পাড় বাঁধিয়ে, চারপাশে আলোর ব্যবস্থা করা হলেও সাহেববাঁধ এখনও কেন দূষণমুক্ত করা গেল না তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে।
পুরুলিয়া শহরে ১৭২ বছর আগে জলের সমস্যা মেটাতে খনন করা হয়েছিল সাহেববাঁধের। জাতীয় সরোবরের মর্যাদা পেলেও এই বাঁধের জল এখনও পর্যন্ত করা দূষণমুক্ত যায়নি। নিকাশি নালার জল যেমন বাঁধে এসে পড়ছে, তেমনই চারপাশের নোংরা জলও মিশছে। ফলে শহরের কিছু স্বাস্থ্য সচেতন মানুষের মনে এ নিয়ে ক্ষোভ ছড়িয়েছে। পুরপ্রধান কে পি সিংহ দেও মানছেন, ‘‘সাহেববাঁধের জল দূষণমুক্ত বলা যায় না। অনেক কাজ বাকি। একেবারে গোড়া থেকে কাজ করতে হবে।’’
১৮৩৮-১৮৪৩ সালে তৎকালীন অবিভক্ত মানভূমের কমিশনার কর্নেল টিকলে পানীয় জলের সমস্যা মেটাতে এই জলাশয় খনন করিয়েছিলেন। ৭৫ একর জমির উপরে এই জলাশয় তৈরি হয়। তাই জলাশয়টি সাহেববাঁধ নামেই পরিচিত। পরে রাঁচি রোডে কংসাবতী নদীর নলবাহিত পানীয় জল প্রকল্পটি গড়ে ওঠে। জেলার বিশিষ্ট স্বাধীনতা সংগ্রামী ঋষি নিবারণচন্দ্র দাশগুপ্তের স্মৃতিতে ওই জলাশয়ের বর্তমান নাম নিবারণ সায়র। বছর চারেক আগে এই বাঁধ জাতীয় সরোবরের মর্যাদা পায়। সংস্কারের কাজও শুরু হয়। কিন্তু সাহেববাঁধের জল দূষণমুক্ত করা যায়নি।
বাসিন্দাদের অভিযোগ, বাঁধের পাড়ে পুরসভা একটি বোর্ড লাগিয়ে মল, মূত্র ফেলা থেকে কাপড়কাচায় নিষেধ জারি করেই দায় সেরেছে। কিন্তু বাস্তব ছবিটা অন্য। বাঁধের পাড়ে দিনদিন বেড়ে চলেছে গ্যারেজের সংখ্যা। বাঁধের চারিদিকে তারের জালের বেড়া দেওয়া হলেও সেই বেড়া ডিঙিয়ে বাঁধের মধ্যে ফেলা হচ্ছে নানা বর্জ্য। জলে ভাসে সে সব আবর্জনা। এলাকায় গেলেই দেখা যায়, শহরের একাংশের নোংরা জল বড় নালা দিয়ে সাহেববাঁধে এসে পড়ছে। দীর্ঘদিন ধরেই ওই নালার জল এসে মিশছে। কিন্তু কেন ওই নিকাশি নালার জল অন্যত্র ফেলার ব্যবস্থা করা যাচ্ছে না, তা নিয়ে প্রশ্ন বাসিন্দাদের। বাঁধের পাশের এক গ্যারাজের কর্মী বলেন, ‘‘সাহেববাঁধে যখন নোংরা জল ঢোকে তখন দূর্গন্ধে টেকা যায় না।’’ ‘সাহেববাঁধ বাঁচাও কমিটি’-র মুখপাত্র তথা জেলা হিউম্যান রাইটস ফোরামের সভাপতি আবু সুফিয়ানের কথায়, ‘‘সবচেয়ে মারাত্মক হল এটাই। এখনও এই বাঁধে নর্দমার জল এসে মিশছে। কিন্তু কারও কোনও হেলদোল নেই।’’
জাতীয় সরোবরের মর্যাদা পাওয়া এই বাঁধ পরিষ্কার রাখার বোর্ড লাগিয়েই দায় সেরেছে পুরসভা। ছবি: সুজিত মাহাতো।
বাঁধানো পাড়ের নোংরা জল যাতে সাহেববাঁধে এসে না পড়ে সে জন্য পাকা নালা তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু সেই নালা কবেই ভেঙে গিয়েছে। ফলে যথারীতি পাড়ের নোংরা জল এসে বাঁধেই মিশছে। বাসিন্দারা জানাচ্ছেন, শুধু পাড়ের নোংরাই নয়, আশপাশে গজিয়ে ওঠা গ্যারাজের তেল-কালি সব এসে বাঁধে পডছে। কিন্তু নজরদারির বালাই নেই। তাঁদের ক্ষোভ, সংস্কার করতে গিয়ে বাঁধের পাড় বাঁধিয়ে, রঙ লাগিয়ে ও আলো জ্বালিয়ে সৌন্দর্য ফেরালেই সব কাজ হয় না। এই জাতীয় সরোবরের জল, যা পানীয় জল হিসেবে আজও ব্যবহৃত হয় সেই বিষয়টিই উপেক্ষিত রয়ে গিয়েছে। গত বছরের জুলাই মাসে জেলায় প্রশাসনিক বৈঠক করতে এসে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও সাহেববাঁধের প্রসঙ্গ তুলে ভর্ৎসনা করেন তৎকালীন পুরপ্রধানকে। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য ছিল, শুধু নীল-সাদা রং করলেই হয় না। কাজ করতে হবে। বাস্তব চিত্র বলছে, বছর পার হয়ে গেলেও অবস্থা সেই তিমিরেই।
এই বাঁধের জল পুরভবনের পাঁচিল লাগোয়া ট্যাঙ্ক থেকে ভিস্তিওয়ালারা টিনে করে নিয়ে যান। তা শোধন করেই দেওয়ার কথা। সেই জল সম্প্রতি আবু সুফিয়ান পরীক্ষা করান। সুফিয়ানের দাবি, রিপোর্টে ওই জল দূষণমুক্ত নয় বলে জানানো হয়েছে। তাঁর কথায়, ‘‘ওই ট্যাঙ্কের উপরে বড়বড় করে পুরসভা ‘পানীয় জল’ কথাটি লিখে রেখেছে। কিন্তু জনস্বাস্থ্য কারিগরি দফতরের অনুমোদিত পরীক্ষাকেন্দ্রে ওই জল পরীক্ষা করিয়ে জানতে পারি, জল দূষিত।’’ তাঁর ক্ষোভ, ওই রিপোর্ট তিনি পুরসভার কাছে পাঠিয়েছেন। আগেও অনেকবার তাঁরা ‘সাহেববাঁধ বাঁচাও কমিটি’-র তরফে বাঁধের জল দূষণমুক্ত করার জন্য প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে প্রস্তাব দিয়েছেন। কিন্তু তাতে লাভ হয়নি। ওই জলই ভিস্তিওয়ালারা মূলত বাসস্ট্যান্ড, ট্যাক্সিস্ট্যান্ড, আদালত চত্বর সহ বিভিন্ন দোকানে জোগান দিচ্ছেন। বাসস্ট্যান্ড এলাকার এক হোটেল মালিক পবন কর্মকার বলছেন, ‘‘শহরে জলের সঙ্কট। তাই বাধ্য হয়েই ওই জলই নিতে হচ্ছে।’’
কী বলছেন পুরপ্রধান কে পি সিংহ দেও? তিনি মানছেন, ‘‘সাহেববাঁধের জল দূষণমুক্ত নয়। খাওয়া ঠিক নয়। কারণ ফিল্টার বা শোধনের ব্যবস্থা ঠিকঠাক কাজ করছে না। আমি সবে দায়িত্ব নিয়েছি। সাহেববাঁধ নিয়ে নতুন করে শুরু করতে হবে।’’