বছর পাঁচেক আগের কথা। কংসাবতী নদীর কাঁটাবেড়া ঘাটে সেতু তৈরির কাজ শুরু হয়েছিল। তার পরে, এই দীর্ঘ সময়ে নদীর বুকে মাথা তুলেছে কেবল গোটা তিনেক থাম। ঝুঁকি নিয়ে ভেলায় চড়ে নদী পারাপারে বাধ্য হচ্ছেন দু’পারের মানুষজন। সংশ্লিষ্ট দফতরের দাবি, সেতুর বরাদ্দ বৃদ্ধি পাওয়ায় বিষয়টি অর্থ দফতরের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
কংসাবতীর দক্ষিণ পাড়ে আড়শা আর উত্তর পাড়ে রয়েছে পুরুলিয়া ১ ও জয়পুর ব্লকের বিস্তীর্ণ জনপদ। তিনটি ব্লকের সংযোগস্থলে কংসাবতীর উপরে কাঁটাবেড়া ঘাটে সেতু তৈরির দাবি দীর্ঘদিনের। স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ জানান, বাম আমলে একাধিক বার সমীক্ষা হলেও, সেতুর কাজ শুরু হয় রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পরে। ২০১৬-র ফেব্রুয়ারিতে সেতুর শিলান্যাস করেন রাজ্যের তৎকালীন পশ্চিমাঞ্চল উন্নয়ন পর্ষদ মন্ত্রী শান্তিরাম মাহাতো।
তবে দীর্ঘ পাঁচ বছরে তিনটি থাম হওয়া ছাড়া, কাজ আর এগোয়নি। প্রায় সাড়ে তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে থমকে কাজ। আড়শা ব্লকের বামুনডিহা, কুদাগাড়া, কাঞ্চনপুরের মতো গ্রামগুলির বাসিন্দারা জানান, তাঁদের জীবিকার অনেকটাই জেলা শহর ও চাষমোড়কে ঘিরে। আনাজ নিয়ে ঝাড়খণ্ডের বোকারো বা শহরে পৌঁছতে হলে চাষমোড় হয়ে যাতায়াত সুবিধাজনক। কংসাবতী পেরিয়ে গ্রামগুলি থেকে পুরুলিয়া-বোকারো (৩২ নম্বর) জাতীয় সড়কের উপরে চাষমোড়ের দূরত্ব সাত-আট কিলোমিটার। চাষমোড় থেকে যানবাহনের সুবিধাও মেলে।
অথচ, বিকল্প পথে আহাড়রা মোড় হয়ে পুরুলিয়া শহরের দূরত্ব প্রায় ৪২ কিলোমিটার। বেলডি হয়ে পুরুলিয়া শহরে পৌঁছনোর একটি রাস্তা রয়েছে। সে রাস্তায় জেলা শহরের দূরত্ব কম-বেশি ২৬ কিলোমিটার হলেও তেমন যানবাহন চলাচল না করায় চাষমোড় হয়ে যাতায়াত করাই সুবিধাজনক।
বছরের অন্য সময়ে তেমন জল না থাকায় কংসাবতী পেরিয়ে যাতায়াত চললেও বর্ষায় সে উপায় থাকে না। তখন ভরসা বলতে ভেলা। হাওয়া ভরা চারটি বড় টিউবের উপরে বাঁশের ফালির মাচা বেঁধে তার উপরে পাতলা টিনের পাত বসিয়ে তৈরি ভেলাতেই চলে পারাপার।
কুদাগাড়া গ্রামের বাসিন্দা জয়ন্ত কুমারের কথায়, ‘‘স্থানীয় কয়েকজন যুবক মাচা বানিয়ে নদী পারাপারের ব্যবস্থা করেছেন। না হলে, অনেকটা পথ উজিয়ে গ্রামে পৌঁছতে হত।’’ নদী পেরোনোর জন্য মোটরবাইক ভেলায় তুলে নদীতে নামার আগে চাষমোড় এলাকার বাসিন্দা স্বপন মাহাতোও বলেন, ‘‘ও পারে বামুনডিহায় বিয়েবাড়ি রয়েছে। এ রাস্তায় দূরত্ব আট কিলোমিটার। পুরুলিয়া শহর হয়ে গেলে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার রাস্তা। পেট্রলের যা দাম, খরচ বাঁচাতে ঝুঁকি নিয়ে নদী পেরোতে হচ্ছে।’’ কুদাগাড়া গ্রামের আর এক বাসিন্দা লম্বোদর কুমারও জানান, আকাশে মেঘ দেখলেই চিন্তা বাড়ে। কেননা, নদীতে জল বাড়বে। কোনও রকমে সামান্য আয়ে সংসার চলে। ঘুরপথে যাতায়াতের খরচ টানা সম্ভব নয়।
যাত্রীদের নদী পারাপারের সঙ্গে যুক্ত ফটিক যোগী, চিনিবাস মাহাতো, বঙ্কিম মাহাতোদের কথায়, ‘‘মানুষজনের অসুবিধা হচ্ছে দেখে এ ভাবে পারাপারের ব্যবস্থা করেছি। যাত্রীরা যা দেন, তা-ই নিই।’’
রাজ্যের পশ্চিমাঞ্চল উন্নয়ন পর্ষদ দফতরের প্রাক্তন মন্ত্রী শান্তিরাম মাহাতো বলেন, ‘‘কাজ শুরুর সময়ে ছ’কোটির কিছু বেশি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল। পরে, বিস্তারিত প্রকল্প রিপোর্টে (‘ডিপিআর’) কিছু ত্রুটি থাকায় সেতু নির্মাণের বরাদ্দ বৃদ্ধির প্রয়োজন হয়ে পড়ে। তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ন’কোটির মতো। বিষয়টি অর্থ দফতরের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।’’
যদিও মাঝে আরও বছর দুয়েক সময় পেরিয়ে যাওয়ায় নির্মাণের খরচ আরও কিছুটা বাড়বে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞেরা।
পশ্চিমাঞ্চল উন্নয়ন পর্ষদের নির্বাহী বাস্তুকার মাধুরী সিং সর্দার বলেন, ‘‘নতুন করে ডিপিআর তৈরির কাজ চলছে। তা সম্পূর্ণ হলে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে।’’