Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

১৬ অক্টোবর ২০২১ ই-পেপার

ভোট দিতে না পারার ক্ষোভ, তপ্ত দুই জেলা

সন্ত্রাসের সংস্কৃতি কেন, প্রশ্ন

নিজস্ব সংবাদদাতা
রঘুনাথপুর ও আদ্রা ১৬ মে ২০১৮ ০১:৪৭
বাঘমুণ্ডির মাঠা হাইস্কুলের কাছে পোড়া ব্যালট। ফাইল চিত্র

বাঘমুণ্ডির মাঠা হাইস্কুলের কাছে পোড়া ব্যালট। ফাইল চিত্র

ব্যালট বক্স তুলে নিয়ে গিয়ে ব্যালট পুড়িয়ে দিল দুষ্কৃতীরা। ভোটকর্মীরা বুথ ছেড়ে লোকের বাড়িতে লুকোলেন। ভোটে এই প্রথম দেখল পুরুলিয়া।

বুথে ঢুকে পিস্তল উঁচিয়ে অবাধে ছাপ্পা ভোট দিচ্ছে দুষ্কৃতীরা। ভোটে এমন নজির ছিল না পুরুলিয়ায়।

বুথের সামনে নির্বিচারে ফাটছে বোমা। পুড়িয়ে দেওয়া হল ভোটকর্মীদের গাড়ি। এও জেলার ভোটে প্রথম।

Advertisement

এত দিন ভোটে না দেখে এমন অনেক ঘটনাই এ বার পঞ্চায়েত ভোটে দেখে ফেললেন পুরুলিয়াবাসী। যা নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে জেলার বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের মধ্যে। ক্ষুব্ধ বিরোধীরা। অভিযোগের তির শাসকদলের দিকে হলেও, এমনটা না হলেই ভাল হতো বলে ঘনিষ্ঠ মহলে মানছেন অনেক তৃণমূল নেতাও।

বস্তুত, এত দিন রাজ্যের অন্যান্য এলাকায় ভোটে অশান্তি হলেও, পুরুলিয়ার মানুষ গর্ব করে বলতেন, ‘‘ও সব আমাদের এখানে হয় না। ভোট এখানে উৎসব।’’ কিন্তু, এ বার ছন্দপতন হয়ে গেল। মনোনয়ন পর্বে বিক্ষিপ্ত দু’-একটি ঘটনা ঘটলেও, এমন বোমা-বারুদের মধ্যে যে ভোট হবে, দুঃস্বপ্নেও তা ভাবেননি অনেকে। কিন্তু, সেটাই হল।

সোমবার দিনভর গামছা ও কাপড়ে মুখ বাঁধা দুষ্কৃতীরা সারসার গাড়িতে ঘোরে নিতুড়িয়া, রঘুনাথপুর ২ ব্লক, বাঘমুণ্ডি, বলরামপুর এলাকায়। সূত্রের খবর, এলাকা পরিস্থিতি আচঁ করতে তারা প্রথমে ঘোরে। পরে দুপুরে ‘অ্যাকশান’ শুরু করে। বিরোধীদের দাবি, বহিরাগত দুষ্কৃতীরা বুথের ভিতরে ঢুকে বন্দুক উঁচিয়ে ভোট কর্মী ও বিরোধীদলের পোলিং এজেন্টদের সন্ত্রস্ত করে ব্যালট কেড়ে নিয়ে দেদার ছাপ্পা মেরে বেরিয়ে গিয়েছিল। বিক্ষিপ্ত ভাবে দু’টি জায়গায় প্রতিরোধের মুখে পড়ে দুষ্কৃতীরা বোমা ও গুলি ছোড়ে।

প্রবীণেরা জানাচ্ছেন, ভোটের দিন ছোটখাটো মারাপিট হয়েছে বটে কিন্তু, এ ভাবে বহিরাগত দুষ্কৃতীদের এনে ভোট লুটের ঘটনা অতীতে হয়নি। অথচ এ বার গুলির আঘাতে এক জন জখমও হলেন।

কিন্তু, কেন এমন হল? প্রশ্ন ঘুরছে জেলায়। বিরোধীরাদের অভিযোগ, সব ক্ষেত্রেই তৃণমূল আশ্রিত বহিরাগত দুষ্কৃতীরাই গোলমাল করেছে। বিজেপি নেতৃত্ব সুনির্দিষ্ট ভাবে অভিযোগ করছেন, নির্বাচনের আগের দিনই ভিন্‌ জেলার বাসিন্দা রাজ্যের এক মন্ত্রী এখানে এসে জেলার কিছু নেতার সঙ্গে ভোটের দিনের ‘গেম প্ল্যান’ ছকেন। শাসকদলের বেশ কিছু নেতাও জঙ্গলমহল-সহ অন্যান্য এলাকার স্থানীয় নেতাদের নিয়ে বৈঠক করেন। সেই বৈঠকেই স্থির হয়েছিল, যে সব এলাকায় বিরোধীরা মাথাচাড়া দিয়েছে, সেখানে বহিরাগত দুষ্কৃতীদের দিয়ে ভোট লুট করাতে হবে। সূত্রের খবর, আসানসোল শিল্পাঞ্চল, বীরভূম ও ঝাড়খণ্ড থেকে দুষ্কৃতীদের নিয়ে আসা হয়েছিল।

জেলা কংগ্রেস নেতা নেপাল মাহাতো দাবি করেন, ‘‘ভোটে অশান্তির আশঙ্কার কথা রবিবারই আমরা জেলাশাসক, পুলিশ সুপার ও পর্যবেক্ষকের কাছে লিখিত ভাবে জানিয়েছিলাম। এও জানাই যে অযোধ্যাপাহাড়ে স্থানীয় এক তৃণমূল নেতার একটি লজে বহিরাগতেরা আশ্রয় নিয়েছে। তারপরেও পুলিশ পদক্ষেপ করেনি।’’ তাঁর দাবি, ওই লজ থেকে বহিরাগতদের নাম-পরিচয় জেনে পুলিশকে সুনির্দিষ্ট ধারায় মামলা করতে হবে। বুথে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও তিনি সরব হয়েছেন।

জেলা পুলিশ সুপার জয় বিশ্বাস বলেন, ‘‘অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু হয়েছে।’’ জেলাশাসক অলকেশপ্রসাদ রায় বলেন, ‘‘বহিরাগত ঢুকেছে বলে জানানো হয়েছিল ঠিকই। তবে সুনির্দিষ্ট ভাবে কিছু জানানো হয়নি।’’

এই জেলায় তৃণমূলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বিরোধীরা প্রার্থী দিয়েছিল। তা ছাড়া কিছু জায়গায় বিরোধীদের আসন সমঝোতাও হয়। এ ছাড়া দলের গোঁজও নিচুতলার ভোটে ‘ফ্যাক্টর’ হয়ে পড়ার ঝুঁকি ছিল। বিরোধীদের দাবি, তাই যেনতেন প্রকারে ভোট কব্জা করতেই এ বার শাসকদল নজিরবিহীন ভাবে সন্ত্রাস চালিয়েছে।

পুরুলিয়ার নিজস্ব রাজনৈতিক সংস্কৃতির সাথে পঞ্চায়েত নির্বাচনের ঘটনা মোটেই খাপ খায় না বলে মানছেন শাসকদলেরই কিছু নেতা। নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক এক জেলা নেতার কথায়, ‘‘অতীতে সিপিএম তথা বামফ্রন্টও নির্বাচনে সন্ত্রাস করেছে। কিন্তু এ ভাবে বহিরাগতদের এনে বন্দুক, বোমার আশ্রয় নিয়ে নির্বাচন জেলায় হয়নি। এই ধরনের ঘটনা পুরুলিয়ার রাজনৈতিক সংস্কৃতির সাথে খাপ খায় না।”

তবে, রাজনৈতিক সম্প্রীতি এ দিনও দেখা গিয়েছে জেলার কিছু এলাকায়। আড়শা, বলরামপুর থেকে অযোধ্যা পাহাড়তলির পিঠাডি বুথের বাইরে তৃণমূল, কংগ্রেস, বিজেপি, ফব কর্মীরা গাছেরতলায় খোশ গল্পে মেতেছিলেন। এক দলের টিফিন খেয়েছে অন্য দল। তৃণমূলের জেলা পরিষদ প্রার্থী কুমকুম সিং সর্দারের ভাই রাজেন সিং সর্দার বলেন, ‘‘ভোটারেরা যাঁকেই ভোট দিন, এক সঙ্গে চলাই আমাদের সংস্কৃতি। তার ব্যতিক্রম হবে কেন?’’

আরও পড়ুন

Advertisement