজা খুশি হয়ে দেওয়ানকে দিলেন ভান্ডিরবন এলাকার চার মৌজা। তিনি সমস্ত সম্পত্তি দেবতার নামে উৎসর্গ করে তিনটি মন্দির নির্মাণ ও রক্ষনাবেক্ষণের পাকাপকি ব্যবস্থা করলেন। রাজনগরের সঙ্গে একটা নিবিড় যোগের কথা স্বীকার করেন ইতিহাস সংগ্রাহক সুকুমার সিংহ। ইতিহাস আর জনশ্রুতি ছাড়া, সিউড়ি থেকে মাত্র আট কিলোমিটার দূরে ময়ূরাক্ষীর পাড়ের এলাকাটির পরিবেশও সুন্দর। এছাড়াও ছড়িয়ে রয়েছে বেশ কিছু ছোট মন্দিরও। পর্যটকরা ঘুরে দেখতে পারবেন সেগুলিও।
ভান্ডিরবন প্রচারের আলো থেকে দূরে রয়ে গেছে বলে আক্ষেপ এলাকাবাসীর। স্থানীয় বাসিন্দা মনি মুখ্যোপাধ্যায় বলেন, “এলাকার ইতিহাস সংক্রান্ত নথি বিডিও অফিসে জমা পড়েছে।’’ গোপাল মন্দিরের মাঠে রাস, গোষ্ঠরথের মেলা বসে। পৌষে বনভোজন আর বসন্তে দোল উৎসব উপভোগ করতে বহু মানুষ ছুটে আসেন। স্থানীয়দের দাবি, ‘‘মানুষ এখানে এসে আক্ষেপ করেন, ময়ূরাক্ষীর জল-বালির লুকোচুরি দেখে মন ভরাতে এক দু’দিন থাকার কোনও ব্যবস্থা নেই এখানে।’’
খটঙ্গা পঞ্চায়েতের প্রধান পরিতোষ বাগদি বলেন, ‘‘জেলা পরিষদের টাকায় কিছু রাস্তা পাকা হবে। আগামী আর্থিক বছরে এলাকার দীঘি গোপালসায়রকে কেন্দ্র করে সৌন্দার্যায়ন, বোটিং আর বিনোদন পার্কের ব্যবস্থার কথা ভাবা হচ্ছে। এলাকায় কমিউনিটি হলের পরিকল্পনা রূপায়নের পথে।” জেলার সভাধিপতি বিকাশ রায়চৌধুরী বলেন, “এলাকা ঘুরে দেখে সেই মতো ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”