গোলমালের আশঙ্কায় পুরুলিয়া জেলার একের পর এক পঞ্চায়েতে বোর্ড গঠন পিছিয়ে দিয়েছে প্রশাসন। তার পরেও শেষ দিনে রঘুনাথপুর ১ ব্লকের বাবুগ্রামে পঞ্চায়েত গঠনে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠল তৃণমূল আশ্রিত দুষ্কৃতীদের বিরুদ্ধে। সব মিলিয়ে জেলার প্রায় ৩০ শতাংশ পঞ্চায়েতে বোর্ড গঠন ঝুলে গেল। এই পরিস্থিতিতে ওই সব এলাকায় কী হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সব মহল। আর বিরোধীদের দাবি, শাসকদলের সন্ত্রাসেই ওই সব এলাকার উন্নয়ন থমকে গেল। যদিও তা মানতে নারাজ তৃণমূল নেতৃত্ব।
বস্তুত, এ বার মনোনয়ন পর্ব কিছু ঘটনা ছাড়া একপ্রকার শান্তিতে মিটলেও ভোটের দিন থেকেই ক্রমাগত গোলমাল চলছে রঘুনাথপুর মহকুমা ও জঙ্গলমহল এলাকায়। বোর্ড গঠন পর্বেও তার রেশ রয়ে গেল। সোমবার প্রথম দিনে রঘুনাথপুর ১ ব্লকের খাজুরা পঞ্চায়েতে বোমা-গুলি চলে বলে অভিযোগ। যার জেরে ওই পঞ্চায়েতে বন্ধ হয়ে যায় বোর্ড গঠন। বুধবার পেশি শক্তিকে কাজে লাগিয়ে বোর্ড গঠন আটকে দেওয়ার অভিযোগ উঠল বাবুগ্রামেও। দু’টি ক্ষেত্রেই অভিযুক্ত তৃণমূল আশ্রিত দুষ্কৃতীরা।
সোমবার জেলার কয়েকটি জায়গায় বোর্ড গঠনে গোলমাল হওয়ার পরে জেলা প্রশাসন সিদ্ধান্ত নেয়, নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে বোর্ড গঠন করা যাবে না। তাই উত্তেজনাপ্রবণ পঞ্চায়েতগুলিতে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির কথা বিচার করে বোর্ড গঠন স্থগিত করে দেওয়া হয়। মঙ্গলবার ১৪টি ব্লকের ৩৩টি পঞ্চায়েতে বোর্ড গঠন স্থগিত করা হয়। বুধবার স্থগিত রাখা হয় রঘুনাথপুর মহকুমার পাড়া, বহড়া, দুবড়া, রায়বাঁধ ও শাঁকা পঞ্চায়েতের বোর্ড গঠন। গোলমালে স্থগিত হয়ে গিয়েছে খাজুরা ও বাবুগ্রামের বোর্ড গঠনও। সব মিলিয়ে জেলার ৪০টি পঞ্চায়েতে বোর্ড গঠন করা সম্ভব হল না।
অর্থাৎ জেলার ২৫ শতাংশ পঞ্চায়েতে বোর্ড গঠনের প্রক্রিয়া ঝুলে থাকল। আর বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জেতা পঞ্চায়েতে বিজ্ঞপ্তি জারি করাই সম্ভব হয়নি। সেই সংখ্যা ধরলে জেলার ১৭০টি পঞ্চায়েতের মধ্যে ৫৩টি অর্থাৎ ৩০ শতাংশের কিছু বেশি পঞ্চায়েতে বোর্ড গঠন অনির্দিষ্ট কালের জন্য থমকে গিয়েছে।
আর এই প্রেক্ষিতেই বিরোধীরা প্রশ্ন তুলেছেন, ওই পঞ্চায়েতগুলির ভবিষ্যৎ কী? খাজুরা ও বাবুগ্রামের প্রসঙ্গ তুলে বিজেপির অভিযোগ, দু’টি জায়গাতেই শাসকদল তৃণমূলের বাধাতেই বোর্ড গঠন করা গেল না। বিজেপির জেলা সভাপতি বিদ্যাসাগর চক্রবর্তীর অভিযোগ, ‘‘বোর্ড গঠনে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থার দাবি আমরা প্রশাসনের কাছে জানিয়েছিলাম। কিন্তু প্রশাসন তৃণমূলের চাপে কিছুই করেনি। বরং আমাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য থাকা পঞ্চায়েতগুলিতে আইন শৃঙ্খলা জনিত কারণ দেখিয়ে বোর্ড গঠন পিছিয়ে দিল।’’
ঘটনা হল, স্থগিত হয়ে যাওয়া ৪০টি পঞ্চায়েতের মধ্যে ১৬টিই রঘুনাথপুর মহকুমার রঘুনাথপুর ও পাড়া বিধানসভা এলাকার। ওই দুই বিধানসভা এলাকাতেই শোচনীয় ফল হয়েছে তৃণমূলের। সেই পরিসংখ্যান তুলে বিজেপি নেতৃত্বের অভিযোগ, তৃণমূল পুলিশ ও প্রশাসনকে নামিয়ে বিজেপির জয়ী সদস্যদের ভাঙানোর লাগাতার চেষ্টা চালাচ্ছে। বিজেপির সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য থাকা পঞ্চায়েতগুলিতে বোর্ড গঠন স্থগিত করে আখেরে প্রশাসন তৃণমূলকে বিজেপি ভাঙানোর আরও সুযোগ করে দিল। বিজেপি জেলা সভাপতির আশঙ্কা, ‘‘ফের আমাদের প্রার্থীদের ভয়, প্রলোভন দেখিয়ে নিজেদের দিকে টানার চেষ্টা করবে তৃণমূল। তাই আমরা পঞ্চায়েত সমিতি গঠনের আগেই চল্লিশটি পঞ্চায়েতে বোর্ড গঠনের দাবি প্রশাসনের কাছে জানিয়েছি।”
দীর্ঘ সময় ধরে বোর্ড গঠন স্থগিত থাকলে পঞ্চায়েতের উন্নয়নমূলক কাজকর্ম ব্যাহত হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন কংগ্রেসের জেলা সহ-সভাপতি উত্তম বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন, ‘‘পুরনো বোর্ডের মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছে। স্থগিত করে দেওয়া পঞ্চায়েতেগুলির বোর্ড দ্রুত গঠন না করা গেলে গ্রামাঞ্চলে উন্নয়ন স্তব্ধ হয়ে যাবে।”
জেলাশাসক অলকেশপ্রসাদ রায় বলেন, ‘‘গত ১৬ অগস্ট জয়ী সদস্যদের তালিকা গেজেট নোটিফিকেশন করা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, তার তিন মাসের মধ্যে বোর্ড গঠন করতে হবে। কবে এই পঞ্চায়েতগুলিতে বোর্ড গড়া হবে সেই বিষয়ে রাজ্য সরকারের সঙ্গে আলোচনা করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।” তবে তৃণমূলকে সুবিধা পাইয়ে দিতে বোর্ড গঠন স্থগিত করার অভিযোগ সম্পর্কে মন্তব্য করতে চাননি জেলাশাসক।
জেলা প্রশাসনের এক পদস্থ কর্তা বলেন, ‘‘বোর্ড গঠনকে কেন্দ্র করে কয়েকটি অপ্রীতিকর ঘটনা জেলায় ঘটে গিয়েছে। সেই প্রেক্ষিতে রাজ্য সরকারের শীর্ষ মহল চাইছে না ফের অশান্তি তৈরি হোক। তাই উত্তেজনাপ্রবণ পঞ্চায়েতগুলি চিহ্নিত করে সেখানে বোর্ড গঠন স্থগিত
করা হয়েছে।”
তৃণমূলের জেলা সভাপতি শান্তিরাম মাহাতো দাবি করেছেন, ‘‘মুখ্যমন্ত্রী চাইছেন পঞ্চায়েতে বোর্ড গঠনে যাতে অশান্তি তৈরি না হয়। সেই প্রেক্ষিতেই কিছু পঞ্চায়েতে বোর্ড গঠন আপাতত স্থগিত রেখেছে প্রশাসন। স্থগিত থাকা পঞ্চায়েতগুলিতে উন্নয়নের কাজ ব্যাহত হবে না। পঞ্চায়েতেগুলির দৈনিক কাজকর্ম ও এলাকার উন্নয়ন যাতে ব্যাহত না হয়, তা দেখা হচ্ছে।”