Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

১৯ অক্টোবর ২০২১ ই-পেপার

আসলে ভোট লুটেরই ইঙ্গিত, অভিযোগ বিরোধীদের

দলীয় কর্মীদের ‘ভোট চুরি’র নিদান দিলেন অনুব্রত!

নিজস্ব সংবাদদাতা
সিউড়ি ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ ০০:৪৬
দিকনির্দেশ: দলের কর্মিসভায় অনুব্রত মণ্ডল। বুধবার পুরন্দরপুরে। নিজস্ব চিত্র

দিকনির্দেশ: দলের কর্মিসভায় অনুব্রত মণ্ডল। বুধবার পুরন্দরপুরে। নিজস্ব চিত্র

আসন্ন লোকসভা নির্বাচনে কী কায়দায় ভোট করাতে হবে, দলের কর্মীদের এ বার সেই ‘গাইড-লাইন’ দিলেন তৃণমূলের জেলা সভাপতি অনুব্রত মণ্ডল। বুধবার সিউড়ি ২ ব্লকের পুরন্দরপুরে কর্মিসভায় দলের কর্মীদের উদ্দেশে কখনও তাঁর পরামর্শ, মানুষের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রাখার। কখনও নির্দেশ দিলেন, বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের মনোভাব যাচাই করতে এবং বিরূপ মনোভাব দেখলে ভোটারদের ‘বোঝাতে’। প্রয়োজনে ভোট ‘চুরি’ করতেও বললেন জেলা সভাপতি।

ঘোষণা মাফিক বুধবার থেকেই শুরু হল তৃণমূলের বুথ ভিত্তিক কর্মী সম্মেলন। এ দিন পুরন্দপুরে কর্মীদের ‘টার্গেট’ বেঁধে দিয়েছেন অনুব্রত। সিউড়ি ২ ব্লকের ৬টি গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় নতুন ভোটার তালিকা অনুযায়ী ৬৮ হাজার ৮৪ জন ভোটার। গত বিধানসভা নির্বাচনে এখানে থেকে শাসকদলের ‘লিড’ ছিল ১৫ হাজার। সেই ‘লিড’ই এ বার এক লাফে দ্বিগুণ করে ৩০ হাজার করতে হবে দলের অঞ্চল ও বুথ সভাপতিদের লক্ষ্য বেঁধে দেন দলের জেলা সভাপতি। এমনকি উপস্থিত কর্মীদের কাছে থেকে সে প্রতিশ্রতি আদায়ও করে নেন। কী করে ভোট করাতে হবে, তা-ও বলে দিয়েছেন। ‘‘বুথ সভাপতিরা জানেন কী ভাবে বোতাম টিপতে হয়। অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।”— এ দিন হেঁয়ালির ঢঙে সে কথাও বলেছেন অনুব্রত।

অতীতে গুড়-জল, গুড়-বাতাসা সহ নানা কায়দায় ভোট করানোর নিদান শোনা গিয়েছে অনুব্রতের মুখে। প্রতিটি ভোটেই শাসকদলের বিরুদ্ধে এক তরফা ভোট করানোর অভিযোগ তুলেছে বিরোধীরা। গত বছর পঞ্চায়েত ভোটের আগে অনুব্রতের মুখ থেকে শোনা গিয়েছিল, ‘রাস্তায় উন্নয়ন দাঁড়িয়ে’। সেই ‘উন্নয়নের’ গুঁতোয় বিরোধীরা পঞ্চায়েত তিন স্তরে কার্যত মনোনয়নই দিতে পারেননি বলে অভিযোগ উঠেছিল। এ বার ‘ভোট চুরি’র প্রতিক্রিয়ায় সিপিএমের জেলা সম্পাদক মনসা হাঁসদা বলেন, ‘‘এটা নতুন কী! লুট আর চুরি দুই-ই তৃণমূলের কাছে সমার্থক। যে দিন থেকে রাজ্যে ক্ষমতায় এসেছে, সে দিন থেকেই ওরা এ কাজ করেছে। কিন্তু, বর্তমানে যে ভাবে নিরাপত্তা নেওয়ার হিড়িক পড়েছে ওদের বিধায়ক থেকে বুথ সভাপতি পর্যন্ত, তাতেই স্পষ্ট, ভোট লুট করেও লাভ হবে না। ওদের পাঁচন ওদের বিরুদ্ধেই ব্যবহৃত হবে!’’ বিজেপি-র জেলা সভাপতি রামকৃষ্ণ রায়ের মন্তব্য, ‘‘চুরি হয়তো মুখে বলেছেন, আসলে করবে ওরা ডাকাতি! আমরাও দেখছি, ভোট চুরি বা লুট—যাই করার চেষ্টা করুক না কেন, তা কী ভাবে ঠেকানো যায়।’’

Advertisement

আরও পড়ুন: ছড়াচ্ছে গুজব, ছেলেধরা সন্দেহে মার, মুখে অ্যাসিড যুবকের

বিরোধীরা যাই বলুন, অনুব্রতের পাখির চোখ এখন লোকসভা নির্বাচন। বোলপুর এবং বীরভূম—জেলার দুই আসন থেকেই বিপুল লিড নিয়ে জিতে আসার কথা এর আগে একাধিকবার প্রকাশ্য সভায় শোনা গিয়েছে তাঁর মুখে। সেই ব্যবধান কী ভাবে বাড়বে, এ দিন কর্মীদের কার্যত পাখি পড়ার মতো করে বুঝিয়েছেন জেলা তৃণমূলের সভাপতি।

এ দিনের কর্মিসভায় তিনি বলেছেন, ‘‘আমি অনুরোধ করেছি। আর এক মাস পরে ভোট। কমিটি গড়ে সন্ধ্যা বেলায় পাড়ায়-পাড়ায়, বাড়িতে, বাড়িতে যান। কোন লোকটা আপনাকে আপ্যায়ন করছে, বাড়িতে আসতে বলছে, বসতে বলছে, চা খেয়ে যাও বলছে, কে বিরক্ত হচ্ছে, সব নোট করুন। তা হলে লিডের পরিমাণ আঁচ করা যাবে।’’ লোকসভা ভোটে কেন্দ্রীয় বাহিনী থাকবে। সেই প্রসঙ্গেই অনুব্রতের মন্তব্য, ‘‘মিলিটারি দেখে ভয় নেই। জল দেবেন, মিষ্টি দেবেন। যা যা লাগবে তাই দেবেন।’’

সভা চলাকালীন ৬টি অঞ্চলের সভাপতিকে এবং একাধিক বুথ সভাপতিকে দাঁড় করিয়ে এলাকায় সংগঠনের অবস্থা ঠিক কী, তাঁর একটা আঁচ নেওয়ারও চেষ্টা করেন অনুব্রত। সঙ্গী ছিলেন জেলা পরিষদের সভাধিপতি বিকাশ রায় চৌধুরী, দলের জেলা সহ সভাপতি অভিজিৎ সিংহ।

এক অঞ্চল সভাপতিকে ডেকে অনুব্রত জিজ্ঞাসা করেন, আগের বার লিড কত ছিল? উত্তর আসে, ‘স্যর ২২৯৩।’ এ বার প্রশ্ন ভোটার কত ? অঞ্চল সভাপতি জানান, ১০ হাজার ৯৫৪। সঙ্গে সঙ্গে অনুব্রত বলে উঠেন, ‘‘এত কাজ করেছি, এত উন্নয়ন করেছি, বাড়ি বাড়ি উন্নয়ন পৌঁছে দিয়েছি, রাস্তায় উন্নয়ন দাঁড়িয়ে আছে! তার পরও এত কম কেন? এ বার কত লিড হবে?’’ ‘স্যার ৩ হাজার’— উত্তর দেন অঞ্চল সভাপতি। অনুব্রত বলেন, ‘‘৩ নয়, ৪ হাজার লিড চাই।’ অঞ্চল সভাপতি চেষ্টা করবেন বলতেই অনুব্রতের মন্তব্য, ‘‘লোকে যেমন চুরি করে, তেমন ভোট চুরি করবেন। মানুষের বাড়ি বাড়ি যান। মানুষকে বোঝান। বলুন আমরা কী করেছি। কী করতে চলেছি। মানুষ আপনাকে ভোট দেবেন।’’

আর এক অঞ্চল সভাপতি গত বারের লিড ১৯০০-র পরিবর্তে ২১০০ বলে ধমক খান জেলা সভাপতির কাছে। সঠিক তথ্য দিতে না পারায় শেখ সমিরুল নামে এক অঞ্চল সভাপতিকে সরিয়ে দেওয়ারও নির্দেশ দেন অনুব্রত। অন্য এক অঞ্চল সভাপতির অনুব্রত বলেন, ‘‘পুরন্দরপুরে দলের কর্যালয়। তার পরও তিনটে বুথে পিছিয়ে কেন।’’ উত্তর আসে, ‘‘একটি রাস্তায় জন্য সমস্যা ছিল। সে রাস্তা হয়েছে। ভোট এ বার বাড়বে।’’

তবে কাঙ্ক্ষিত ফল না হলে যে কারও ছাড় নেই, সেটাও এ দিন স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন দলের জেলা সভাপতি।

আরও পড়ুন

Advertisement